Tuesday, June 16, 2026
Homeবিনোদনটেলিভিশন নাটক এ দেশের মধ্যবিত্তের রুচি তৈরি করে দিয়েছিল

টেলিভিশন নাটক এ দেশের মধ্যবিত্তের রুচি তৈরি করে দিয়েছিল

টেলিভিশন নাটকের সেকাল-একাল। সেকালের নাটক কেমন ছিল? এ কালের নাটকই বা কেমন হচ্ছে? এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে  একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। নাটকের সেকাল-একাল ছাড়াও এতে উঠে আসে নানা বিষয়। এতে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা-নির্মাতা মামুনুর রশীদ; ‘মনপুরা’খ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিম; নাট্যপরিচালক সোহেল আরমান, অনিমেষ আইচ ও আরিফ খান; অভিনয়শিল্পী ও মঞ্চনাটকের নির্দেশক ত্রপা মজুমদার এবং নাট্যপরিচালক অরণ্য আনোয়ার ও সকাল আহমেদ। সঞ্চালনা করেন দ্য ডেইলি স্টারের স্টাফ রিপোর্টার শাহ আলম সাজু।

টেলিভিশন নাটকের সেকাল কেমন ছিল? এ কালের নাটকই বা কেমন হচ্ছে?

মামুনুর রশীদ: সেকালে মধ্যবিত্তের বিনোদনের অন্যতম সুন্দর জায়গা ছিল নাটক। ওই সময়ে টেলিভিশন নাটকের বড় সার্থকতা হলো, এটি মধ্যবিত্তের জন্য একটি রুচি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিল। তখনকার মধ্যবিত্তদের বাড়ির পর্দা কেমন হবে, সেই নকশাও নেওয়া হতো টিভি নাটক দেখে। তখন মানুষের রুচি তৈরিতে বড় প্রভাব রাখত নাটক। মুস্তাফা মনোয়ার, আবদুল্লাহ আল মামুন, আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম, মোস্তাফিজুর রহমানের মতো একঝাঁক মেধাবী মানুষের উপস্থিতি ছিল তখন। তাদের প্রত্যেকের চিন্তাভাবনা ছিল উঁচু মানের। নাটকের নির্মাণে ও অভিনয়ে অসাধারণ মেধার ছোঁয়া ছিল। কার চেয়ে কে ভালো করতে পারেন, তা নিয়ে পরিচালকদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা হতো। মুস্তাফা মনোয়ার শিশুদের জন্য কাজ করতেন। টেলিভিশনে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ছোট্ট একটা ঘর থেকে লাইভ অনুষ্ঠান হতো। ধীরে ধীরে অনেক কিছু হলো। আমাদের চাওয়া ছিল, কবে প্রাইভেট চ্যানেল আসবে, বাইরের পরিচালকেরা কাজ করতে পারবেন। তা–ও হলো। একুশে টেলিভিশন এলো। সাইমন ড্রিং দারুণ ভূমিকা রাখলেন। সংবাদ ও নাটকে দারুণ কাজ হলো। কাজেই জোর দিয়ে বলব, টেলিভিশন নাটক এ দেশের মধ্যবিত্তের রুচি তৈরি করে দিয়েছিল।

