Wednesday, July 15, 2026
Homeবাংলাদেশছয় মাসে ১৭৩ জনকে পুশ ইন, বিএসএফের হাতে নিহত ৯: এইচআরএসএস

ছয় মাসে ১৭৩ জনকে পুশ ইন, বিএসএফের হাতে নিহত ৯: এইচআরএসএস

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গত ছয় মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ৩২টি হামলায় ৯ জন নিহত, ৩৫ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জন গুলিবিদ্ধ ছিলেন বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।

আজ মঙ্গলবার এইচআরএসএসের প্রকাশ করা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে (জানুয়ারি-জুন) এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ৩৮ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আটক করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে অন্তত ১৭৩ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে। এ ছাড়া, ৪১৬ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়েছে, যা বডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয়রা প্রতিহত করেছে।

অপরদিকে, সিলেট সীমান্তে খাসিয়া সম্প্রদায়ের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন এবং সীমান্তে একজনের মরদেহ পাওয়া গেছে।

২০২৫ সালের একই সময়ে সীমান্তে ৪০টি ঘটনায় বিএসএফের গুলিতে ১৪ জন বাংলাদেশি নিহত, ২০ জন আহত এবং ২৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস।

এইচআরএসএ আরও জানায়, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত, ৫ জন আহত, ৫ জন গুলিবিদ্ধ এবং ৮০ জনকে আটক করা হয়েছে।

এ ছাড়া, সীমান্তবর্তী এলাকায় আরাকান আর্মির পুতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে ৬ জন নিহত ও ৩ জন আহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৫৬

সারাদেশে গত ছয় মাসে রাজনেতিক ও নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৫৬ জন নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া, সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫ হাজার ২৪৬ জনের অধিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত ও হামলার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মূলধারার ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের অর্ধবার্ষিক (জানুয়ারি-জুন) মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫৬ জন নিহত ও ৫ হাজার ২৪৬ জনের অধিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।

২০২৫ সালে ৫২৯টি ঘটনায় ৭৯ জন নিহত ও ৪ হাজার ১২৪ জন আহত ছিলেন বলেও জানিয়েছে এইচআরএসএস।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিহত ৫৬ জনের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন (৬৬ শতাংশ), জামায়াতের ৬ জন (১১ শতাংশ) ও আওয়ামী লীগের ৩ জন এবং অন্যান্য ৮ জন, চরমপন্থী একজন এবং সাধারণ নারী একজন। এ ছাড়া, ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনার ৬৭৩টিই (৮১ শতাংশ) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে।

এদিকে, ছয় মাসে সহিংসতার ৮৩০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২৭৩টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৯২ জন ও নিহত হয়েছেন ৩১ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ২৯০টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন এক হাজার ৮৫২ জন ও নিহত হয়েছেন ১০ জন, বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৭৭টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪৬৪ জন এবং নিহত হয়েছেন ৭ জন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৫০ জন, আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে ৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত ৫১ জন এবং বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে ৯৭টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৫১ জন।

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৬৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় কমপক্ষে ৩৮ জন নিহত ও ৯০ জন আহত হয়েছেন। নিহত ৩৮ জনের মধ্যে বিএনপির ২০ জন, আওয়ামী লীগের ৯ জন, জামায়াতের ৪ জন ও অন্যান্য দলের সদস্য ৫ জন।

এসময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় শতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া, দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৯ শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, বিভিন্ন দলের সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার তথ্য উল্লেখ করে আরও বলা হয়, গত ছয় মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক ৩৯৬টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া, নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬০০টিরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ১৩ জন নিহতের মধ্যে বিএনপির ৯ জন, আওয়ামী লীগের একজন, জামায়াতের দুজন এবং একজনের রাজনৈতিক পরিচয় অজানা।

সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক সংঘর্ষ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১১৯টি ঘটনায় অন্তত ৯০৫ জন আহত এবং ৮ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ২৩২টি ঘটনায় অন্তত এক হাজার ৪২৯ জন আহত এবং ৪ জন নিহত হয়েছেন।

বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে ৩টি ঘটনায় ৩ জন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষে ১৬টি ঘটনায় ১৪১ জন আহত হয়েছেন এবং বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে ১৭টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৩ জন। অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘটিত ১০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮ জন।

এ ছাড়া, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৬ মাসে অন্তত ১২টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৮ জন নারী হেনস্তার শিকার হয়েছেন এবং ৬ জন নারী আহত হয়েছেন। হেনস্তার শিকারদের মধ্যে ১৭ জন জামায়াত সমর্থক এবং একজন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমর্থক নারী রয়েছেন।

রাজনৈতিক মামলা ও আটকের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ১৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

এসময়ে রাজনৈতিক মামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ৩ হাজার ৬৭ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অন্তত ২ হাজার ৪১৫ জন, বিএনপির নেতাকর্মী ৪৯৭ জন, জামায়াতের ১০৯ জন এবং এনসিপির ২৬ জন। এ ছাড়া, এই সময়ে সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

২০২৫ সালের একই সময়ে ৮ হাজার ৫৬৬ জনের নাম উল্লেখ ও ১৫ হাজার ৯৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে ১১৬টি মামলা দায়ের করা হয়। এ ছাড়া, একই সময়ে বিভিন্ন মামলায় ২৩ হাজার ১২১ জন গ্রেপ্তার হন, যার মধ্যে ২২ হাজার ৯৯৫ জনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস।

মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ৪০টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দেয়। এতে ৩১১ জন ব্যক্তি আহত ও ৩৮ জন আটক হন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

Most Popular