Thursday, June 18, 2026
Homeবিদেশবন্ধু যখন চক্ষুশূল!

বন্ধু যখন চক্ষুশূল!

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং পরবর্তী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চার মাসব্যাপী সংঘাত আপাতত থামার পথে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য—এটি কূটনীতির বিজয়। তেহরানের দাবি—এটি তাদের প্রতিরোধের স্বীকৃতি।

কিন্তু এই চুক্তির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রভাব পড়েছে এমন একটি সম্পর্কে, যেটিকে বহু বছর ধরে ‘অটুট মিত্রতা’ বলে মনে করা হতো। বলা হচ্ছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্ক এখন তলানিতে।

একসময় যারা একে অপরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্র ছিলেন, আজ তারা কার্যত একই যুদ্ধের ভিন্ন সমাপ্তি চাইছেন। প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্প কি নেতানিয়াহুকে পাশ কাটিয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় গেছেন? আর নেতানিয়াহু কি এখন ওয়াশিংটনের কাছে সহযোগীর চেয়ে বেশি বোঝা হয়ে উঠছেন?

যুদ্ধের শুরুতে লক্ষ্য এক, শেষে ভিন্ন পথ

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার সময় দুই নেতার লক্ষ্য ছিল প্রায় অভিন্ন। ট্রাম্প চেয়েছিলেন ইরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ছিল আরও বিস্তৃত—ইরানের সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং সম্ভব হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামোকেই দুর্বল করে দেওয়া।

কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, দুই নেতার হিসাব তত বদলেছে।

ট্রাম্পের সামনে ছিল জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক অর্থনীতি, মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতি এবং আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সামনে ছিল ইসরায়েলের নিরাপত্তা, হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার সুযোগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াই।

ফলে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে দুই মিত্রের মধ্যে লক্ষ্যগত দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের কাছে ‘চুক্তি’, নেতানিয়াহুর কাছে ‘অসমাপ্ত যুদ্ধ’

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার মূল উপাদানগুলো হলো—হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি করা।

কিন্তু এই চুক্তিতে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—ইরানের সরকার বহাল থাকছে, তাদের সামরিক কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি এবং ভবিষ্যতে তারা আবার শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এই চুক্তি ইরানকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে এবং ভবিষ্যতে তারা আবার তাদের আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করতে পারবে।

নেতানিয়াহুর দৃষ্টিতে এটি একটি অসমাপ্ত যুদ্ধ। ট্রাম্পের দৃষ্টিতে এটি একটি সফল সমঝোতা।

এই মৌলিক পার্থক্যই দুই নেতার সম্পর্কের সংকটের কেন্দ্রবিন্দু।

প্রকাশ্যেই নেতানিয়াহুকে ভর্ৎসনা

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে লেবানন ইস্যুতে।

ইরানের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা চলার সময়ও ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রাখে। ট্রাম্প বারবার সতর্ক করেন, এসব হামলা তার কূটনৈতিক উদ্যোগকে বিপন্ন করছে। কিন্তু নেতানিয়াহু নতি স্বীকার করেননি।

এরপর ট্রাম্প বিরল এক প্রকাশ্য সমালোচনায় বলেন, হিজবুল্লাহ সদস্যদের খুঁজতে পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। তিনি মন্তব্য করেন, ইসরায়েল ‘অনেক দিন ধরে’ এই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং এতে সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে।

মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্টের মুখে, বিশেষ করে ট্রাম্পের মতো একজন নেতার কাছ থেকে, এমন ভাষা শোনা ইসরায়েলের জন্য চরম অস্বস্তিকর।

কারণ ট্রাম্পই সেই নেতা, যিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিয়েছিলেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মতো কূটনৈতিক উদ্যোগ চালু করেছিলেন।

সেই ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, সমালোচনা করছেন, এমনকি প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিচ্ছেন।

‘তুমি একা হয়ে যেতে পারো’

ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির সবচেয়ে নাটকীয় ইঙ্গিত পাওয়া যায় ট্রাম্পের একটি মন্তব্যে।

অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি তিনি আবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন, তাহলে তিনি ‘খুব দ্রুত একা হয়ে যেতে পারেন’।

ট্রাম্পের ভাষায়, ‘বিবি, সাবধানে থেকো, নইলে খুব শিগগিরই তুমি একা হয়ে যাবে।’

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ইতিহাসে এমন সতর্কবার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এটি শুধু ব্যক্তিগত বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানেরও ইঙ্গিত।

ইসরায়েল কী পেল?

