Sunday, July 26, 2026
Homeবাংলাদেশদুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতে ধস, অটুট চীনের

দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতে ধস, অটুট চীনের

দুই বছর আগে বাংলাদেশিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের গ্রহণযোগ্যতা প্রায় কাছাকাছি ছিল। কিন্তু এখন সেই পাল্লা চীনের দিকে ভারী হয়েছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার কারণেই এমনটা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্পর্কে বিশ্ববাসী কেমন ধারণা পোষণ করেন তার ওপর পিউ রিসার্চ সেন্টারের করা ২০২৪ এবং ২০২৬ সালের দুটি তুলনামূলক জরিপ থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

জরিপে দেখা যায়, ২০২৪ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের (৫২%) তুলনায় চীনের (৫৫%) গ্রহণযোগ্যতা সামান্য বেশি ছিল।

কিন্তু ২০২৬ সালের জরিপ বলছে, দুই দেশের এই গ্রহণযোগ্যতার ব্যবধান মাত্র দুই বছরে ৩ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৩০ শতাংশ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে; অর্থাৎ ব্যবধান বেড়েছে ১০ গুণ! তবে বাংলাদেশে চীনের গ্রহণযোগ্যতা খুব একটা বাড়েনি। সেই তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে পড়ে যাওয়ায় এই বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালে জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক (৫২%) বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। ২০২৬ সালে সেই হার মাত্র ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এখন চারজনের মধ্যে মাত্র একজন বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখেন।

জরিপ চালানো দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড, পোল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেনের পরই যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলাদেশে।

অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশিদের চোখে চীনের ভাবমূর্তি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে ৫৫ শতাংশ বাংলাদেশি চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা রাখতেন, ২০২৬ সালে তা সামান্য বেড়ে ৫৬ শতাংশ হয়েছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টার তাদের ২০২৬ সালের গবেষণার জন্য গত ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর এই জরিপ চালায়। অংশগ্রহণকারীদের কাছে এই দুই পরাশক্তি সম্পর্কে তাদের ‘খুবই ইতিবাচক, কিছুটা ইতিবাচক, কিছুটা নেতিবাচক নাকি খুবই নেতিবাচক’ ধারণা রয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল।

দুই দেশের নেতাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের চোখে আমেরিকার ভাবমূর্তির পতন আরও বেশি প্রকট।

২০২৪ সালের জরিপে প্রায় অর্ধেক (৪৭%) অংশগ্রহণকারী বিশ্বাস করতেন, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ‘বিশ্বপরিস্থিতির ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তই নেবেন’।

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সেই আস্থা প্রায় অর্ধেকে নেমে ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ওপর বাংলাদেশিদের আস্থা এই সময়ে ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬১ শতাংশ হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বাংলাদেশে আমেরিকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে—ফিলিস্তিনিদের সমর্থন না করা এবং বিদেশে জনকল্যাণমূলক কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়া।

তিনি বলেন, ইউএসএআইডির অর্থায়নে চলা অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রকল্প বিদেশে ওয়াশিংটনের সমর্থন আদায়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল।

তিনি বলেন, ‘এই সব কিছু মিলেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।’

বিশ্বজুড়ে একই চিত্র

দুই বছর আগেও বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেই বেশি পছন্দ করত। ২০২৪ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের ৩৫টি দেশের জরিপে দেখা যায়, ২২টি দেশের মানুষ চীনের চেয়ে আমেরিকার প্রতি বেশি ইতিবাচক ছিলেন।

কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই চিত্র একেবারেই পাল্টে গেছে। জরিপ করা ৩৬টি দেশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশের মানুষই এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনকে বেশি ইতিবাচক মনে করে। মাত্র ছয়টি দেশ এখনো ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে আছে এবং পাঁচটি দেশে মতামত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত।

বেশির ভাগ দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কমেছে, কেবল ইসরায়েল ও হাঙ্গেরি এর ব্যতিক্রম।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ থেকেই এই পরিবর্তনের মাত্রা বোঝা যায়। ২০২৪ সালেও প্রতি ১০ জন দক্ষিণ কোরিয়ানের মধ্যে প্রায় ৮ জন যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতেন। ২০২৬ সালে তা নেমে এসে চারে দাঁড়িয়েছে।

অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বিশ্বজুড়ে আমেরিকার ভাবমূর্তিতে ধসের পেছনে ১৯৯০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিয়মভিত্তিক উদার বৈশ্বিক ব্যবস্থার ক্ষয়কে দায়ী করেছেন। তিনি জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানকে এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় না দিয়ে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের দিকে ঝোঁক, আক্রমণাত্মক অভিবাসনবিরোধী অবস্থান এবং মার্কিন রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান বর্ণবাদ ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের কারণেই আমেরিকার বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে দুটি দেশ বিপরীত দিকে হাঁটছে; ভারত ও ফিলিপাইনের সাধারণ মানুষ এখনো চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেই বেশি পছন্দ করে।

জরিপে দেখা যায়, মাত্র ১৫ শতাংশ পাকিস্তানি যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন, যেখানে ৯০ শতাংশ মানুষ চীনের পক্ষে। এটি ২০২৬ সালের জরিপে রেকর্ড করা সবচেয়ে বড় ব্যবধান। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কার মানুষও এখন চীনের দিকেই বেশি ঝুঁকেছে।

উন্নত দেশগুলোয় বেশি কমেছে সমর্থন

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর তুলনায় উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মনোভাব আরও বেশি নেতিবাচক হয়েছে। ২০২৪ সালে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর লোকজন চীনের (২৮%) চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে (৫৭%) অনেক বেশি ইতিবাচক চোখে দেখতেন।

কিন্তু ২০২৬ সালে ওই সব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা ১৯ শতাংশ পয়েন্ট কমে ৩৮ শতাংশে নেমে আসে। বিপরীতে চীনের গ্রহণযোগ্যতা ১২ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়।

এই পরিবর্তনের বড় একটি উদাহরণ কানাডা। ২০২৪ সালে বেশির ভাগ কানাডিয়ান যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতেন, যেখানে চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা রাখতেন মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে চিত্র উল্টে গেছে; এখন যুক্তরাষ্ট্রের (৩৩%) চেয়ে চীনের (৪৪%) প্রতি কানাডিয়ানদের মনোভাব বেশি ইতিবাচক।

একইভাবে সিঙ্গাপুর, স্পেন, গ্রিস, ইতালিসহ বেশ কয়েকটি উচ্চ আয়ের দেশে লোকজন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনকে বেশি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় শুরুতে চীনের পক্ষে এই ব্যবধান বেশ কম ছিল। কিন্তু ২০২৬ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্যতা কমা এবং চীনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার কারণে চীন এখানে অনেক বড় ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

জরিপ করা প্রায় ৯০ শতাংশ মধ্যম আয়ের দেশেই মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনকে বেশি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এই তালিকায় ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, পেরু এবং আর্জেন্টিনার মতো নানা অঞ্চলের দেশ রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী জনমতের দিক দিয়ে চীন কেন এগিয়ে যাচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, মূলত সেই শূন্যস্থানই পূরণ করছে বেইজিং।

তিনি বলেন, ‘চীনের এখন শক্তিশালী আর্থিক সক্ষমতা, অবকাঠামো উন্নয়নের ভালো রেকর্ড এবং আরও কার্যকর পাবলিক ডিপ্লোমেসি রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইস্যুতে নীরব থাকলেও চীন এখন বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলোতে, বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে অনেক বেশি সোচ্চার হয়েছে।

Most Popular