Friday, September 25, 2026
Homeবাংলাদেশরংপুর অঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের হটস্পট গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ

রংপুর অঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের হটস্পট গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ

গত এক মাসে রংপুর, দিনাজপুর ও গাইবান্ধায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৫৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। 

এর মধ্যে রংপুর ও দিনাজপুরে ১৬ জনের অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছিল। চিকিৎসার পর তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

এদিকে, ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৭ জন। তাদের মধ্যে ১৯ জন নারী, ১৪ জন পুরুষ ও চার শিশু।

রংপুর, দিনাজপুর ও গাইবান্ধার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আক্রান্ত ব্যক্তিরা যেসব মাংস খেয়েছিলেন বা সংস্পর্শে এসেছিলেন, সেসব গরু মূলত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও পাশের রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় পালন করা হয়েছিল।

গত বছরের এই সময়েও এসব এলাকায় অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল।

সুন্দরগঞ্জে এবারে বড় আকারে সংক্রমণের সূত্রপাত ৯ সেপ্টেম্বর। সেদিন উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের বাছহাটি গ্রামের একটি অসুস্থ গরু জবাই করে প্রায় ১০০ পরিবারের কাছে কম দামে বিক্রি করা হয়।

এরপর গত দুই সপ্তাহে সর্বানন্দ, তারাপুর, কঞ্চিবাড়ী, সোনারায় ও রামজীবন—এই পাঁচ ইউনিয়নে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) কামরুল হাসান এবং উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতেই কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের ছয় বাসিন্দার মধ্যে প্রথম উপসর্গ দেখা যায়। অসুস্থ গরুর মাংস খাওয়ার পর তাদের জ্বর ও ত্বকে ফোসকা দেখা দেয়।

পরে তারা চিকিৎসা নিয়ে সেরে ওঠেন।

কামরুল হাসান জানান, এই ৬ জনের মধ্যে চারজনের নমুনায় আনথ্রাক্স ধরা পড়ে।

বাছহাটি গ্রামের গোলেজা বেগম (৪০) ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অসুস্থ গরুটির মাংস পরিষ্কার ও রান্না করে খাওয়ার পরপরই আমার হাতে ফোসকা দেখা দেয়।’

একই গ্রামের শফিক আলম (৪৫) বলেন, ‘আমি মাংস খাইনি। শুধু গরু জবাইয়ে সহযোগিতা করেছিলাম। জবাইয়ের সময় গরুর রক্ত হাতে লাগার পর আমার দুই হাতে ফোসকা দেখা দেয়।’

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ২১ সেপ্টেম্বর বাছহাটি গ্রাম থেকে মাংসের দুটি নমুনা সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারে (সিডিআইএল) পাঠায়।

২৩ সেপ্টেম্বর পাওয়া পরীক্ষার প্রতিবেদনে দুটি নমুনাতেই অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয় বলে ডেইলি স্টারকে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় ২২ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়। ওই উপজেলার চাওলা ইউনিয়নের আদমপাড়া গ্রামের ১৩ জন আক্রান্ত হন।

রংপুরের সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানা জানান, আক্রান্ত ১৩ জনের মধ্যে একই পরিবারের চারজন ছিলেন। তারা পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ দিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এর পর আর নতুন রোগী শনাক্ত হয়নি।

ঘটনাস্থলে আসা আইসিডিডিআর,বির একটি দল আক্রান্ত ব্যক্তিদের নমুনা পরীক্ষা করে অ্যানথ্রাক্সের উপস্থিতি নিশ্চিত করে।

চাওলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল হাকিম জানান, যে গরুটি জবাই করা হয়েছিল সেটি পাশের গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা থেকে কেনা।

গত ২৯ আগস্ট রংপুরের পীরগাছায় পালন করা এক গরুর মাংস কিনে খাওয়ার পর এক সেনাসদস্য ও তার বাবা-মায়ের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়। পরে তাদের খোলাহাটি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান তারা।

এ তথ্য নিশ্চিত করে দিনাজপুরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুর রহিম জানিয়েছেন, এরপর নতুন করে আর কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।

অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাবের পর ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ছয় কর্মকর্তা এবং আইসিডিডিআর,বির দুই গবেষক সুন্দরগঞ্জে যান বলে জানান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কামরুল হাসান।

আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। আক্রান্ত এলাকায় অসুস্থ গবাদিপশু জবাইয়ের আগে অবশ্যই প্রাণিসম্পদ বিভাগের অনুমোদন নেওয়ার ওপরও জোর দেওয়া হয়। এছাড়াও আক্রান্ত এলাকায় শতভাগ গবাদি পশুকে ভ্যাকসিন দেওয়া নিশ্চিত করতে পরামর্শ দেন তারা।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি জানান, মাইকিং, প্রশাসনিক সভা, এলাকার কসাইদের সঙ্গে সভা এবং মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে গ্রামবাসীকে সচেতন করা হচ্ছে। যাদের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ রয়েছে কিন্তু হাসপাতালে যাননি, তাদেরও খুঁজে বের করে চিকিৎসার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্স অত্যন্ত সংক্রামক। সাধারণত আক্রান্ত গবাদিপশুর সংস্পর্শে এলে মানুষের মধ্যে এটি ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা পুঁজের সংস্পর্শেও দ্বিতীয় পর্যায়ে সংক্রমণ হতে পারে।’

‘তবে সঠিকভাবে ওষুধ সেবন করলে ও চিকিৎসা নিলে অ্যানথ্রাক্স পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়,’ যোগ করেন তিনি।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার গবাদিপশু রয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে এলাকায় অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাবের পর চলতি বছরের জুলাইয়ে ১৫টি ইউনিয়নে রিং ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি শুরু করে সরকার। এর আওতায় এ পর্যন্ত ১৯ হাজার গরুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, আক্রান্ত এলাকার ৩ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা সব গবাদিপশুকে টিকা দেওয়ার কথা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম জানান, বর্তমানে ১১ হাজার টিকা মজুত রয়েছে। আরও ১৫ হাজার টিকার জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

তবে আইসিডিডিআর,বি ও আইইডিসিআরের গবেষকেরা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে গিয়ে জানান, গরু ছাড়াও ছাগল, ভেড়া ও মহিষের মাধ্যমেও অ্যানথ্রাক্স ছড়াতে পারে।

গত বছরের ৫ অক্টোবর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বেলকা গ্রামের আবুল হোসেনের স্ত্রী রোজিনা বেগম (৪৫) অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও তার পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থ একটি ছাগলের মাংস পরিষ্কার করে রান্না ও খাওয়ার পর তার আঙুলে ফোসকা দেখা দিয়েছিল। এছাড়া তার আরও জটিল রোগ ছিল।

অন্য গবাদিপশুকে টিকা দেওয়া হচ্ছে না কেন—জানতে চাইলে গাইবান্ধার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. জোবাইদুল কবীর বলেন, এ অঞ্চলে অতীতে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব মূলত গরু থেকে শুরু হওয়ায় বর্তমানে গরুকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে অন্যান্য গবাদিপশুর ওপরও নজর রাখা হচ্ছে।

Most Popular