Saturday, August 15, 2026
Homeবিদেশদক্ষিণ লেবাননে ইচ্ছাকৃতভাবে দাবানল সৃষ্টি করছে ইসরায়েল, দাবি দমকলকর্মীদের

দক্ষিণ লেবাননে ইচ্ছাকৃতভাবে দাবানল সৃষ্টি করছে ইসরায়েল, দাবি দমকলকর্মীদের

এর আগে গাজায় ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। এবার একই ধারায় লেবাননে প্রাকৃতিক পরিবেশকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে দেশটির বিরুদ্ধে।

দক্ষিণ লেবাননের দমকলকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ওই অঞ্চলে ইচ্ছাকৃতভাবে দাবানল সৃষ্টির অভিযোগ করেছেন।

তাদের দাবি, ইসরায়েলি বোমা হামলায় সৃষ্ট আগুনে বনাঞ্চল পুড়ে যাচ্ছে।

এক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি পরিকল্পিত ‘পরিবেশহত্যা’, যা পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর শামিল।

আজ বুধবার যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই লেবাননের প্রাকৃতিক পরিবেশকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েল। সাম্প্রতিক সপ্তাহের দাবানলগুলো তাদের এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধকৌশলের অংশ।

মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননের খিয়ামের বাইরে একটি বনাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ফ্লেয়ার নিক্ষেপ করার পর সেখানে আগুন ধরে যায়। দমকলকর্মীরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে কাছাকাছি এলাকায় ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার পর নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দমকলকর্মীরা ওই এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।

নাবাতিয়েহ অঞ্চলের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান হুসেইন ফাকিহ এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের বেশির ভাগ অভিযানের উদ্দেশ্য থাকে আগুন নেভানো। ইতোমধ্যে বিশাল বনাঞ্চল পুড়ে গেছে। সঠিক পরিসংখ্যান আমার কাছে নেই, তবে ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি এলাকাগুলোর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জমি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

গত ১৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দেয় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল। এতে দুই পক্ষের সংঘাত অনেকাংশে কমে গেলেও ইসরায়েলি সেনাদের কার্যক্রম থামেনি।

প্রায় দুই মাস কেটে গেলেও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি সেনাদের কার্যক্রমে আগুন ও দাবানলের ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। বিশেষত জলপাইবাগান ও কৃষিজমিতে এসব আগুন লাগছে।

বিষয়টি আগুন নেভানোর কাজে নিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবক ও দমকলকর্মীদের পোস্ট করা ভিডিও ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ফুটে উঠেছে।

দাবানলের প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।

ফাকিহ বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির পরপরই তারা এসব শুরু করেছে এবং প্রতিদিনই তারা অগ্নিসংযোগকারী বোমা ব্যবহার করছে। ছোট ড্রোন এসে দাহ্য পদার্থ ফেলে যায়। বনাঞ্চলে [সাদা] ফসফরাসের গোলা ছোড়া হয়। এর পাশাপাশি দিনের বেলায় আলোকসৃষ্টিকারী ফ্লেয়ারও ফেলা হয়, যাতে গাছপালায় আগুন ধরে যায়।’

দক্ষিণ লেবাননের অন্যান্য এলাকার দমকলকর্মী ও বাসিন্দারাও শুষ্ক ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চলে ইসরায়েলি গোলাবারুদ ও ড্রোনের মাধ্যমে একইভাবে আগুন লাগানোর কথা জানিয়েছেন। শুক্রবার ঘন বনাঞ্চলপূর্ণ দুটি এলাকায় ইসরায়েলি গোলাবারুদের কারণে বড় ধরনের দাবানল সৃষ্টি হয়। এর একটি সীমান্তের কাছে কাফারচৌবায় এবং অন্যটি জেজিন ও পশ্চিম বেকা উপত্যকার মধ্যবর্তী এলাকায়।

ওই এলাকার বেসামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্রের প্রধান সামির হারদান বলেন, শুক্রবার বিকেলে একটি ড্রোন বনাঞ্চলে গোলাবারুদ ফেললে কাফারচৌবার কাছে আগুন ধরে যায়। শনিবার আগুন নেভানোর পর রোববার একটি দ্বিতীয় ড্রোন আবারও সেখানে আগুন লাগায় বলে জানান হারদান।