গিয়াস উদ্দিন সেলিম: একুশে টেলিভিশন দিয়ে আমার নাটক পরিচালনা শুরু। প্রথম একটি সাত পর্বের নাটক করেছিলাম, দর্শকেরা তা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছিলেন। নাটকগুলো কেমন হবে সেই সিদ্ধান্ত নিতেন অনুষ্ঠানপ্রধান। একটা সময় দেখলাম অনুষ্ঠানপ্রধান বলে কিছু নেই, তার জায়গায় চলে এলেন ‘হেড অব সেলস’। এর আগে আমরা কখনোই দেখিনি যে টিভি চ্যানেল শিল্পী নির্বাচন করে দেবে। পরিচালকেরাই সিদ্ধান্ত নিতেন নাটকে কারা থাকবেন। ‘হেড অব দ্য প্রোগ্রাম’–এর জায়গায় যখন ‘হেড অব দ্য সেলস’ প্রধান ভূমিকা পালন করা শুরু করল, তখন থেকেই অমুক-তমুক শিল্পীকে নেওয়ার চাপ শুরু হয়। এরপরই টেলিভিশন নাটকের ধস নামে। টেলিভিশন মালিকেরা সব সময় নগদ লাভ খুঁজতেন, এটাও ধ্বংসের অন্যতম কারণ। পাশের দেশে টেলিভিশন দিয়ে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করেন, কিন্তু আমরা তা করতে পারছি না। টেলিভিশন নাটকে এখন চিত্রনাট্য (স্ক্রিপ্ট) লাগে না, সংলাপ লাগে না, সেকালে এগুলো লাগত। কারিগরি সুবিধাও এখন সেভাবে লাগে না। এখন ওরা দল বেঁধে মাঠে যায় এবং যার যার মতো সংলাপ দেয়। এটা যখন দলগতভাবে শুরু হয়, তখন নাটকের ক্ষতি বেশি হয়। বর্তমানে টেলিভিশন নাটকের বাজেট খুবই কম, তার চেয়ে ইউটিউব নাটকের বাজেট বেশি। ২০১০ সালে ২০ মিনিটের পর্বের জন্য এক লাখ টাকা বাজেট পেতাম, এখন কত পাচ্ছে? বাজেট তো বাড়েইনি, উল্টো খরচ বহুগুণ বেড়েছে। সেকাল আর একালের পার্থক্য অনেক।

সোহেল আরমান: আমরা কাদের দেখে শিখেছি? মামুনুর রশীদ কাকাদের দেখে শিখেছি। আমার বাবা প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেনকে দেখে শিখেছি। সেকালে টেলিভিশন নাটকে প্রচণ্ড রকমের রুচির বিষয়টি ছিল, সাহিত্যের একটি ব্যাপার ছিল। ১৯৯২ সালে বিটিভিতে যখন প্রথম নাটক লিখি, ১০ রাত ঘুমাতে পারিনি। কারণ, আমার স্ক্রিপ্ট দেখবেন দেশের বড় বড় মানুষেরা।

আগে খুব সুন্দর সময় ছিল। সেই সুন্দর সময় থেকে নাটক কী করে এত নিচে নেমে গেল, বুঝতে পারি না। একুশে টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমার নাটক পরিচালনায় ছন্দপতন ঘটে। তারপর আমি আর বুঝিনি কী ধরনের নাটক নির্মাণ করলে ‘ভিউ’ হবে বা হবে না। এই ‘ভিউ’–এর চিন্তা করতে করতে আমরা নিজস্ব পরিচয় হারাতে বসেছি। এখন ভাবি, কী দিয়ে শুরু করেছিলাম আর কোথায় আছি। ‘ভিউ’ আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? যারা নাটকে স্পনসর করেন, আমি ভাবি কী করে এগুলো স্পনসর পান? রুচির ব্যাপার আছে। তারা এমন কিছু নাটকে স্পনসর করেন, তা দেখে ভাবি কীভাবে এগুলো সম্ভব! বাজারে গেলে তো ভালোটাই আগে দেখি, তাই না? এতটা ছন্দপতন কী করে হলো? কোথায় যেন কী হয়ে গেল। এখন শুধু ভিউয়ের চিন্তা। এ দেশে কোনো কিছু নষ্ট না হলে কেউ তা নিয়ে সেভাবে ভাবে না।

