ফিফার এবারের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে নতুন এক দৃশ্যের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় হয়েছে। প্রতি হাফের (অর্ধ) ২২ মিনিটের মাথায় খেলা থামিয়ে দিচ্ছেন রেফারি, যাতে খেলোয়াড়রা পানি পান করে শরীরকে পুনরায় সতেজ করতে পারেন।
মেক্সিকো, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে খেলোয়াড়দের চাঙ্গা রাখতে বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচেই বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের এই পানিবিরতির (হাইড্রেশন ব্রেক) নিয়ম চালু করা হয়েছে।
অবশ্য নতুন এ নিয়ম সবাইকে খুশি করতে পারেনি। অনেকে এই বিরতিকে মার্কিন সম্প্রচারকারীদের স্বার্থ রক্ষায় চালু করা ‘বাণিজ্যিক বিরতি’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
এমনকি যেসব স্টেডিয়ামে ছাদ খোলা-বন্ধের সুবিধা আছে কিংবা নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেও এই হাইড্রেশন বিরতি দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিটি ম্যাচের দুই অর্ধেই খেলা থামানোর বিষয়ে আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কোচ মরিসিও পচেত্তিনো বলেন, ‘আমার এটা ভালো লাগে না। কেবল আবহাওয়া পরিস্থিতি চরম হলে আমি এটি সমর্থন করি।’
‘কিন্তু যখন পরিস্থিতি ভালো থাকে, তখন এটি অপ্রয়োজনীয়,’ যোগ করেন তিনি।
নতুন করে কোনো নিয়ম চালু হলে, তার পক্ষে-বিপক্ষে মত থাকবেই। তবে এখন পর্যন্ত মাঠের খেলায় এর কী প্রভাব পড়েছে—তা জানার চেষ্টা করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
গত শনিবার নিউ জার্সির নিউ ইয়র্ক স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকে পানি পানের সময় মরক্কোর কাছে ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল ব্রাজিল। এর আগের সময়টুকুতে মাঠের খেলায় মরক্কো দাপট দেখাচ্ছিল ব্রাজিলকে।
বিরতির পর ছয় মিনিটের মাথায় খেলায় সমতা ফেরায় সেলেসাওরা।
ম্যাচ শেষে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি স্বীকার করেন, হাইড্রেশন বিরতিতে তিনি খেলোয়াড়দের নতুন নির্দেশনা দিয়ে কৌশলে পরিবর্তন আনতে পেরেছিলেন।
শুরুতে পিছিয়ে থাকলেও এরপর পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা হঠাৎ করেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।
বিরতির সুবিধা সম্পর্কে ইতালীয় এই কোচ বলেন, ‘আপনি খেলোয়াড়দের সমস্যা ব্যাখ্যা করতে পারেন, কৌশলগত পরিবর্তন আনতে পারেন। যা ম্যাচে খুবই কার্যকর হতে পারে।’
এতে প্রশ্ন জাগে—হাইড্রেশন বিরতির উদ্দেশ্য যদি হয় খেলোয়াড়দের সুস্থতা নিশ্চিত করা, তাহলে কোচদের কি নতুন নির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত?
