২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযান শুরুর পরপরই পশ্চিমা দেশগুলো একযোগে শত শত রুশ কূটনীতিক ও গোয়েন্দাকে তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করে। ক্রেমলিনের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কালো তালিকাভুক্ত করা হয় অসংখ্য প্রতিষ্ঠানকে। এর উদ্দেশ্য ছিল একটাই—রাশিয়া যেন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে না পারে এবং যুদ্ধাস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাইক্রোচিপ, ট্র্যান্সমিটার বা উন্নত প্রযুক্তি সংগ্রহে বাধার মুখে পড়ে।
কিন্তু পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত রুশ গুপ্তচরদের একটি বড় অংশ এখন ভিড় জমিয়েছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক জায়গা জাপানে।
তাদের মতে, তুলনামূলকভাবে জাপানের দুর্বল গুপ্তচরবিরোধী আইন এবং হাইটেক বা উন্নত প্রযুক্তি শিল্পকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া তাদের যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ সচল রাখছে।
ইউক্রেন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়ার ব্যবহৃত প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে জাপানে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রাংশ রয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে আসে।
সরকারি গোপন নথি, করপোরেট রেকর্ড এবং তিন মহাদেশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক ডজন গোয়েন্দা ও সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম তুলে ধরেছে নিউইয়র্ক টাইমস।
নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, টোকিওতে এই পুরো কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাশিয়ার বৈদেশিক সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (জিআরইউ) একটি অতি গোপন ইউনিট, যার নাম ‘২০তম ডিরেক্টরেট’।
জিআরইউ হলো রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের বৈদেশিক সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং গোপন সামরিক অভিযান পরিচালনা করা এর কাজ।
পাঁচটিরও বেশি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ইউনিটের কর্মকর্তারা কূটনীতিক বা ব্যবসায়ী সেজে যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি কেনা বা চুরির কাজ করছেন। এরপর বিভিন্ন চোরাপথে তা পাচার করেন রাশিয়ায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, টোকিওতে এই ২০তম ডিরেক্টরেটের প্রধানের দায়িত্বে আছেন মাক্সিম ভ্লাদিমিরোভিচ ফিলচেনকভ নামের ৪৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি।
তবে নথিপত্রে তার পরিচয় দেওয়া হয়েছে, রুশ রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ‘অ্যারোফ্লটের’ একজন সাধারণ কর্মচারী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলেন, চার বছর ধরে চলা যুদ্ধে রাশিয়া এখনো টিকে আছে। কারণ তারা বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে পারছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাক্সিম ফিলচেনকভ যখন টোকিওতে তার দায়িত্ব নেন, তখন রাশিয়ার জন্য উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধ ততদিনে ড্রোন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চীনের সাহায্য পেলেও, সবচেয়ে উন্নত সামরিক সরঞ্জামের জন্য জাপানি প্রযুক্তির কোনো বিকল্প রাশিয়ার কাছে ছিল না।
জিআরইউর এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা টোকিওতে এসে বিভিন্ন লজিস্টিকস ও শিপিং কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করেন, যারা জাপান থেকে পণ্য বিদেশে পাঠায়।
তিনি ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে স্পর্শকাতর প্রযুক্তি সংগ্রহ করে বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানোর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম খুঁজে বের করে তা রাশিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে দক্ষ ছিলেন ফিলচেনকভ।
টোকিওতে জাপানের ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সি বা জাতীয় পুলিশ সংস্থার সদর দপ্তর থেকে মাত্র ১০ মিনিটের পথ হাঁটলেই ২২ তলা ভবনে অ্যারোফ্লটের অফিস। অর্থাৎ, খোদ জাপানি কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় বসেই ফিলচেনকভ এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন।
সরেজমিনে পরিদর্শন করে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, অ্যারোফ্লটের টোকিও অফিসের প্রবেশপথটি দেখতে অনেকটা কারাগারের দরজার মতো। সেখানে একটি সরু পর্যবেক্ষণ জানালা ও একটি কলিং বেল রয়েছে।
কলিং বেল বাজাতেই রাশিয়ান অর্থোডক্স ক্রস পরা এক মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুলেছিলেন। অতিথি পেয়ে তিনি বেশ অবাক হয়েছিলেন বলে বোঝা যাচ্ছিল।
মহিলাটি বলেন, ‘মিস্টার ফিলচেনকভ এখানে নেই।’
তিনি কখন ফিরবেন তাও বলতে পারেননি।
রুশ সংস্থা অ্যারোফ্লট জাপানে কালো তালিকাভুক্ত না হলেও, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও সেবা না থাকায় এর কার্যক্রম কার্যত বন্ধ।
তবে, অ্যারোফ্লটের আনুষ্ঠানিক অংশীদাররা সক্রিয় রয়েছে।
বর্তমান ও প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, জাল নথি ব্যবহার করে স্পর্শকাতর প্রযুক্তি সরঞ্জাম পাঠাতে পারদর্শী এই ২০তম অধিদপ্তরটি।
