ঘটনাটা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকার ক্লাবের খেলোয়ার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে ঝগড়া করেন। পরে প্রমাণিত হয় যে, তিনি সমকামী বিদ্বেষী গালি দিয়েছিলেন এবং ইউরোপের সর্বোচ্চ ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা তাকে ছয় ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করে।
এ ঘটনার পর ফিফার রেফারি কমিটির প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা ব্যাপক ক্ষুব্ধ হন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে, ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে মাঠে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, কোনো খেলোয়াড় মুখ ঢেকে কথা বললেই রেফারি ধরে নেবেন সেখানে চরম আপত্তিকর কিছু বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ওই খেলোয়াড়কে সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারবেন রেফারি।
এবারের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে এই নতুন নিয়ম।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসে ফিফার নতুন সব নিয়মের নানা তথ্য।
বিগত কয়েকটি বিশ্বকাপ যেমন—২০১৮ ও ২০২২ এবং ইউরোপিয়ান লিগগুলোতে দেখা গেছে, খেলোয়াড়রা যখন রেফারি বা প্রতিপক্ষের সঙ্গে তর্কে জড়ান, তখন তারা হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নেন। এর কারণ হলো আধুনিক ফুটবলের ক্যামেরা প্রযুক্তি।
মাঠে শত শত হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা থাকে। খেলোয়াড়রা মুখ না ঢাকলে লিপ-রিডিং বা ঠোঁট নাড়ানো দেখে বের করে ফেলা যায়, খেলোয়াড়টি ঠিক কী গালি দিয়েছেন বা কোনো বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন কি না।
অতীতে এমন লিপ-রিডিংয়ের মাধ্যমে কী বলেছেন তা জানার পর অনেক খেলোয়াড়কেই কয়েক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই শাস্তি থেকে বাঁচতে মুখ ঢেকে গালিগালাজ করার কৌশল নিয়েছিল খেলোয়াড়রা।
তবে সেই সুযোগ আর থাকছে না।
এ ছাড়া, রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে কোনো খেলোয়াড় যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মাঠ ছেড়ে চলে যান, তাকেও লাল কার্ড দেখানো যাবে।
২০২৬ বিশ্বকাপে আরও অনেক সুযোগ বা সুবিধা পাবেন না খেলোয়াড়রা।
২০২২ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লিভারপুল বনাম এভারটনের খেলা চলছিল। প্রথমার্ধের ৪৪তম মিনিটে এভারটনের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড বল ধরে কোনো কারণ ছাড়াই মাঠে শুয়ে পড়েন এবং প্রায় ১১-১২ সেকেন্ড বল ধরে রাখেন।
এরপর উঠে তিনি প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় মোহামেদ সালাহর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপেছিলেন।
এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও ফুটবল বিশ্বে মিম হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আরও একটি আলোচিত উদাহরণ আছে ২০২২ বিশ্বকাপের।
5. World Cup 2022 – Emi Martinez last Minute save vs France , forever iconicpic.twitter.com/SqSVtDZmP8
— LSPN_FC (@LSPN__FC) November 10, 2024
কোয়ার্টার ফাইনালের টাইব্রেকারে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে এবং ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলায় নানা কৌশলে সময় নষ্ট ও প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ—এমন অভিযোগ রয়েছে।
ওই সময় তার এই আচরণ ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
ফুটবল মাঠে গোলরক্ষকদের এমন বল বুকে চেপে মাটিতে শুয়ে থাকা বা সময় নষ্ট করার কৌশল নতুন নয়। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, একজন গোলরক্ষক বল হাতে রাখার জন্য মাত্র ৬ সেকেন্ড পান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক বেশি সময় পার করেন গোলকিপাররা।
আর এসব ক্ষেত্রে রেফারি বড়জোর একটা হলুদ কার্ড দেখাতেন।
তবে এবার নিয়ম অনেক কড়া। মাঠে একজন গোলকিপার সর্বোচ্চ ৮ সেকেন্ড বল ধরে রাখতে পারবেন। শেষের ৫ সেকেন্ড রেফারি হাত উঁচিয়ে কাউন্টডাউন করবেন। এই ৫ সেকেন্ডের মধ্যে গোলকিপার খেলা শুরু না করলে শাস্তি হবে খুবই অদ্ভুত।
সেটা হলো— গোল-কিক নিতে দেরি করলে প্রতিপক্ষ দল সরাসরি কর্নার পেয়ে যাবে! থ্রো-ইন নিতে দেরি করলে বল চলে যাবে প্রতিপক্ষের কাছে। তখন থ্রো-ইন পাবে প্রতিপক্ষ।
এবার বিশ্বকাপেও খেলছেন আর্জেন্টিনার গোলকিপার মার্তিনেজ। দেখা যাক, এবার তিনি কী কী কৌশল নেন!
