চঞ্চল চৌধুরী ও মোশাররফ করিম—বাংলাদেশের অভিনয়জগতের দুই শীর্ষ তারকা। দুজনেই মঞ্চ থেকে উঠে এসেছেন। একজনের জন্ম পাবনার প্রত্যন্ত গ্রামে, আরেকজনের বরিশালে। অভিনয়ে আসার আগে দুজনে শিক্ষকতাও করেছেন। বন্ধুত্বের বয়সও ২৫ বছরের বেশি।
দেশের বাইরে, বিশেষ করে কলকাতাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলা ভাষাভাষী দর্শকদের মধ্যেও তারা ব্যাপক জনপ্রিয়।
‘ভবের হাট’ ধারাবাহিকে প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করেন তারা। পরে ‘হাড়কিপ্টে’ ধারাবাহিকেও দুজনকে একসঙ্গে দেখা যায়। বড় পর্দায় প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করেন মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী পরিচালিত ‘টেলিভিশন’ সিনেমায়। সবশেষ ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপে চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রামে। পাবনার কামারহাট আমার গ্রাম। মোশাররফ করিমের জন্মও বরিশালের গ্রামে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অনেক মিল। খুব ভালো বন্ধু আমরা।’
মোশাররফ করিম সম্পর্কে চঞ্চলের মূল্যায়ন, ‘মোশাররফ করিম সর্বক্ষেত্রে সফল একজন মানুষ। অভিনয়ের সব মাধ্যমেই সফল। এটা সহজ কথা নয়। তার যোগ্যতা ছিল, সাধনা করেছেন, থিয়েটার করেছেন, তারপর এই জায়গায় এসেছেন। এক বছর কিংবা দুই বছরের জার্নি নয়। বছরের পর বছর ধরে অভিনয়ে আছেন।’
এরপরই যোগ করেন, ‘এদেশে আরেকজন মোশাররফ করিমের জন্ম নেওয়া সম্ভব না।’
গ্রামের শৈশব, নদী আর বেড়ে ওঠার স্মৃতিও উঠে আসে তার কথায়। চঞ্চল বলেন, ‘মোশাররফ করিমের বাড়ির কাছে একটা নদী আছে। আমার বাড়ির কাছেও একটা নদী আছে। দুজনেই নদীতে সাঁতার কাটা মানুষ। সেখান থেকেই তো আমাদের জার্নি শুরু। আজও একই পথে আছি আমরা।’
তিনি বলেন, ‘মোশাররফ করিম এখন এদেশের অন্যতম প্রধান অভিনেতা। এটা একদিনে সম্ভব হয়নি। থিয়েটার করতে করতে শিখেছেন। আমিও তাই করেছি। মহিলা সমিতি কিংবা গাইড হাউসে কত শত স্মৃতি আমাদের।’
চঞ্চল বলেন, তখন মোশাররফ করিম ‘নাট্যকেন্দ্র’ করতেন আর আমি ছিলাম ‘আরণ্যক নাট্যদলে’। ‘ওর নাটকের শো হলে আমরা দল বেঁধে যেতাম, আমার দলের শো হলে ওরাও আসতো। সেই সময় থিয়েটারের মানুষেরা ভীষণ ভালোবেসে এই কাজটি করতাম।’
ঢাকায় সংগ্রামের দিনগুলোর স্মৃতির কথাও বলেন অভিনেতা। তিনি বলেন, ‘একসময় দুজনেই গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে আসি। মোশাররফ করিম ঢাকায় একটি কোচিং সেন্টারে পড়াতেন। আমিও ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভে শিক্ষকতা করেছি। দুজনেরই ছাত্র আছে। কিন্তু আমরা কেউই থিয়েটার ছাড়িনি।’
তার ভাষ্য, ‘কথায় আছে, কখনো কখনো পথই গন্তব্যে নিয়ে যায়। আমরা দুজনও অভিনয়ের পথে নেমেছিলাম, সেই পথই এতদূর নিয়ে এসেছে।’
চঞ্চল আরও বলেন, ‘একজন মোশাররফ করিম হয়ে ওঠার গল্পটা আমি জানি এবং একজন চঞ্চল চৌধুরী হয়ে ওঠার গল্প তিনিও জানেন। আজকের মোশাররফ করিম হয়ে উঠতে অনেক সাধনা করতে হয়েছে।’
দীর্ঘ বন্ধুত্বের নানা স্মৃতিও উঠে আসে তার কথায়। তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের পূবাইলে একটা টিনের ঘরে বড় একটি রুম ছিল। সেখানে তিনটি চৌকি ছিল। আমি, মোশাররফ করিম, আ খ ম হাসান, শামীম জামান—চারজন শুটিং শেষে সেই ঘরে ঘুমাতাম। রাতভর আড্ডা দিতাম। কত স্মৃতি মনে পড়ে!’
