Tuesday, May 12, 2026
Homeবিদেশইরান যুদ্ধে যেভাবে হুমকিতে পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার তিমিরা

ইরান যুদ্ধে যেভাবে হুমকিতে পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার তিমিরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, সার, ওষুধ এবং হিলিয়ামের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ফলে বহু দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। তবে এই সংঘাতের প্রভাব এবার এক নতুন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে—দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলের তিমিদের জীবনে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের রুট বদলে যাওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার সমুদ্র উপকূলে জাহাজের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে গেছে। এতে ওই অঞ্চলে বসবাসকারী তিমিদের জাহাজের ধাক্কায় আহত বা নিহত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এএফপি জানিয়েছে, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক তিমি কমিশনের (আইডব্লিউসি) এক বৈঠকে উপস্থাপিত একটি গবেষণায় বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফলে সেখানে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তিমির বাসস্থান হুমকির মুখে পড়ছে।

কেন বদলে গেছে জাহাজ চলাচলের পথ?

জাহাজ চলাচলের এই পরিবর্তনের সূচনা হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। সে সময় ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এলাকায় চলাচলকারী জাহাজে হামলা শুরু করে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা এসব হামলা চালায়।

এর ফলে বহু আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালের পথ এড়িয়ে চলতে শুরু করে।

পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালিতেও উত্তেজনা আরও বাড়ে। বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তা সংকটের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথও অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ বা অন্য অঞ্চলে যাওয়া অনেক জাহাজ বাধ্য হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চলাচল করছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পোর্টওয়াচ মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা ঘিরে অন্তত ৮৯টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে। একই সময়ে ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৪টি। অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

কোন তিমিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

দক্ষিণ আফ্রিকার সমুদ্রসীমা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। দেশটির জলসীমায় ৪০টিরও বেশি প্রজাতির তিমি বাস করে।

কেপ অব গুড হোপ এলাকায় বিশেষভাবে দেখা যায় সাউদার্ন রাইট হোয়েল, হাম্পব্যাক হোয়েল এবং ব্রাইডস হোয়েল। এ ছাড়াও, ওই অঞ্চলে রয়েছে অর্কা বা কিলার হোয়েল, স্পার্ম হোয়েল, মিনকে হোয়েল এবং ডলফিন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম্পব্যাক তিমির বিশাল দল এই এলাকায় খাবার গ্রহণ করে এবং পরে প্রতি বছর অ্যান্টার্কটিকার দিকে দীর্ঘ মাইগ্রেশনে যায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হাম্পব্যাক তিমির দলগুলোর একটি এখানেই অবস্থান করে। বিভিন্ন গবেষণায় এদের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার থেকে ১৩ হাজারের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিংশ শতাব্দীতে বাণিজ্যিক তিমি শিকারের কারণে অনেক প্রজাতির তিমি মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। যদিও সাউদার্ন রাইট ও হাম্পব্যাক তিমির সংখ্যা কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে, তবুও অ্যান্টার্কটিক ব্লু হোয়েল, ফিন হোয়েল এবং সায় হোয়েলের মতো কিছু প্রজাতি এখনও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে।

কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তিমিরা?

গবেষকদের মতে, জাহাজ চলাচল বেড়ে যাওয়ায় তিমিদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে দ্রুতগতির বড় জাহাজ তিমিদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়ার গবেষক এলস ভারমেউলেন জানান, অনেক সময় তিমিরা খাবার গ্রহণে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে তারা জাহাজের উপস্থিতি টেরই পায় না।

তিনি বলেন, ‘অনেক কার্গো জাহাজের যাত্রী ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছে যে, তারা কত সংখ্যক হাম্পব্যাক তিমি দেখছে। কিন্তু আমি ভিডিওগুলো দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম, কারণ বুঝতে পারছিলাম—এই জাহাজগুলো হয়তো একাধিক তিমিকে ধাক্কা দিচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, দ্রুতগতির জাহাজ চলাচল চারগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা তিমিদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।

বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের (ডব্লিউডব্লিউএফ) ‘প্রটেক্টিং হোয়েলস অ্যান্ড ডলফিনস ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রধান ক্রিস জনসন বলেন, তিমিরা এখনও জাহাজের শব্দ বা চলাচলের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি।

তার ভাষায়, ‘আমরা সাধারণত মনে করি বড় শব্দ শুনলে প্রাণীরা সরে যাবে। কিন্তু অনেক তিমির ক্ষেত্রে তা ঘটে না।’

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেস উপকূলে ব্লু হোয়েল জাহাজের শব্দ শুনলে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে বরং পানির আরও নিচে ডুবে যায়। এতে সংঘর্ষের ঝুঁকি কমে না।

জলবায়ু পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত নানা পরিবর্তনের কারণেও তিমিদের আচরণ বদলাচ্ছে, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গবেষক কেন ফিন্ডলে জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে হাম্পব্যাক তিমিরা ২০১১ সালের আগে সাধারণত খাবার গ্রহণ করত না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা সেখানে বেশি সময় কাটাতে শুরু করেছে। আর ওই এলাকাতেই এখন জাহাজ চলাচল দ্রুত বাড়ছে।

আগেও কি এমন ঝুঁকি ছিল?

গবেষকদের মতে, সমুদ্রে মানুষের কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিমিদের ঝুঁকিও দীর্ঘদিন ধরে বাড়ছে।

এলস ভারমেউলেন ও তার দল ২০২২ সালে ওয়েস্টার্ন কেপ উপকূলে সাউদার্ন রাইট হোয়েলের মৃত্যুর ওপর একটি গবেষণা চালান। সেখানে ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মোট ৯৭টি তিমির মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, অন্তত ১১টি মৃত্যু সরাসরি জাহাজের ধাক্কায় ঘটেছে। এ ছাড়া, আরও ১৬টি ঘটনায় জাহাজের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলেও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

যদিও মাছ ধরার জালে জড়িয়ে পড়া ছিল তিমি মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ, তবুও গবেষকরা মনে করেন জাহাজের ধাক্কায় মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। কারণ খোলা সমুদ্রে ধাক্কা খেয়ে মারা যাওয়া অনেক তিমি সমুদ্রের তলদেশে ডুবে যায় এবং সেগুলোর হিসাব পাওয়া যায় না।

তিমিদের রক্ষায় কী করা যেতে পারে?

গবেষণায় প্রস্তাব করা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল থেকে জাহাজ চলাচলের পথ সামান্য দূরে সরিয়ে নিলেই কিছু তিমি প্রজাতির ক্ষেত্রে সংঘর্ষের ঝুঁকি ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক শিপিং কোম্পানি এমএসসি ইতোমধ্যে গ্রিসের হেলেনিক ট্রেঞ্চ এলাকায় স্পার্ম হোয়েল এবং শ্রীলঙ্কার উপকূলে ব্লু হোয়েল রক্ষার জন্য জাহাজের রুট পরিবর্তন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজের গতি কমিয়ে আনা হলে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি এতে সমুদ্রের নিচের শব্দদূষণও কমবে, যা তিমিদের জন্য উপকারী।

গবেষকরা আরও পরীক্ষা করছেন, বিশেষ মোবাইল অ্যাপ বা রেডিও বার্তার মাধ্যমে জাহাজগুলোকে তিমির অবস্থান সম্পর্কে আগাম সতর্ক করা যায় কি না।

দক্ষিণ আফ্রিকার পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কেপ অব গুড হোপ এলাকার তিমিদের রক্ষায় সম্ভাব্য সব ধরনের সমাধান ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বিবেচনা করা হবে।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

Most Popular