পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর সোনারচর অভয়ারণ্যে এখনো প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছু মহিষ টিকে আছে। কিন্তু এই মহিষগুলোর ওপর নজর আছে চোরা শিকারিদের।
বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা এই অভয়ারণ্যে বুনো মহিষ শিকার থামছে না। বন বিভাগের অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তারের পরও বুনো মহিষ শিকার ও পাচার চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ হচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্রের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও চক্রের সিন্ডিকেট টিকে থাকে।
রাঙ্গাবালী উপজেলার উপকূলের সোনারচর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত ঘেরা ২ হাজার ২৬ হেক্টর আয়তনের এই বনটিকে ২০১১ সালে বন্য প্রাণী ও পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করে সরকার।
তবে বর্তমানে বন বিভাগের হিসাবে এখানে ২০০ থেকে ২৫০টি বুনো মহিষ রয়েছে। অথচ গত বছর বন বিভাগের করা একটি মামলার এজাহারে বলা হয়েছিল, সোনারচরে বুনো মহিষের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০টি। একের পর এক শিকার, জবাই ও পাচারের ঘটনায় এই প্রাণীগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও বন বিভাগের মামলার নথি থেকে জানা যায়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সোনারচরের বনে ফাঁদ ও রশি ব্যবহার করে মহিষ শিকার করছে। পরে সেই মহিষ নির্জন এলাকায় নিয়ে জবাই করে মাংস বিক্রি করা হয়। আবার কিছু মহিষ জীবিত অবস্থায় ধরে গোপনে অন্যত্র পাচার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চরটির দুর্গম অবস্থান, বনের ভেতরে নজরদারি না থাকা এবং নদীপথকে কাজে লাগিয়ে চক্রটি বছরের পর বছর ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বলেন, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চোর চক্রের নিয়ন্ত্রণও হাতবদল হয়েছে।
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ মার্চ সংরক্ষিত বন থেকে একটি বুনো মহিষ ধরে জবাই ও মাংস বিক্রির অভিযোগে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ওই মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার বাড়ি থেকে মহিষের মাংস ও চামড়া উদ্ধার করা হয়।
পরে ২০২৬ সালের ২২ মার্চ আবারও সোনারচর বিট এলাকায় ফাঁদ পেতে মহিষ শিকার ও মাংস পাচারের অভিযোগে বন আইনে আরেকটি মামলা করে বন বিভাগ। ওই মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
সর্বশেষ গত ৪ জুন আবারও মহিষের মাংসসহ একজনকে আটক করে বন বিভাগ ও পুলিশ; এ ঘটনাতেও তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। বন বিভাগ বাদী হয়ে করা এই তিন মামলায় মোট ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামাদেরকে আসামি করা হয়েছে।
বন বিভাগের সোনারচর ক্যাম্পের বিট কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘সম্প্রতি মহিষ শিকারের উৎপাত বেড়েছে। গত কয়েক মাসে তিনটি মামলা হয়েছে। মহিষ চুরি ঠেকাতে আমরা দিনে ও রাতে টহল জোরদার করেছি।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, বুনো মহিষ শিকার ও পাচারসংক্রান্ত তিনটি মামলায় আসামি হওয়া কয়েকজন স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অভিযোগ ওঠার পর তাদের মধ্যে দুজনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মামলার নথিতে থাকা আসামিদের মধ্যে রয়েছেন চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআন্ডা ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইদ্রিস, ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের বহিষ্কৃত সভাপতি কামাল শিকদার, একই ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি মো. আমজাদ মল্লিক এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত সদস্য মো. কাইয়ুম শিকদার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলায় নাম আসা ব্যক্তিদের কেউ কেউ এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তবে স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ব্যক্তির অপরাধের দায় দল কখনোই নেবে না।
চরমোন্তাজ রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কেউ কেউ এসব অপকর্ম করছে। তবে মামলাগুলোর দ্রুত রায় ও সাজা দেওয়া হলে এ ধরনের অপরাধ নির্মূল হবে। আমরা যখন আসামি ধরি, তারা অল্প দিনের মধ্যে জামিন পেয়ে যায় এবং আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়ে।’
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বনায়ন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শাহরিয়ার জামান বলেন, ‘বুনো মহিষ শুধু বাংলাদেশের নয়, এশিয়ার অন্যতম হুমকিগ্রস্ত বৃহৎ তৃণভোজী প্রাণী। এদের সংখ্যা ইতিমধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ায় অব্যাহত শিকার ও পাচার পুরো প্রজাতিটিকে দ্রুত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সোনারচরে যদি প্রকৃতপক্ষে মাত্র ২০০-২৫০টি বুনো মহিষ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে অবৈধ শিকার ও পাচার তাদের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য গুরুতর হুমকি। বুনো মহিষ উপকূলীয় তৃণভূমি ও জলাভূমির উদ্ভিদ কাঠামো নিয়ন্ত্রণ, বীজ বিস্তার এবং পুষ্টি চক্র বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদের সংখ্যা কমে গেলে বাস্তুতন্ত্রের জীববৈচিত্র্য নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে।’
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, ‘সোনারচর অভয়ারণ্য থেকে বুনো মহিষ চুরি বন্ধ করতে বন বিভাগকে টহল বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারাই এই কাজ করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