ত্রপা মজুমদার: বর্তমান সময়ে এই ইন্ডাস্ট্রিতে দক্ষ, মেধাবী, স্মার্ট চিন্তার অধিকারী প্রচুর মানুষ আছেন, যারা ভালো কাজ করেন। কিন্তু তারা কেউ টেলিভিশনে কাজ করছেন না। এই কারণটাই হয়তো খুঁজে দেখার বিষয়। টেলিভিশন মাধ্যমটা যেভাবে ধুঁকছে, টেলিভিশন নাটকও সেভাবে ধুঁকছে। কারণ, যারা আসলেই কাজটি করতে পারেন, তারা এই মাধ্যমে আগ্রহী হচ্ছেন না বা কাজ করতে পারছেন না। কেন পারছেন না? টাকাটাই কি এর মূল কারণ? টাকাটা একটা অন্যতম কারণ। ভালো প্রডাকশনের জন্য যে অর্থের দরকার হয়, টেলিভিশন মিডিয়াগুলো তা দেয় না বা দিতে পারে না। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও সেভাবে টিকে (সার্ভাইভ) থাকতে পারছে না। একতরফাভাবে দোষারোপ করার আগে আমাদের দেখতে হবে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নিজেরাই চলতে পারছে না। তারা ইনভেস্ট করতে পারে না বলে ভালো পরিচালকেরা সেদিকে যান না, ভালো শিল্পীরাও কাজ করেন না। ফলে এই খারাপটা নিয়েই টেলিভিশনকে চলতে হচ্ছে। টেলিভিশন মিডিয়াকে কীভাবে বাঁচাতে হবে, সেই জানার ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের দক্ষতার ঘাটতি আছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নাটকের কথা যদি বলি, তবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো গল্পের। ভালো কনটেন্ট ছাড়া যত বড় নির্মাতাই হোন না কেন, ভালো কিছু হবে না। যখন আমি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজ দেখি, তখন ভাবি এত ভালো ভালো কাজ হচ্ছে! তাহলে টেলিভিশনে বাধা কোথায়?

আরিফ খান: আমি প্রথম নাটকের জন্য যখন এনটিভিতে যাই, তখন তারা সেটি নেয়নি। ওই নাটকে হুমায়ুন ফরীদি, সুবর্ণা মুস্তাফা, বিপাশা হায়াত ছিলেন। তারা বলে, আগে নাটক বানান, তারপর দেখব। এই হচ্ছে আমার অভিজ্ঞতা। আর এখন? এখন নাটকের কথা নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমেই মার্কেটিংয়ের মানুষেরা জিজ্ঞেস করেন, নাটকে কে কে আছেন? সেকালেও যেমন ভালো নাটক হয়েছে, এখনো প্রচুর ভালো নাটক হচ্ছে। অনেক ভালো গল্পের নাটক হচ্ছে, দর্শকেরা সেসব দেখছেন। গত ঈদে তৌকীর আহমেদের লেখা ‘জোহরা বেগমের ইচ্ছাপত্র’ নামে একটি নাটক পরিচালনা করেছি। দর্শকেরা এই নাটকে সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করেছেন, কত প্রশংসা করেছেন। কাজেই দুই সময়েই ভালো নাটক হচ্ছে। খারাপ নাটক যে হচ্ছে না, তা নয়। আগে একটি মাত্র চ্যানেল ছিল আর এখন অনেক চ্যানেল।

অনিমেষ আইচ: আগে নাটকের কী সুন্দর সুন্দর নাম ছিল! ভাবতেই মন ভালো হয়ে যায়। ‘হলুদের সবুজ ব্যাধি’ নামে একটি নাটক ছিল, অসাধারণ নাম। আর এখনকার নাটকের নাম? আমি দুই-চার বছরের মধ্যে টেলিভিশন নাটক দেখিনি। কেন দেখব? বিশেষ করে ইউটিউবে নাটক দেখি না। অপশন থাকতে আমি ভালো কাজটাই তো দেখব। আমার কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রের পলিসি ঠিক করতে হবে। অমুককে নাটকে নিতে হবে, তমুককে নিতে হবে—কেন? নাটকের এত জঘন্য নাম কেন? ছোটবেলায় দেখেছি কত ভালো ভালো নাটক। ‘দখিনের জানালা’ নামের নাটকটি দেখেছি। মামুনুর রশীদের ‘সময় অসময়’ কত সুন্দর নাটক! রাষ্ট্রকে বোঝাতে হবে, ভাই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। মার্কেটিং আর সেলসের পলিসির কারণে টেলিভিশন আজ ডুবতে বসেছে।

দর্শকদের কি আমরা অবমূল্যায়ন করছি?

