Wednesday, July 15, 2026
Homeবাংলাদেশমাজহারুল ইসলাম ও তার স্থাপত্য পরিসর

মাজহারুল ইসলাম ও তার স্থাপত্য পরিসর

মাজহারুল ইসলামের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইস স্থপতি, গবেষক ও লেখক নিকলাউস গ্র্যাবার তার রচিত গ্রন্থ ‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং: দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’ নিয়ে কথা বলেছেন আমিরুল রাজিব এবং নাঈম উল হাসানের সঙ্গে।

মাজহারুল ইসলাম (২৫ ডিসেম্বর ১৯২৩–১৫ জুলাই ২০১২) ছিলেন প্রথম পেশাদার বাঙালি স্থপতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আধুনিকতাবাদী স্থাপত্যের অন্যতম পথিকৃৎ। বাংলাদেশের স্থাপত্য অঙ্গনকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে তার অবদান অপরিসীম। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানান কাজের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্ব স্থাপত্যের মানচিত্রে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন।

সুইস স্থপতি নিকলাউস গ্র্যাবারের গ্রন্থ ‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং-দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’ মূলত স্থপতি মাজহারুল ইসলামের জীবন ও প্রভাববিস্তারী কর্মের ওপর একটি অনন্য প্রকাশনা। আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম প্রকাশিত এই মনোগ্রাফটির উদ্দেশ্য—দীর্ঘ সময় ধরে অগোচরে থাকা বাংলা ব-দ্বীপের এই স্থপতির কাজকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা।

বইটিতে মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যকর্মকে অত্যন্ত স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নানান ঐতিহাসিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং নথিপত্রের অভাবের কারণে বিশ্ব স্থাপত্য আলোচনায় মাজহারুল ইসলাম সেভাবে উঠে আসেননি। এ বইটি মূলত সেই শূন্যতা পূরণেরই একটি প্রচেষ্টা।

‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং’ মাজহারুল ইসলামকে এমন এক অগ্রগামী আধুনিকতাবাদী হিসেবে তুলে ধরেছে, যার কাজ কেবল আমাদের আঞ্চলিক গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না। তার স্থাপত্যে সমসাময়িক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু-সংবেদনশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নির্মাণশৈলী, স্থাপত্যের সামাজিক উদারতা, সার্বজনীন নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার, সমাজমুখী নকশা ও সমতাভিত্তিক কাজের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক চিন্তার দায় মুক্তি। বইটিতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি তার নির্মিত ও অ-নির্মিত প্রকল্পগুলোর বিশদ বিশ্লেষণ যুক্ত করা হয়েছে।

তথ্যনির্ভর ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষিত প্রবন্ধ, ভবনগুলির বর্তমান আলোকচিত্র এবং স্থপতির নিজ হাতে আঁকা স্থাপত্য নকশাগুলির মাধ্যমে এতে দেখানো হয়েছে—কীভাবে মাজহারুল ইসলাম তার সামাজিক ও পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি স্থাপত্যের উপকরণ, কাঠামো ও স্থানিক সিদ্ধান্তে রূপান্তর করেছিলেন।

গ্র্যাবারের নিজের তোলা আলোকচিত্রগুলোতে ফুটে উঠেছে, কীভাবে সময়ের সাথে ভবনগুলো বিবর্তিত হয়েছে। সেইসঙ্গে এ সংলগ্ন জীবন ও সংস্কৃতি কী করে মানুষ ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বইটির অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণালব্ধ তথ্য হলো, ১৯৮১-৮২ সালের ভেনিস আর্কিটেকচার বিয়েনালে মাজহারুল ইসলামের অংশগ্রহণ। এই বইয়ে যত্নের সঙ্গে বাছাই করা ১০টি প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা ও ছবি রয়েছে। এছাড়া, বইয়ের শেষাংশে মাজহারুল ইসলামের নির্মিত ও অ-নির্মিত প্রায় ১৬০টি প্রকল্পের একটি তালিকাও দেওয়া হয়েছে।

 

ক্যাপশন: ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন থেকে ‘কোয়ার্ট ভার্লাগ জিএমবিএইচ’ প্রকাশ করে ‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং, দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’ সম্পাদক: নিকলাউস গ্র্যাবার, লিথোগ্রাফি: জর্জ সিডলার, গ্রাফিক ডিজাইন: কার্লা ক্রামেরি। ছবি: কোয়ার্ট পাবলিশার্স।

৩১৯ পৃষ্ঠার এই বিশাল বইটি বস্তুনিষ্ঠ সমালোচক দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত। এতে একজন যুক্তিবাদী বিশ্বনাগরিক হিসেবে মাজহারুল ইসলামের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক ভাবনা এবং ব্যক্তি ও সামষ্টিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে কীভাবে তিনি সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন—তা এই বইয়ে চমৎকারভাবে দেখানো হয়েছে।

