ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে যখন ২-২ গোলে সমতা এলো, তখন ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের সঙ্গে বসলেন কোচ টমাস টুখেল। সবার উত্তেজনা কিছুটা কমলে তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘আমি চাই আমরা নিজেদের স্টাইলে খেলি। সাহসের সঙ্গে, আক্রমণাত্মক হয়ে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ো। আমাদের নিজেদের ওপর বিশ্বাস আছে।’
ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো বলছে, এ যেন ক্রিকেটের বিখ্যাত ‘বাজবল’ নীতির নতুন ফুটবল সংস্করণ (বাজবল ২.০)। ইদানীং ক্রিকেট মাঠে ইংল্যান্ডের ‘বাজবল’ কার্যকর হচ্ছিলো না। চিন্তাভাবনা ছাড়া খেলে দল উল্টো ডুবছিল। কিন্তু বুধবার ডালাসে টুখেলের অধীনে দেখা গেল ফুটবলের এক নতুন রূপরেখা—যেখানে স্বাধীনতা ও আক্রমণ থাকবে, তবে খেলোয়াড়রা বুদ্ধি খাটিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে পরিকল্পিত ঝড় তুলবে।
অধিনায়ক হ্যারি কেইনও সতীর্থদের স্বাধীনভাবে খেলার কথা বলেছিলেন, তবে তা কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন খেলা নয়। যখন এলিয়ট অ্যান্ডারসনের নিখুঁত পাস ধরে জ্যুড বেলিংহাম গোল করেন, তখন বোঝা যায় এটি টুখেলের সাজানো ছকেরই অংশ। একে বলা যায় ‘ওয়ান-টাচ বল’।
খেলা যখন ২-২ গোলে ড্র, তখন বিরতিতে ইংল্যান্ডের জেগে উঠতে বড় ঝাঁকুনির দরকার ছিলো। অনেক সময় বকাঝকা অনেক দলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, কিন্তু ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে তা হয়নি। এতে বরং তারা আরও উজ্জীবিত হয়ে উঠেন।
কেইন জানান, কোচ বিরতিতে স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘যদি আমরা হারি, তবে নিজেদের স্টাইলেই হারব।’ পুরো ম্যাচে কেইন ছিলেন দারুণ। এমনকি শেষ মিনিটে প্রতিপক্ষের একটি নিশ্চিত শট তিনি নিজের পেট দিয়ে আটকে দেন।
ডেভিড বেকহ্যামের ১১৫ ম্যাচের রেকর্ড ছোঁয়ার দিনে জোড়া গোল করে ম্যাচ সেরা হন কেইন। জয়ের আনন্দে মাঠজুড়ে তখন ভক্তদের উল্লাস। এটি যেমন কেইনের মঞ্চ ছিল, তেমনি ছিল কোচ টুখেলেরও।
ইংল্যান্ডের ৪-২ গোলের এই জয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, তারা কীভাবে ৬০ বছরের ট্রফির খরা কাটাতে চায়। তাদের কৌশলে ছিল—মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, নিখুঁত সেট-পিস, কেইনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো, ডিফেন্সকে মাঝমাঠে তুলে এনে আক্রমণ করা এবং দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে গতি বাড়ানো। ইংল্যান্ডের চতুর্থ গোলটি আসে দুই বদলি খেলোয়াড় বুকায়ো সাকা ও মার্কাস রাশফোর্টের যৌথ প্রচেষ্টায়।
অবশ্য প্রথমার্ধের খেলা টুখেলের পছন্দ হয়নি। আক্রমণে ধার থাকলেও ডিফেন্সের ভুলে তারা দুবার গোল হজম করে। প্রথমে কেইনের পেনাল্টি ও পরে কর্নার থেকে আসা দারুণ হেডারে ইংল্যান্ড এগিয়ে গেলেও, ক্রোয়েশিয়ার বাচুরিনা এবং পিটার মুসা গোল করে রক্ষণভাগের দুর্বলতা প্রকাশ করে দেন।
বিরতিতে টুখেল খেলোয়াড়দের কড়া কথা শোনান। তিনি বলেন, ডিফেন্সে গুটিয়ে থাকা বা বারবার ব্যাক-পাস দেওয়া যাবে না। ফলে দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডের ডিফেন্স মাঝমাঠের লাইনে চলে আসে এবং ডেক্লান রাইস বলের নিয়ন্ত্রণ নেন। আক্রমণই হয়ে ওঠে তাদের সেরা রক্ষণ। এরপর অ্যান্ডারসনের পাসে বেলিংহাম স্কোর ৩-২ করেন। ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক দারুণ কিছু সেভ না করলে গোলের সংখ্যা আরও বাড়ত। শেষ দিকে রাশফোর্ড চতুর্থ গোলটি করেন।
ম্যাচ জেতার আগেই টুখেল তার আক্রমণাত্মক ‘বম্ব স্কোয়াড’ (সাকা, রাশফোর্ড ও রজার্স)-কে মাঠে নামান। এতে ঝুঁকি ছিলো, আবার প্রাপ্তির সম্ভাবনাও ছিলো, দ্বিতীয়টিই হয়েছে।
কেইন বলেন, ‘দ্বিতীয়ার্ধে আমরা আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে খেলতে চেয়েছিলাম। এই টুর্নামেন্টে আমাদের এভাবেই খেলতে হবে।’