তিনি বলেন, ‘প্রচণ্ড শীতের রাতে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করেছি। মোশাররফ করিম যেখানেই থাকেন, ভালো আড্ডা জমাতে পারেন।’
চঞ্চল বলেন, ‘তখন আমরা বেশি কাজ করতাম সালাহউদ্দিন লাভলু পরিচালিত নাটকে। তখনো সংসার জীবন শুরু করিনি। শুটিং শেষ হলেও শুধু আড্ডা দেওয়ার জন্য থেকে যেতাম।’
‘ভবের হাট’ নাটকের স্মৃতি টেনে তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের হোতাপাড়ায় শুটিং করেছি। দুপুরে ব্রেক হলে আমি আর মোশাররফ করিম ফুটবল খেলতে নেমে যেতাম। বৃষ্টি হলেও খেলতাম। রাতের শুটিং শেষে ব্যাডমিন্টনও খেলতাম।’
তিনি বলেন, ‘কি আনন্দের সময় মোশাররফ করিম আর আমি কাটিয়েছি, বলে শেষ করা যাবে না।’
‘হাড়কিপ্টে’ ধারাবাহিক নিয়েও স্মৃতিচারণ করেন চঞ্চল। তিনি বলেন, ‘দিনের পর দিন আমরা পূবাইলে শুটিং করেছি, থেকেছি। মহা আনন্দ নিয়ে শুটিং করেছি। মোশাররফ করিম এবং আমি জীবনের সেরা সময় কাটিয়েছি।’
চঞ্চলের মতে, মোশাররফ করিম এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, কলকাতাসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত মুখ। পৃথিবীর যেসব দেশে আমাদের দেশের মানুষ আছেন, তাদের কাছেও তিনি পরিচিত।
বড় পর্দায় একসঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বহু বছর পর আমরা ‘বনলতা এক্সপ্রেসে’ অভিনয় করেছি। এই সিনেমায় মোশাররফ করিম অসাধারণ অভিনয় করেছেন। ওর ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয়গুলোর একটি এটি।’
ব্যস্ততা বাড়লেও বন্ধুত্বে ভাটা পড়েনি বলেও জানান চঞ্চল। তিনি বলেন, ‘মোশাররফ করিম এখন প্রচণ্ড ব্যস্ত। আমিও। তারপরও আমাদের মধ্যে বন্ধনটা রয়ে গেছে। ভালোবাসার পারিবারিক সম্পর্ক রয়ে গেছে।’
সম্প্রতি নিজের বাসাতে একটি আড্ডার কথাও বলেন তিনি। ‘মোশাররফ করিমকে বলেছিলাম, চলে আসিস। রাতে স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিল। তারপর দারুণ আড্ডা জমে উঠেছিল। একসময় আড্ডার মধ্যমণি হয়ে ওঠে মোশাররফ করিম।’
চঞ্চল বলেন, ‘মোশাররফ করিম অভিনয়ের মধ্যমণি, আড্ডারও মধ্যমণি। যেখানেই আড্ডা দেন, সবাই ওর কথা মুগ্ধ হয়ে শোনে।’
শেষে আবারও বন্ধুর প্রতি নিজের মুগ্ধতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘অভিনয় ছাড়া আমরা কিছুই করিনি। অভিনয়কেই ভালোবাসি। মাঝে।’
