Tuesday, June 16, 2026
Homeবিদেশছয় দশক পুরোনো বি-৫২ কেন ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, কী আছে এতে

ছয় দশক পুরোনো বি-৫২ কেন ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, কী আছে এতে

শত্রু দেশে হামলায় মার্কিন প্রেসিডেন্টদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকে বোমারু বিমান বোয়িং ৫২ (বি-৫২) স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস। এই বোমারু উড়োজাহাজকে মার্কিন বিমান বাহিনীর মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে বয়স বিবেচনায় এই বোমারু বিমানকে ‘আধুনিক’ বলা যায় না। এই বিমানগুলো তৈরি করা হয়েছে ছয় দশকেরও বেশি সময় আগে। তবে নিয়মিত ‘আপগ্রেড’ করা হয় বলে যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলো এখনো সমান প্রাসঙ্গিক।

বর্তমানে সত্তরটির বেশি বি-৫২ বোমারু বিমান আছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে, যা দেশটির বহরে থাকা মোট বোমারু বিমানের প্রায় অর্ধেক। ২০৫০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই বিমানগুলো ব্যবহার করতে চায়। বর্তমানে রোলস-রয়েস কোম্পানি বিমানগুলোতে আধুনিকায়নের কাজ করছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় তৈরি এই বিমানগুলো পারমাণবিক বোমাও বহন করতে পারে।

সবশেষ খবর হলো— যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি বি-৫২ বোমারু বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। গতকাল সোমবার একটি বিমানঘাঁটিতে উড্ডয়নের পরপরই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে আটজন আরোহীর সবাই নিহত হয়েছেন।

লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ৬০ মাইল (৯৫ কিলোমিটার) উত্তরে অবস্থিত এডওয়ার্ডস বিমানঘাঁটিতে নিয়মিত পরীক্ষা চলাকালীন বিশাল বোমারু বিমানটি আগুনের গোলায় পরিণত হয়ে আছড়ে পড়ে। বিমানটিতে সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বেসামরিক ঠিকাদাররাও ছিলেন।

শুরুটা যেভাবে

এই বোমারু বিমানের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৫৪ সালে। তখন এর বি-৫২এ মডেলটি প্রথম আকাশে ওড়ে এবং ১৯৫৫ সালে এর বি মডেলটি আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়।

মোট ৭৪৪টি বি-৫২ বোমারু বিমান তৈরির তথ্য পাওয়া যায়। এই এয়ার ফ্রেমের সর্বশেষ বিমানটি ছিল বি-৫২এইচ মডেলের, যা ১৯৬২ সালের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিমান বাহিনীর বহরে যুক্ত হয়। 

বর্তমানে মার্কিন বিমান বাহিনীর বহরে কেবল এই ‘এইচ’ মডেলটিই ব্যবহার করা হচ্ছে।

যুদ্ধে সক্ষমতার স্বাক্ষর

এমন কোনো বড় যুদ্ধ নেই যেখানে বি-৫২ তার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার প্রমাণ দেয়নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ১৯৭২ সালে অপারেশন লাইনব্যাকার ২ চলাকালীন মাত্র ১১ দিনে উত্তর ভিয়েতনামে ২০ হাজার টনেরও বেশি বোমা ফেলেছিল এই বিমানগুলো। 

১৯৯১ সালের অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মে কোয়ালিশন বাহিনীর ফেলা মোট বোমার ৪০ শতাংশই বি-৫২ থেকে ছোড়া হয়েছিল।

বিমানটির সক্ষমতার আরও প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৯৬ সালের অপারেশন ডেজার্ট স্ট্রাইকে, যখন দুটি বি-৫২এইচ বিমান বার্কসডেল বিমান ঘাঁটি থেকে টানা ৩৪ ঘণ্টায় ১৬ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বাগদাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালায়। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ এবং ২০০৩ সালে ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডমে’ বি-৫২ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। 

২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বার অভিযান চালায়।  
এই বোমারু বিমানের সাম্প্রতিক ব্যবহার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানে হামলায় এবং ভেনেজুয়েলার উপকূলে নজরদারির কাজে এর ব্যবহার হয়েছে। 

আজও বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে কেবল বি-৫২ বিমানের উপস্থিতিই শত্রুর জন্য বড় হুমকি এবং একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক চাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। 

