বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল হিসেবেই মাঠে নেমেছিল স্পেন। প্রতিপক্ষ ছিল টুর্নামেন্টের নবাগত কেপ ভার্দে, আসরের দ্বিতীয় ক্ষুদ্র দেশও বটে। কাগজে-কলমে শক্তির ব্যবধান ছিল আকাশ-পাতাল। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই হিসাবকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। দুর্ভেদ্য রক্ষণ আর ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার অসাধারণ নৈপুণ্যে স্পেনকে রুখে দিয়ে মূল্যবান এক পয়েন্ট তুলে নিয়েছে কেপ ভার্দে।
সোমবার রাতে আটলান্টা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের ‘এইচ’ গ্রুপের ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে ০-০ গোলে ড্র করেছে স্পেন। এর মধ্য দিয়ে চলতি বিশ্বকাপে দেখা গেল প্রথম গোলশূন্য ম্যাচ।
ম্যাচ শেষে আবেগে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি ভোজিনহা। ম্যাচসেরার পুরস্কারও উঠেছে তার হাতেই। পুরো ৯০ মিনিট জুড়ে তিনি ছিলেন যেন স্পেনের সামনে এক অদম্য প্রাচীর।
শুরু থেকেই আক্রমণের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে স্পেন। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে আক্রমণাত্মক ঝুঁকির চেয়ে বলের নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে একাদশ সাজান। ডান প্রান্তে খেলেন মার্কোস ইয়োরেন্তে, আর লেফট উইংয়ে জায়গা পান গাভি, যা ছিল ম্যাচের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি।
প্রত্যাশামতো বলের দখল পুরোপুরি নিজেদের কাছে রাখে স্পেন। অন্যদিকে কেপ ভার্দে প্রায় পুরো দল নিয়ে নিজেদের অর্ধে অবস্থান নেয় এবং সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে। তবে সেই সুযোগও খুব বেশি তৈরি করতে পারেনি তারা।
প্রথম উল্লেখযোগ্য শটটি নেন পেদ্রি। তবে তা সহজেই সামাল দেন ভোজিনহা। এরপর একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকে স্পেন। বিশেষ করে বাম প্রান্তে মার্ক কুকুরেয়ার ওভারল্যাপিং রান কেপ ভার্দের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে আসে স্পেনের সেরা সুযোগগুলো। কুকুরেয়ার আরেকটি দারুণ আক্রমণ থেকে ফেরান তোরেসের শট ক্রসবারে আঘাত করে ফিরে আসে। ফিরতি বলে ওয়ারইয়ারসাবালের হেডও অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন ভোজিনহা। এরপর ফেরানের আরেকটি শট এবং যোগ করা সময়ে লাপোর্তের শক্তিশালী হেডও রুখে দেন তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র দেখা যায়। স্পেন আক্রমণ করে, কিন্তু সময় যত গড়ায় তাদের খেলার মধ্যে তাড়াহুড়ো ও ভুলের পরিমাণও বাড়তে থাকে। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন শোনা যেতে থাকে লামিন ইয়ামালের নাম।
এক ঘণ্টা পর মাঠে নামার জন্য যখন বার্সেলোনার এই তরুণ তারকা ওয়ার্ম-আপ শুরু করেন, তখনই দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত গাভির পরিবর্তে ইয়ামালকে মাঠে নামান দে লা ফুয়েন্তে। তার সঙ্গে নামেন মিকেল মেরিনোও।
ইয়ামাল মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বল স্পর্শ করেন এবং গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসের ঢেউ ওঠে। তার তৈরি সুযোগ থেকে মেরিনো গোল করতে ব্যর্থ হন। এরপর ইয়ামালের প্রতিটি স্পর্শে যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় স্পেনের আক্রমণ।
শেষ ২০ মিনিট প্রায় পুরোটা সময় কেপ ভার্দের অর্ধে খেলেছে স্পেন। কিন্তু কখনও ডিফেন্ডারের পা, কখনও মাথা, আর কখনও ভোজিনহা তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কুকুরেয়ার হেড, দানি ওলমোর সৃজনশীলতা, নিকো উইলিয়ামসের গতি কোনো কিছুই কাজে আসেনি।
ম্যাচের শেষ দিকে ইয়ামাল ও ওলমোর দারুণ সমন্বয়ে ওয়ারজাবাল গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পিকো লোপেস শেষ মুহূর্তে শট ব্লক করে কেপ ভার্দেকে বাঁচান। অবশ্য শেষ দিকে একটি কর্নার থেকে কেপ ভার্দেও চমক দেখানোর সুযোগ পেয়েছিল। বোর্জেসের হেড ভালোভাবে ঠেকিয়ে দেন উনাই সিমন।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই কেপ ভার্দের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয় উদযাপন। কারণ স্পেনের মতো এক পরাশক্তির বিপক্ষে ড্র তাদের জন্য জয়ের সমান।
অন্যদিকে স্পেনের জন্য এটি হতাশাজনক শুরু। তবে ইতিহাস তাদের কিছুটা সান্ত্বনা দিতে পারে। ২০১০ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরেও শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। ২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করেও শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