আইটিভি স্পোর্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্র নারী দলের কোচ এমা হেইস বলেন, ‘এই বিরতি ম্যাচে এগিয়ে থাকা দলের গতি নষ্ট করে দেয়।’
‘এটা পিছিয়ে থাকা দলের জন্য সুবিধাজনক। তাই আমি একে মোমেন্টাম নষ্টের বিরতি বলি। আপনি যদি এগিয়ে থাকেন, তাহলে এমন বিরতি কখনোই চাইবেন না। আর যদি পিছিয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই চাইবেন।’
সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটেও স্ট্র্যাটেজিক টাইমআউট বা কৌশলগত বিরতির নামে একই বিষয় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভারতের ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) এই বিরতি বেশ প্রচলিত।
হেইস বলেন, ‘এটি লজ্জার। দেশের খুব গরম অঞ্চলে হলে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু মনে হচ্ছে ফুটবলে এই বিরতি হয়তো স্থায়ীভাবেই থেকে যেতে পারে।’
ব্রাজিলের মতো কানাডাও শুক্রবার বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন বিরতির পর সমতায় ফেরে। বদলি খেলোয়াড় কাইল লারিন গোল করে ব্যবধান ঘোচান।
হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে স্কটল্যান্ড জয়সূচক একমাত্র গোলটি করে হাইড্রেশন বিরতির কিছুক্ষণ পর। একইভাবে তুরস্কের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াও প্রথম গোলটি করে বিরতির পরপরই।
খেলোয়াড়ি জীবনে থাকলে প্রতি হাফে তিন মিনিটের বিরতি মোটেও পছন্দ করতেন না স্পেনের ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার হুয়ান মাতা।
আইটিভি স্পোর্টকে তিনি বলেন, ‘খেলোয়াড় হিসেবে আমি মনে করি না এটা ভালো। আপনি যদি পিছিয়ে থাকেন, তাহলে গোল করতে চাইবেন। আর এগিয়ে থাকলে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইবেন। আমার মনে হয়, এই বিরতি ম্যাচের গতি নষ্ট করে দেয়।’
রোববার হিউস্টনে জার্মানির বিপক্ষে প্রথমার্ধের পানিবিরতির ঠিক আগে ১-১ সমতায় ফিরেছিল বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কুরাসাও।
আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে ছোট দেশটি তখন স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু বিরতির পর তারা আর আগের মতো ছিল না। জার্মানরা নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ৭-১ গোলের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে প্রথমার্ধে চেক প্রজাতন্ত্র আধিপত্য বিস্তার করছিল। কিন্তু হাইড্রেশন বিরতি সেই ছন্দ থামিয়ে দেয়। খেলা শুরু হলে তারা গতি হারায়।
ম্যাচে লিড নিয়েও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় তারা।
অন্যদিকে, রোববার টেক্সাসের আর্লিংটনে দ্বিতীয়ার্ধের বিরতির আগে জাপানের বিপক্ষে ২-১ গোলে এগিয়ে ছিল নেদারল্যান্ডস। কিন্তু সেই লিড তারা ধরে রাখতে পারেনি। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়।
তবে নিশ্চিতভাবেই প্রতিটি ক্ষেত্রে ম্যাচের গতি পরিবর্তনের জন্য হাইড্রেশন বিরতিকে দায় দেওয়া যাবে না। বিশ্বকাট আসর যত এগোবে, ততই পরিষ্কার হবে—ম্যাচে এই বিরতি কতটা প্রভাব ফেলছে।
আর্সেনাল ও ইংল্যান্ডের সাবেক ফরোয়ার্ড ইয়ান রাইট এ বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটা আমেরিকান দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞাপন ঢোকানোর আরেকটি উপায়।’
টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার খেলায় হাইড্রেশন বিরতির সময় মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম ফক্সের বিজ্ঞাপন নির্ধারিত সময়ের চেয়েও বেশি চলেছিল।
রাইট বলেন, ‘খেলোয়াড়দের স্বার্থের কথা বলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমার কাছে তা মনে হয় না।’
তবে সমালোচনার পাশাপাশি অনেকেই এটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন।
সোমবার কেপ ভার্দের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘আমি সব সময় আমার খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব দিই। আমার মনে হয় এটি সঠিক সিদ্ধান্ত—একটু বিরতি, সতেজ হওয়া, তারপর আবার খেলা চালিয়ে যাওয়া।’
এ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে আটলান্টায়। স্টেডিয়ামটিতে খোলা-বন্ধ করা যায় এমন ছাদ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে।
গতকাল স্পেন কোচ বলেন, ‘স্টেডিয়ামের ভেতরে তাপমাত্রা শীতল থাকবে। তবে পুরো সপ্তাহজুড়ে আমরা প্রচণ্ড গরম দেখেছি। এমন তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় কাজ করে যাওয়া খুবই কঠিন।’
‘আমার মতে, সবচেয়ে ভালো কাজ হলো প্রচুর পানি পান করা। একটু বিরতি নেওয়া, খেলোয়াড়দের কয়েক সেকেন্ড শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। সোমবার হয়তো খুব বেশি গরম থাকবে না। তবুও খেলোয়াড়দের একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে, তারপর এক-দুই মিনিটে কিছু নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে,’ বলেন দে লা ফুয়েন্তে।