কী আছে বি-৫২ বিমানে

বি-৫২এইচ স্ট্রাটোফোর্ট্রেস মার্কিন সদস্যদের কাছে ‘বাফ’ বা ‘বিশাল, কুৎসিত ও মোটা বন্ধু’ নামে পরিচিত। বোয়িং কোম্পানির তৈরি বিমানটিতে আটটি টার্বোফ্যান ইঞ্জিন আছে। এই ইঞ্জিনগুলোর প্রতিটি ১৭ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত থ্রাস্ট তৈরি করতে সক্ষম।

এটি ঘণ্টায় ৬৫০ মাইল গতিতে এবং সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে পারে। একবার জ্বালানি নিয়ে এটি ৮ হাজার ৮০০ মাইল অতিক্রম করতে পারে। তবে আকাশপথে রিফুয়েলিং সুবিধা থাকায় এটি দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করতে পারে।

বিশাল আকৃতির এই বিমানের ডানার বিস্তার ১৮৫ ফুট, দৈর্ঘ্য ১৫৯ ফুট ৪ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৪০ ফুট ৮ ইঞ্চি। বিমানটির নিজস্ব ওজন প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার পাউন্ড হলেও এটি সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৮৮ হাজার পাউন্ড ওজন নিয়ে উড্ডয়ন করতে পারে।

এটি প্রায় ৭০ হাজার পাউন্ড ওজনের অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। এর অস্ত্রভান্ডারে সাধারণ বোমা, স্মার্ট বোমা, মাইন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদী প্রিসিশন গাইডেড অস্ত্রও থাকে। বিশেষ করে এর ‘এইচ’ মডেলটি ২০টি পর্যন্ত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে।

বিমানটিতে থাকা ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ভিউয়িং সেন্সর, ইনফ্রারেড এবং উন্নত টার্গেটিং পড দিন-রাত বা যেকোনো আবহাওয়ায় লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও নির্ভুলভাবে হামলা চালাতে সাহায্য করে।

এই বিমান কৌশলগত আক্রমণ, ক্লোজ-এয়ার সাপোর্ট এবং সামুদ্রিক অপারেশনে বিশেষভাবে কার্যকর। সামুদ্রিক নজরদারিতে এর দক্ষতা অসাধারণ। মাত্র দুই ঘণ্টায় দুটি বি-৫২ বিমান দিয়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার বর্গমাইল সমুদ্র এলাকা পর্যবেক্ষণ করা যায়।

উড্ডয়নের সময় বি-৫২ উড়োজাহাজে পাঁচজন ক্রু থাকেন। এদের মধ্যে একজন কমান্ডার, একজন পাইলট, রাডার ও দিকনির্ণয়ের জন্য দুইজন নেভিগেটর এবং একজন সমরবিদ থাকেন।

বি-৫২ বিমানের দাম কত

বর্তমানে ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মোট ৫৮টি বি-৫২ বিমান রয়েছে। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য রিজার্ভ বা জমা রাখা হয়েছে আরও ১৮টি বিমান।  

২০১২ সালে বোয়িং বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেসের একটি ইউনিটের খরচ ছিল ৮৪ মিলিয়ন ডলার। তবে এই যুদ্ধবিমানের আসল খরচ মূলত এর রক্ষণাবেক্ষণে। বিমানটির উড়তে প্রতি ঘণ্টায় খরচ হয় প্রায় ৬৯ হাজার ৭০৮ ডলার। এর মধ্যে জ্বালানি, পাইলট ও কর্মীদের বেতন, মেরামত এবং খুচরা যন্ত্রাংশের খরচ অন্তর্ভুক্ত। 

অন্যদিকে, আরও আধুনিক বি-২এ স্পিরিট স্টিলথ বোম্বার বিমান চালাতে প্রতি ঘণ্টায় খরচ হয় প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩১৩ ডলার। তার মানে, বি-২ বিমান চালাতে বি-৫২-এর তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৪ গুণ বেশি টাকা খরচ হয়।
সহজ কথায় বলতে গেলে, বি-৫২ বিমানটি বেশ পুরোনো এবং এটি মেরামত করা কিছুটা জটিল হলেও, এটি পরিচালনা করা অন্যান্য শক্তিশালী বোমা বিমানের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী।

Most Popular