বইটির শেষে স্থপতি সাইফ উল হকের একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ রয়েছে যেখানে মাজহারুল ইসলামের জীবন, শিক্ষা, রাজনীতি ও সক্রিয়তা, তার প্রতিষ্ঠান ‘বাস্তুকলাবিদ’ এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ‘চেতনা সোসাইটি’ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

তার তৈরি করা এই ‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং’ আজকের দিনের স্থপতিদের জন্য শিক্ষণীয় একটি অধ্যায়; বিশেষ করে যারা জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক সমতা এবং স্থাপত্যের বিউপনিবেশায়ন নিয়ে কাজ করছেন।

ঢাকার ‘দুনিয়াদারি আর্কাইভ’-এ নিকলাউস গ্র্যাবারের সঙ্গে কথা বলেন আমিরুল রাজিব ও নাঈম উল হাসান। কথোপকথনে বইটির নির্মাণের গল্প, মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভের ভূমিকা, বিশ্ব স্থাপত্যে তার অবস্থান এবং তার নির্মিত স্থাপনা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

নিকলাউস গ্র্যাবার একজন সুইস স্থপতি, তিনি ইটিএইচ জুরিখ ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি ইউরোপ ও বাংলাদেশে প্রদর্শিত বিখ্যাত ‘বেঙ্গল স্ট্রিম’ প্রদর্শনীর প্রধান কিউরেটর ছিলেন। লুসার্ন ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টস-এ শিক্ষকতা করেছেন এবং লুসার্নে গ্র্যাবার অ্যান্ড স্টেইগার আর্কিটেক্টস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি। গবেষণা, সফর, প্রকাশনা, কর্মশালা এবং বক্তৃতার মাধ্যমে গ্র্যাবার বাংলাদেশের স্থাপত্য চর্চার সাথে নিরন্তর সম্পৃক্ততা বজায় রাখছেন। তিনি ‘বেঙ্গল স্ট্রিম: দ্য ভাইব্র্যান্ট আর্কিটেকচার সিন অফ বাংলাদেশ’ প্রকাশনার সম্পাদক এবং একই শিরোনামে ২০১৭ সালে ব্যাজেলের সুইস আর্কিটেকচার মিউজিয়ামে আয়োজিত প্রদর্শনীর প্রধান কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা ইউরোপ ও বাংলাদেশে প্রদর্শিত হয়েছিল।

 

ক্যাপশন: নিকলাউস গ্র্যাবার

আপনি গত ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশে আসছেন, লুই কানের সংসদ ভবনসহ নানা স্থাপনা নিয়ে কাজের মধ্য দিয়ে আপনি মাজহারুল ইসলামকে আবিষ্কার করেছেন। স্থপতি মাজহারুল ইসলামের কোন বিষয়টি আপনাকে আকৃষ্ট করল এবং তার কাজ নথিবদ্ধ করতে আপনি কেন এত সময় ও শ্রম দিলেন?

নিকলাউস গ্র্যাবার: এর অনেক কারণ রয়েছে। বর্তমানে স্থাপত্যের চিন্তাধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে—জলবায়ু পরিবর্তন, স্থাপত্যের বিউপনিবেশায়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে। আমরা এখন সবকিছু নতুন করে ‘আবিষ্কার’ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার মনে হয়, ইতিহাসের প্রতিটি পর্বেই এই বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে এবং আজও তা প্রাসঙ্গিক।

পঞ্চাশ বা ষাট বছর আগেও স্থাপত্য প্রাকৃতিকভাবেই টেকসই ছিল। কিন্তু সত্তরের দশকের শেষের দিকে এবং আশির দশকে নয়া-উদারনীতিবাদের উত্থানের ফলে স্থাপত্য তার মূল পথ হারিয়ে ফেলে। গত কয়েক দশকে আমরা এমন সব নির্মাণ দেখেছি যা শুধুই শক্তির অপচয় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বিবর্জিত।

মনে হচ্ছে, স্থাপত্যের প্রকৃত অর্থ কী, তা আমরা ভুলেই গেছি। হাজার হাজার বছর ধরে স্থাপত্য মানেই ছিল টেকটোনিক্স, যার অর্থ হলো পাথরে পাথরে, বিমে বিমে, কাঠামোতে সংযোগ স্থাপনের এক টেকসই ও যৌক্তিক প্রক্রিয়া।

 

ক্যাপশন: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাস। ছবি: নিকলাউস গ্র্যাবার

