Wednesday, July 1, 2026
Homeমতামতহারিয়ে যাওয়ার আগে সংরক্ষণ: আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবসে আমাদের ভাবনা

হারিয়ে যাওয়ার আগে সংরক্ষণ: আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবসে আমাদের ভাবনা

রোমানা রহমান: প্রতিটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং নাগরিক অধিকারের ভিত্তি নির্মিত হয় তার সংরক্ষিত দলিল-দস্তাবেজ, নথি ও তথ্যভাণ্ডারের ওপর। একটি দেশের আর্কাইভ কেবল অতীতের স্মৃতিকে ধারণ করে না; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্য, প্রমাণ ও জ্ঞানের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবেও কাজ করে। তাই আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে আজই।

প্রতি বছর ৯ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস (International Archives Day)। এ উপলক্ষে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক আর্কাইভস কাউন্সিল (আইসিএ) ৮ থেকে ১২ জুন International Archives Week পালন করেছে। এবারের প্রতিপাদ্য “Archives for Justice: Rights, Memory and Futures”। এই প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য গভীর। কারণ আর্কাইভ শুধু অতীতের দলিল সংরক্ষণ করে না; এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার ভিত্তি নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

একজন শিক্ষক হিসেবে প্রতি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন আর্কাইভ ও তথ্যসংরক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনের সুযোগ হয়। শ্রেণিকক্ষে আমরা রেকর্ডস ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল আর্কাইভ, মেটাডেটা, ISO 15489 এবং ডিজিটাল প্রিজারভেশনের মতো আন্তর্জাতিক মান ও আধুনিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখনও পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও ঐতিহাসিক নথি এখনো কাগজনির্ভর ব্যবস্থায় সংরক্ষিত। ডিজিটাইজেশন কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই ধীরগতির; আধুনিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সীমিত এবং প্রশিক্ষিত জনবলেরও অভাব রয়েছে। ফলে তাত্ত্বিক শিক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাস অসাধারণ সমৃদ্ধ। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিকাশ, সামাজিক পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অগণিত দলিল আমাদের জাতীয় সম্পদ। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এসব মূল্যবান তথ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একটি নথি একবার নষ্ট হয়ে গেলে তার তথ্যগত সত্যতা ও ঐতিহাসিক মূল্য চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাই আর্কাইভ সংরক্ষণকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

বর্তমান বিশ্বে আর্কাইভ ব্যবস্থাপনা দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্রিজারভেশন সিস্টেম এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মেটাডেটা ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে তথ্যকে নিরাপদ, অনুসন্ধানযোগ্য ও ব্যবহারোপযোগী রাখা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশকেও এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর আর্কাইভ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ আর্কাইভ পেশাজীবী তৈরি, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আর্কাইভ ও রেকর্ডস ম্যানেজমেন্ট শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।

আর্কাইভকে কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকেও নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ নথি, তথ্য ও স্মারক সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভও একটি দেশের সামগ্রিক ইতিহাস ও সামাজিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—বাংলাদেশে গড়ে উঠুক একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আর্কাইভ ব্যবস্থা। ইতিহাস সংরক্ষণ, তথ্যের অধিকার নিশ্চিতকরণ, গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আর্কাইভকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হোক। কারণ, আজ আমরা যা সংরক্ষণ করব, আগামী প্রজন্ম সেখান থেকেই খুঁজে পাবে তাদের ইতিহাস, পরিচয়, অধিকার এবং ভবিষ্যৎ পথচলার প্রেরণা।

লেখক: রোমানা রহমান, সিনিয়র লেকচারার, ইনফরমেশন স্টাডিজ বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

Most Popular