Tuesday, May 12, 2026
Homeবিদেশনানা কেলেঙ্কারিতে কোণঠাসা স্টারমার, প্রধানমন্ত্রিত্ব কি হুমকির মুখে?

নানা কেলেঙ্কারিতে কোণঠাসা স্টারমার, প্রধানমন্ত্রিত্ব কি হুমকির মুখে?

ব্রিটিশ রাজনীতি থেকে অস্থিরতা দূর করার বহু প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন কিয়ার স্টারমার। কিন্তু বিভিন্ন নীতির পরিবর্তন, নানা বিতর্ক আর জনমত জরিপে জনপ্রিয়তার চরম ধসের কারণে তিনি এখন এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে।

ব্রেক্সিট ও দলীয় কোন্দলে জর্জরিত দীর্ঘ ১৪ বছরের রক্ষণশীল শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ৫ জুলাই ক্ষমতা নেন স্টারমার। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণেই তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এমন এক সরকারের, যা জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে রাষ্ট্রের অনাবশ্যক হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনবে।

সাবেক টোরি প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং লিজ ট্রাসের নীতিগত তর্জন-গর্জনের চেয়ে স্টারমার নিজের ধীরস্থির ও বাস্তববাদী কর্মপদ্ধতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং একেই তার রাজনীতির প্রধান শক্তি হিসেবে জাহির করেছিলেন।

স্টারমারকে নিয়ে সাংবাদিক প্যাট্রিক ম্যাগুইয়ার এবং গ্যাব্রিয়েল পোগ্রুন্ডের লেখা বই ‘গেট ইন’—এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি নিজেই নাকি তার সহকর্মীদের বলেছিলেন— ‘স্টারমারবাদ বলে আসলে কিছু নেই এবং কোনোদিন থাকবেও না।’

ডাউনিং স্ট্রিটে আসার পর থেকেই স্টারমার নিজেকে যে ‘নির্ভরযোগ্য’ ব্যক্তিত্ব হিসেবে জাহির করেছিলেন, সেই ভাবমূর্তি ধরে রাখতে এখন তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন। কোনো জোরালো আদর্শ বা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব না থাকায় দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার পরিকল্পনা কী, তা তিনি মানুষকে বোঝাতে পারছেন না।

সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সোমবার স্টারমার বলেন, তার দল আরও শক্তিশালী ও সাহসী হবে। মূলত নিজের দলের প্রায় ৪০০ এমপির মধ্য থেকে ওঠা পদত্যাগের ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতেই তিনি এমন কঠোর অবস্থানের কথা জানান।

সফল ক্যারিয়ার, কিন্তু…

১৯৬২ সালের ২ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া স্টারমার লন্ডনের উপকণ্ঠে একটি ছোট ও সংকীর্ণ বাড়িতে বেড়ে ওঠেন। তার মা ছিলেন দীর্ঘদিনের অসুস্থ এবং বাবা ছিলেন গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বভাবের মানুষ। তবে তার বাবার এক বিশেষ গুণ ছিল। তিনি প্রাণীদের খুব ভালোবাসতেন এবং বিপদগ্রস্ত গাধাদের উদ্ধার করতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করার পর তিনি একজন মানবাধিকার আইনজীবী এবং প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রসিকিউটর হিসেবে অত্যন্ত সফল কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। তার এই কৃতি ও সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে ‘নাইট’ (স্যার) উপাধিতে ভূষিত করেন।

বাঁশি বাজাতে বেশ পারদর্শী এবং ফুটবল ক্লাব আর্সেনালের একনিষ্ঠ ভক্ত স্টারমার ২০১৫ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৫ সালের পর লেবার পার্টির সবচেয়ে শোচনীয় পরাজয়ের পর পাঁচ বছর আগে তিনি বামপন্থী নেতা জেরেমি করবিনের উত্তরসূরি হিসেবে দলের দায়িত্ব নেন।