এই শিকড়ে ফিরে আসাটা জরুরি। এ কারণেই কিছু স্থপতি ও তাদের কাজ আরও বেশি মনোযোগের দাবি রাখে। আমাদের আছেন চার্লস কোরিয়া, বি. ভি. দোশী, অচ্যুত কানভিন্দে এবং জেফরি বাওয়া। তারা প্রত্যেকেই অসামান্য। কিন্তু আমার মতে, মাজহারুল ইসলামের মতো এত প্রভাবশালী আর কেউ ছিলেন না।

মাজহারুল ইসলাম এখানেই অনন্য। সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় অন্যদের চেয়ে তিনি অনন্য। তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন স্থাপত্য ছেড়ে দেওয়ার জন্য নয় বরং বৃহত্তর পরিসরে সমাজ গঠনে স্থাপত্যের লক্ষ্য পূরণের জন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্থপতিরা সমাজকে প্রভাবিত করেন না, বরং সমাজ আমাদের প্রভাবিত করে এবং সমাজের সেবায় আমাদের সেরাটাই দেওয়া উচিত। ২০১২ সালে আমি যখন প্রথম ঢাকায় আসি, তখন সবাই মাজহারুল ইসলামের কথা বলছিলেন। কিন্তু পশ্চিমা স্থাপত্য নিয়ে আলোচনায় তার নাম খুব একটা শোনা যেত না। তখনই আমার মনে হয়েছিল, তাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি কাজ হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বইটির জন্য আপনি কতগুলো প্রকল্প বেছে নিয়েছেন এবং বাছাই প্রক্রিয়া কেমন ছিল?

নিকলাউস গ্র্যাবার: এটি মূলত তার কাজের একটি কালানুক্রমিক ক্যাটালগ। আমি সারা বাংলাদেশ থেকে তার ১০টি উল্লেখযোগ্য প্রকল্প বেছে নিয়েছি। যেমন—জয়পুরহাট চুনাপাথর খনি ও সিমেন্ট কারখানার আবাসন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় ক্যাম্পাসগুলো। তিনি ব্যাপকভাবে বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করেছেন, যা বিশ্বজুড়ে স্থপতিদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না। অনেক স্থপতি জাদুঘর বা স্টেডিয়াম বানান, কিন্তু তিনি বড় আকারের সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে জোর দিয়েছিলেন যা বাংলাদেশের সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছে।

এছাড়া বইটিতে বড় সরকারি প্রকল্পগুলো বেছে নেওয়ার আরেকটি কারণ হলো ছোট বা ব্যক্তিগত প্রকল্পগুলো অনেক ক্ষেত্রে ধ্বংস বা পরিবর্তিত হয়ে গেছে, ফলে সেগুলোর সঠিক নথিপত্র বা ছবি পাওয়া কঠিন। এই ধরনের প্রথম বই হিসেবে আমি সেইসব বড় প্রকল্পগুলোকেই বেছে নিয়েছি, যেগুলো বাংলাদেশের সমাজে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে চলেছে। কারণ এগুলো জনসম্পৃক্ত প্রকল্প, কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়।

 

ক্যাপশন: ‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং, দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা। সৌজন্যে: কোয়ার্ট পাবলিশার্স।

আপনি মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যের নকশাগুলো কোথায় পেলেন?

নিকলাউস গ্র্যাবার: সবগুলো নকশা নেওয়া হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) ‘মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভ’ থেকে। সেখানে তার নকশার সবচেয়ে বড় সংগ্রহটি রয়েছে। ‘বেঙ্গল স্ট্রিম’ প্রদর্শনীর সময় থেকেই আমি তাদের সঙ্গে যুক্ত। বইটির কাজ করার সময় আমরা নকশাগুলোর মূল রূপ অক্ষুণ্ণ রাখতে লিথোগ্রাফির পেছনে প্রচুর সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছি।

আধুনিক স্থাপত্য আন্দোলনে মাজহারুল ইসলামকে আপনি কোথায় রাখবেন? তাকে বিশ্বের অন্যান্য আধুনিকতাবাদীদের সমান্তরাল ভাবার কারণ কী?

নিকলাউস গ্র্যাবার: আমেরিকা বা ইংল্যান্ডে পড়তে গিয়েছিলেন বলে তিনি আধুনিক ছিলেন ব্যাপারটা এমন নয়। আধুনিকতা সব জায়গায় সমান্তরালভাবেই বিকশিত হয়েছে। স্থাপত্যের অনেক আগেই এদেশের  সাহিত্যে আধুনিকতার চর্চা শুরু হয়েছিল। ১৮১৫ সালের দিকে ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ বা বাংলার নবজাগরণের সময় থেকেই এর সূচনা।