জিআরইউর এই ইউনিটটির ইতিহাস অস্পষ্ট হলেও কর্মকর্তারা জানান, সোভিয়েত যুগ থেকেই পশ্চিমা প্রযুক্তির সন্ধানে অ্যারোফ্লটের চাকরিকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে রুশ গুপ্তচররা।
তারা আরও বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সামরিক প্রযুক্তি পাওয়ার জন্য ক্রেমলিনের প্রচেষ্টায় এটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে।
রাশিয়ার কাছে সরাসরি সামরিক প্রযুক্তি বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে জাপান।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গুপ্তচর ও চোরাকারবারিরা সরাসরি রাশিয়ায় পণ্য পাঠায় না। তারা এমন সব দেশে পণ্য পাঠায়, যারা রাশিয়ার কাছে তা বিক্রি করতে রাজি।
যেমন, জাপানি স্পর্শকাতর প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো ভিয়েতনাম। আর এখানে থেকেই প্রযুক্তি বড় সরবরাহ পাঠানো হয় রাশিয়াতে।
টোকিওর শিল্প বন্দর এলাকায় ‘প্রোকো এয়ার’ নামে একটি জাপানি লজিস্টিকস কোম্পানি রয়েছে, এটি নিজেদের জাপান ও রাশিয়ার মধ্যকার সেতু হিসেবে পরিচয় দেয়।
এই কোম্পানির মালিক জাপানিজ তাকেহিকো মিকি স্বীকার করেছেন যে, ২০১৮ সাল থেকে ফিলচেনকভের সঙ্গে তার পরিচয়।
তবে তিনি দাবি করেছেন, তিনি ফিলচেনকভের গুপ্তচর পরিচয়ের কথা জানতেন না এবং কোনো নিষিদ্ধ পণ্য রাশিয়ায় পাঠাননি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিয়েতনাম ছাড়া শ্রীলঙ্কা ও উজবেকিস্তানের মতো দেশেও পণ্য পাঠায় প্রোকো এয়ার।
একটি চালানপত্রের নথির বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, গত ১২ মার্চ শ্রীলঙ্কা হয়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম রাশিয়ায় পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
নথিতে প্রাপক হিসেবে রয়েছে মস্কোভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি ‘আরফার্ম’ এর নাম। প্রতিষ্ঠানটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকলেও এর প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সেই রেপিক অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডার নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং রুশ সেনাবাহিনীতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
গত মে মাসে কিয়েভে একটি আবাসিক ভবনে রুশ খ-১০১ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ২৪ জন নিহত হন।
ইউক্রেনের তদন্তকারীরা ধ্বংসাবশেষে জাপানে তৈরি এমন কিছু যন্ত্রাংশ খুঁজে পান, যেগুলোর রাশিয়ায় রপ্তানি নিষিদ্ধ।
এ বিষয়ে জাপান সরকারকে অনেকবার জানিয়েছে ইউক্রেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলেই ইউক্রেন অন্তত আটটি কূটনৈতিক চিঠি পাঠায় জাপানকে। পরে আরও কয়েকটি চিঠিতে তারা রুশ অস্ত্রে পাওয়া জাপানি সার্কিট বোর্ড, ট্রান্সমিটার, সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের তালিকা ও ছবি পাঠায়।
ইউক্রেনের দেওয়া তালিকায়, নিপ্পন ইলেকট্রনিক্স (এনইসি), প্যানাসনিক, টোশিবাসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের তৈরি যন্ত্রাংশের নাম ছিল।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে রাশিয়ায় পণ্য বিক্রির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, তারা জাপানের নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি আইন মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনকে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট ও হেলমেট পাঠিয়ে সাহায্য করেছে জাপান সরকার।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে রাশিয়ায় সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্যের রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনেরও নিন্দা জানিয়েছে।
এ যুদ্ধে ইউক্রেনকে নৈতিক সমর্থন দিলেও গুপ্তচরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না জাপান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেশটির ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা আকিহিসা শিওজাকি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগে আছি।’
কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মিত্রবাহিনীর তৈরি করে দেওয়া আইনি কাঠামোর কারণে জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে বেশ দুর্বল। এমনকি দেশটির কোনো নিজস্ব বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাও নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারিতে টোকিও পুলিশ এক রুশ গোয়েন্দার কার্যক্রম উদঘাটনের দাবি করে। ওই ব্যক্তি ইউক্রেনীয় পরিচয় ব্যবহার করে একটি জাপানি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির চেষ্টা করেছিলেন।
তবে জাপানে শক্তিশালী গুপ্তচরবিরোধী আইন না থাকায় তাকে নয়, তথ্য ফাঁসের অভিযোগে জাপানি কর্মীর বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অধীনে জাপান তাদের গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে তা বেশ ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকরা একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফিলচেনকভ কোনো মন্তব্য করেননি।
পশ্চিমা গোয়েন্দাদের দাবি, টোকিওর ওই অফিস থেকে এখনো পুতিনের ছদ্মবেশী গুপ্তচররা জাপানের স্পর্শকাতর প্রযুক্তি রাশিয়ায় পাঠিয়ে যাচ্ছেন।