প্রশ্নটি এখন ইসরায়েলের ভেতরেও উঠছে।

যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহু যে লক্ষ্যগুলোর কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে কিছু অর্জিত হয়েছে। ইসরায়েল দাবি করছে, তারা ইরানের সামরিক অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে, কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করেছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে অন্তত সাময়িকভাবে পিছিয়ে দিয়েছে।

নেতানিয়াহু সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমরা ইসরায়েলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছি।’

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—যদি শেষ পর্যন্ত ইরানের সরকার টিকে থাকে, পারমাণবিক ইস্যু আলোচনার টেবিলে ফিরে যায় এবং নিষেধাজ্ঞাও শিথিল হয়, তাহলে এত বড় যুদ্ধের কৌশলগত অর্জন কতটুকু?

অনেক ইসরায়েলি বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফলাফল নেতানিয়াহুর প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি।

ট্রাম্পের হিসাব

ট্রাম্পের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। তিনি এই যুদ্ধকে এমন এক পর্যায়ে শেষ করতে চেয়েছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিজয় দাবি করতে পারে কিন্তু আর গভীরভাবে যেন জড়িয়ে না পড়ে।

ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প শুরুতে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দেখালেও শেষ পর্যন্ত তিনি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, যুদ্ধ থামানো এবং একটি রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরির মতো তুলনামূলক সীমিত লক্ষ্যেই সন্তুষ্ট হয়েছেন।

তেলের দাম কমানো, বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং নিজেকে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী’ হিসেবে তুলে ধরা—এসবও ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাবের অংশ।

ব্যক্তিগত সম্পর্কেও ফাটল?

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক বহুবার উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে।

তাদের সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি আদর্শিক ছিল না; বরং পারস্পরিক রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।

যখন দুই নেতার লক্ষ্য এক ছিল, তখন সম্পর্ক ছিল উষ্ণ। এখন লক্ষ্য আলাদা হয়ে যাওয়ায় সম্পর্কও শীতল হয়েছে।

রয়টার্সের ভাষায়, দুই নেতা এখন কার্যত ‘কোলিশন কোর্স’-এ আছেন, অর্থাৎ সংঘর্ষের পথে এগোচ্ছেন।

তবে এটাও সত্য যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, কংগ্রেসের সমর্থন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যৌথ কৌশলগত স্বার্থ এখনও অটুট রয়েছে।

বন্ধু থেকে চক্ষুশূল

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্কের বর্তমান সংকট মূলত যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে মতবিরোধের ফল।

ট্রাম্প চাইছেন যুদ্ধের সমাপ্তি এবং একটি কূটনৈতিক বিজয়। নেতানিয়াহু চাইছেন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং ইরানের ওপর আরও চাপ।

ফলে একসময়কার ঘনিষ্ঠ মিত্র এখন একে অপরের জন্য রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছেন।

চুক্তি সই হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি খুলছে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে।

কিন্তু জেরুজালেমে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই সমঝোতায় ইসরায়েল আসলে কী পেল?

আর ওয়াশিংটনে প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্প কি মধ্যপ্রাচ্যে নিজের শান্তিচুক্তি রক্ষার জন্য সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রকেও চাপে ফেলতে প্রস্তুত?

এই দুই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে, ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সম্পর্ক সাময়িক অস্বস্তির মধ্যে আছে, নাকি সত্যিই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বন্ধু এখন চক্ষুশূল।

Most Popular