আমার কাছে মাজহারুল ইসলামের অবস্থান আলভার আলতো এবং মার্সেল ব্রুয়েরের মতো বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত আধুনিকতাবাদের প্রধান স্থপতিদের সাথে একই কাতারে। তারা আধুনিকতাবাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং তাদের নিয়ে শত শত বই লেখা হলেও মাজহারুল ইসলামকে নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোন বই প্রকাশিত হয়নি। তবে আমি কোনোভাবেই তাদের কাজের মধ্যে সরাসরি তুলনা করছি না। ব্রুয়ের তার নিজের প্রেক্ষাপটে চমৎকার কাজ করেছেন, আর মাজহারুল ইসলামের কাজের ধরন ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অনন্য।

আমি শুধু এটুকু বোঝাতে চাইছি যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি চরমভাবে উপেক্ষিত ছিলেন। বিশ্ববাসীকে এটা জানানো দরকার যে, মাজহারুল ইসলামের মতো একজন গুণী স্থপতির অস্তিত্ব ছিল; আর সে কারণেই তাকে সঠিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

 

ক্যাপশন: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টার। ছবি: মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভ, ইউএপি

‘বেঙ্গল স্ট্রিম’ প্রদর্শনীতে আমরা যখন মাজহারুল ইসলামের করা নকশা ও তার স্থাপত্যের কিছু আলোকচিত্র প্রদর্শন করি, তখন সবার মাঝেই এক বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। সবাই অবাক হয়ে শুধু একটি কথাই বলেছিলেন, ‘আমরা এতদিন তার সম্পর্কে কেন জানতাম না?’ পশ্চিমা সমালোচকদের একটি আধিপত্যকামী ধারণা রয়েছে যে, আধুনিকতার ধারনাটাই পশ্চিম থেকে পূর্বে এসেছে—অর্থাৎ মাজহারুল ইসলাম, চার্লস কোরিয়া বা বিভি দোশী’রা শুধু লা করবুজিয়্যের কে অনুকরণ করে নিজেদের মতো রূপ দিয়েছেন। আমি সেটা একদমই মনে করি না।

মাজহারুল ইসলামের চারুকলা ইনস্টিটিউট লা করবুজিয়্যেরের ‘ভিলা স্যাভয়’-এর মতো কোনো পশ্চিমা সাদা বাক্স নয়। চারুকলা গড়ে উঠেছে বাংলার চিরায়ত প্যাভিলিয়ন ও বারান্দার ধারণা থেকে। পশ্চিমা অনেক আধুনিক স্থপতিই প্রাচ্য থেকে অনেক কিছু ধার করেছেন। ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইটকে ‘ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইট’ হতে জাপানে যেতে হয়েছিল।

করবুজিয়্যের তার বইয়ে আলো-ছায়ার খেলার উদাহরণ দিতে আমেরিকার একটি শস্যগুদামের ছবি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে কেউ একজন করবুজিয়্যেরের নোটবুকে সেই উদ্ধৃতিটির পাশে একটি মসজিদের গম্বুজের স্কেচ খুঁজে পান, যা তিনি এর কয়েক বছর আগে ইস্তাম্বুলে থাকাকালীন এঁকেছিলেন। সেই স্কেচ থেকেই তিনি এই আলো-ছায়ার ধারণা পেয়েছিলেন! তাহলে তিনি প্রাচ্যেই সেই জাদুর সন্ধান পেয়েছিলেন, তাই না?

অথচ পরে তিনি দাবি করেন যে তিনি তা পাশ্চাত্যে আবিষ্কার করেছেন। এভাবেই পাশ্চাত্যের স্থাপত্যবিষয়ক আলোচনা ও ধারণাগুলোকে আত্মসাৎ ও বিকৃত করা হয়েছে এবং স্থাপত্যের বৈশ্বিক ধারণাকে পশ্চিমারা নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে।

আমি মূলত আলভার আলতো এবং মার্সেল ব্রুয়েরের মতো আধুনিকতাবাদের প্রধান স্থপতিদের পাশেই মাজহারুল ইসলামকে রাখি। আমি কোনো তুলনা করছি না, বরং এটাই বলতে চাইছি যে তিনি চরমভাবে উপেক্ষিত ছিলেন। তাকে সঠিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমি কোনো ইতিহাসবিদ বা আর্কাইভ বিশেষজ্ঞ নই, একজন পেশাদার স্থপতিমাত্র। আমি এই বইটি প্রকাশ করেছি, কারণ আমি চাই আমার সহকর্মী, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সরকারি সংস্থাগুলো মাজহারুল ইসলামকে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুক।

 

আমিরুল রাজিব, শিল্প ইতিহাসবিদ ও কিউরেটর এবং নাঈম উল হাসান, কিউরেটর ও আর্কাইভিস্ট । তারা ‘দুনিয়াদারি আর্কাইভ’ এর সহপ্রতিষ্ঠাতা।
 

Most Popular