ত্রপা মজুমদার: ভালো-খারাপ পরের কথা। তবে মানুষ কী চায়, তা বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসব প্রমাণ করেছে। আমরা প্রথমেই বাণিজ্যিক চিন্তা করছি। সবাই না হলেও কেউ কেউ করছেন। খুব ভালো কাজ হচ্ছে, তবে হয়তো টেলিভিশনে হচ্ছে না। এই টেলিভিশন নিয়েই চিন্তার বিষয়।

অরণ্য আনোয়ার: সে আমলে মহৎ ও ভালো কাজ হয়েছে, তা অস্বীকার করছি না। এখন চ্যানেল অনেক। আমাকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে হইচই থেকে শুরু করে অনেক বড় বড় প্ল্যাটফর্মের সাথে। মানুষের টেলিভিশন দেখার ও পত্রিকা পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ কী অসাধারণ কাজ! দেখে মুগ্ধ হয়েছি। টেলিভিশনে একাল দেখি না, সেকাল দেখি। টেলিভিশন আমরা কেউই দেখি না। তবে সব সময় তারকা লাগে না। ‘শাটিকাপ’ দেখেছি, মুগ্ধ করেছে। ভালো অভিনেতা বা বড় পরিচালক সব সময় লাগে না, ভালো কনটেন্ট লাগে। কনটেন্ট ভালো হলে দর্শকেরা তা দেখবেনই, সন্দেহ নেই।

সকাল আহমেদ: এ দেশের নাটক ভালো করার উপায় কী? এসব ভাবতে হবে। আমি মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখি। আমি আসলে কী করছি, কেন করছি! পেশার জন্য করতে হচ্ছে, যা ভেবে মাঝে মাঝে দুঃখ হয়। আমাকে শিল্পীরা বলে দিচ্ছেন মেকআপম্যান অমুককে নিতে হবে, ক্যামেরাম্যান তমুক হবেন। এসব গল্প শুনি। আমার সঙ্গে না হলেও কারও কারও সঙ্গে হচ্ছে। আমরা এমন হয়ে গেলাম! মার্কেটিং থেকে বলা হচ্ছে অমুক শিল্পীকে নিতে হবে। এই অবস্থার মধ্যে আমরা নাটক বানাচ্ছি আর আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি। সেকালে নিশ্চয়ই নাটকে এমনটা ছিল না।

ত্রপা মজুমদার: ভালো-খারাপের মূল্যায়ন ভিউ দিয়ে হবে এখানটায় আমি ভিন্নমত পোষণ করি। ভালো কাজ সব সময় জনপ্রিয় নাও হতে পারে। ভিউ দিয়ে ভালো কাজ নির্ধারণ করা যাবে না।

এযুগেও টেলিভিশনের কি দরকার আছে?

মামুনুর রশীদ: অবশ্যই আছে। শ্রীলঙ্কায় আছে, পাশের দেশে আছে, আরও অনেক দেশেই টেলিভিশন আছে। একটা সিরিয়াল ধরলেই এক শ মানুষ সেখানে জীবিকা নির্বাহ করেন। আমাদের পিকনিকে গাড়ির জায়গা দিতে পারি, এত পরিচালক-প্রযোজক-শিল্পী। এটা খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ৩০ বছরের মধ্যেই এত সব হয়েছে। এ জন্য বলব টেলিভিশনের দরকার আছে। দেখুন, সেকালে টেলিভিশন নাটকের জন্য আমরা চার দিন রিহার্সেল করেছি। এখন তো রিহার্সেল নেই বললেই চলে। টিভি স্টেশনগুলোর মূল সমস্যা হচ্ছে, যারা মালিক তারা একেবারেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত না। ফরিদুর রেজা সাগরসহ দুই-একজন ছাড়া বেশির ভাগ মালিকই এ পেশার মানুষ নন।

Most Popular