জেরেমি করবিনকে দল থেকে বহিষ্কার, ইহুদি-বিদ্বেষ নির্মূল এবং দলকে পুনরায় মধ্যপন্থা বা নির্বাচনী জনপ্রিয়তার জায়গায় ফিরিয়ে এনে তিনি নিজের কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের পরিচয় দেন। এর মাধ্যমেই গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে লেবার পার্টির হয়ে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী বিজয় ছিনিয়ে আনেন।

ব্রিটেনের শাসনভার নেওয়ার সময় স্টারমার দেশটিকে নতুন করে গড়ে তোলা বা মেরামতের প্রতিশ্রুতি দেন। বছরের পর বছর ধরে চলা মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট এবং রক্ষণশীল বা টোরি সরকারের কৃচ্ছ্রতা নীতির কারণে ভঙ্গুর হয়ে পড়া জনসেবা খাতগুলোকে সংস্কার করাই ছিল তার লক্ষ্য।

তবে তিনি শুরুতেই সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, এই সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ হবে ‘দীর্ঘ এবং বেশ কঠিন’।

কেলেঙ্কারির দীর্ঘ তালিকা

স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্বের শুরুটা বেশ বাজেভাবে হয়েছিল। সরকার লাখ লাখ প্রবীণ ব্যক্তির ‘উইন্টার ফুয়েল পেমেন্ট’ (শীতকালীন জ্বালানি ভাতা) বাতিল করার এক অত্যন্ত অজনপ্রিয় ঘোষণা দেয়, যা লেবার পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল না। পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

জনকল্যাণমূলক ভাতা সংস্কারের ক্ষেত্রেও স্টারমারকে অনেকটা অপমান নিয়েই পিছিয়ে আসতে হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরাধিকার কর নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে বিরোধে তিনি নতিস্বীকার করেন এবং পে-রোল ট্যাক্স (বেতনভিত্তিক কর) ও ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো নিয়ে ব্যবসায়ীদেরও ক্ষুব্ধ করেন।

শাসনামলের প্রথম দিকটা ছিল উপহার কেলেঙ্কারি নিয়ে ক্ষোভে উত্তাল। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে যখন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সম্পত্তি কর বাবদ কম অর্থ পরিশোধের দায়ে উপ-প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেন অ্যাঞ্জেলা রেনার।

একই মাসে স্টারমার ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করেন। প্রয়াত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের গভীর বন্ধুত্বের বিষয়টি সামনে আসায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

এই বিতর্কিত নিয়োগের জন্য স্টারমার ক্ষমা প্রার্থনা করলেও এর পরিণামে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুজন উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাকে পদ হারাতে হয়।

স্টারমার নিজে পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানালেও এসব কেলেঙ্কারি এখন তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। গত সপ্তাহে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির একের পর এক শোচনীয় পরাজয়ের পেছনে এই ঘটনাগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে, যা তার পদত্যাগের দাবিকে আবারও জোরালো করে তুলেছে।

রিফর্ম পার্টির হুমকি

ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া এবং ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় সমর্থন ধরে রাখার জন্য স্টারমার প্রশংসিত হয়েছেন। তবে নিজ দেশে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী দল ‘রিফর্ম ইউকে’-র ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা মোকাবিলা করতে তিনি বেশ বেগ পাচ্ছেন।

এ ছাড়া ইউগভের জনমত জরিপ অনুযায়ী, তার জনপ্রিয়তা এখন মাত্র ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীদের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন রেটিং।

লেবার পার্টি তাদের জনসমর্থন হারাচ্ছে বামপন্থী ‘গ্রিনস’ দলের কাছেও, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নিজেকে ‘ইকো-পপুলিস্ট’ (পরিবেশবাদী-জনপ্রিয়তাবাদী) হিসেবে পরিচয় দেওয়া জ্যাক পোলানস্কি।

গতকাল সোমবার স্টারমার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি পিছু হটবেন না। যুক্তরাজ্যের ‘ভাগ্য বা জাতীয় আদর্শ’ নির্ধারণের এক কঠিন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, লেবার পার্টি যদি মুখ থুবড়ে পড়ে, তবে ব্রিটেন এক চরম অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক ভবিষ্যতের দিকে চলে যাবে।

Most Popular