দমকলকর্মীদের তাদের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে লেবাননের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।

সেনাবাহিনী তাদের অনুরোধ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীসহ একটি ‘সংঘাত এড়ানোর’ সমন্বয়কারী দলের কাছে পাঠায়।

তবে আগুন নেভানোর জন্য তাদের মাত্র দুটি স্থানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল; যেসব অন্যান্য এলাকায় আগুন জ্বলছিল, সেখানে নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এসব আগুন লেবাননের পরিবেশের ওপর ইসরায়েলি হামলার একটি ধারাবাহিকতার অংশ। এর ফলে দেশটির বনাঞ্চল ও এসব বননির্ভর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে বলে তারা মত দিয়েছেন।

লেবাননের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন গ্রিন সাদার্নার্সের প্রতিষ্ঠাতা হিশাম ইউনেস বলেন, ‘এগুলো দীর্ঘদিনের বনাঞ্চল, যেখানে ওক গাছের পাশাপাশি প্রচুর উচ্চফলনশীল জাতের স্টোন পাইন গাছও রয়েছে। এসব বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিস্তৃত এই এলাকাটি পরিযায়ী পাখিদের চলাচল ও বিশ্রামের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ স্থান।’

ইউনেস ইসরায়েলি হামলাগুলোকে ‘পরিবেশহত্যা’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে গোলাবারুদ, আগুন ও রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করে দক্ষিণ লেবাননের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে।

২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে সংঘাত শুরুর পর থেকেই ইসরায়েল বারবার লেবাননের বনাঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

এর আগের দিন হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার প্রতি সংহতি জানিয়ে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট ছুড়েছিল।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অতীতে দাবি করেছে, হিজবুল্লাহ তাদের যোদ্ধা ও সুড়ঙ্গ আড়াল করতে এসব বনাঞ্চল ব্যবহার করে থাকে।

পরিবেশবিদ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, আগুন এবং পরিবেশের ব্যাপক ধ্বংসের অন্যান্য কর্মকাণ্ড বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ইসরায়েলি সেনারা মধ্যযুগীয় নিক্ষেপযন্ত্র ‘ট্রেবুশে’ ব্যবহার করে লেবাননের সীমান্ত দেয়ালের ওপর দিয়ে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ ছুড়েছিল।

একই সময়ে লেবাননের সেনাবাহিনী কিছু ইসরায়েলি ড্রোনের ছবি প্রকাশ করে। সেগুলোতে বনাঞ্চলে দাহ্য পদার্থ ছড়ানোর জন্য ব্যবহৃত পাইপ যুক্ত করা ছিল।

ফেব্রুয়ারিতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছিলেন, ইসরায়েলি উড়োজাহাজ দক্ষিণ লেবাননের কৃষিজমিতে আগাছানাশক ছড়িয়েছে। ওই রাসায়নিকের সঙ্গে ক্যানসারের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে।

১ আগস্ট, সীমান্তবর্তী ইয়ারুন গ্রামের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা দেখতে পান, ইসরায়েলি সেনারা তাদের জলপাই ও ফলের বাগানের পাশাপাশি বাড়িঘরেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

সীমান্তের কাছে খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহর রমেইচ ও আইন এবেলের বাসিন্দারা দ্য গার্ডিয়ানকে আগুনের ছবি পাঠান।

ইয়ারুনের মেয়র হাফেজ ঘাশাম বলেন, ‘তারা ইতোমধ্যে পুরো গ্রামটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এরপর তারা গাছগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই নির্দিষ্ট এলাকায় শুধু জলপাইগাছগুলোই অবশিষ্ট ছিল—বড় বড় বাগান, যেখানে অনেক পুরোনো জলপাইগাছ ছিল। তারা সেখান থেকে আগুন শুরু করে। এরপর আগুন গ্রামের প্রান্তজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।’
 

Most Popular