আচ্ছা বলুন তো, ফুটবল মাঠে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কোন দৃশ্যটি?
একেকজনের কাছে উত্তর একেকরকম হলেও একটা উত্তরে সব ফুটবলপ্রেমীরা একমত হবেন। সেটা হলো—ম্যাচের শেষ মুহূর্তে যদি বদলি খেলোয়াড় নামানোর সিদ্ধান্ত হয়, তখন যে খেলোয়াড়টি মাঠ থেকে বের হয়ে যাবেন, তিনি যেন হঠাৎ করেই পৃথিবীর সবচেয়ে অলস মানুষে পরিণত হন!
রেফারি তাড়া দিচ্ছেন, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা রাগে ফুঁসছেন—অথচ তিনি যেন পার্কে হাঁটছেন।
ফুটবল ইতিহাসে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৯ সালে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে, লিভারপুল বনাম বার্সেলোনা ম্যাচে।
খেলা শেষ হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। ৪-০ গোলে এগিয়ে রয়েছে লিভারপুল। বার্সেলোনাও হন্যে হয়ে গোলের চেষ্টা করছিল।
ঠিক এমন সময়ে লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ ফরোয়ার্ড জের্দান শাকিরিকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ফোর্থ অফিশিয়াল যখন বোর্ডে শাকিরির ২৩ নম্বর জার্সিটি তুললেন, শাকিরি তখন মাঠের অন্যপ্রান্তে। মাঠ থেকে বের হওয়ার জন্য তিনি যে হাঁটা শুরু করলেন, তাকে ‘অলসতার মহাকাব্য’ বললেও কম হবে।
শাকিরি যেন মেপে মেপে কদম ফেলছিলেন। মাঝমাঠে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে মোজা ঠিক করেন। এরপর নিজের দলের অন্য খেলোয়াড়দের পিঠ চাপড়ে, জড়িয়ে ধরে আরও খানিকটা সময় নষ্ট করেন।
অবশেষে শাকিরি যখন মাঠ পার হয়ে বদলি খেলোয়াড়ের সঙ্গে হাত মেলান, ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা থেকে মূল্যবান প্রায় দেড় থেকে দুই মিনিট সময় উধাও হয়ে গেছে।
যদিও এজন্য হলুদ কার্ড পেয়েছিলেন শাকিরি। তবুও তার মুখে ছিল চওড়া হাসি। বলা হয় যে, তার এই ‘অলস হাঁটার’ কৌশলের জন্য বার্সেলোনার আক্রমণের ছন্দ পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছিল এবং লিভারপুল ম্যাচটি জিতে ফাইনালে পৌঁছেছিল।
তবে এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে মুখে চওড়া হাসি নিয়ে অলস হেঁটে মাঠ পার হওয়ার মতো সাহস কজন খেলোয়াড় দেখাতে পারবেন সেটাই দেখার বিষয়।
কারণ এবার কঠোর নিয়ম তৈরি করেছে ফিফা।
রেফারি চতুর্থ অফিসিয়ালকে সংকেত দেওয়ার পর মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যে সবচেয়ে কাছের টাচলাইন দিয়ে মাঠ থেকে বের হয়ে যেতে হবে খেলোয়াড়কে।
যদি কোনো খেলোয়াড় ১০ সেকেন্ডের বেশি সময় নেন, তবে তার শাস্তিস্বরূপ বদলি খেলোয়াড়টি সঙ্গে সঙ্গে মাঠে নামতে পারবেন না। তাকে কমপক্ষে ১ মিনিট সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে এবং এই ১ মিনিট বা পরবর্তী খেলা থামা পর্যন্ত ওই দলকে ১০ জন নিয়ে খেলতে হবে।
এতদিন গোল, লাল কার্ড বা পেনাল্টির মতো বড় ঘটনার জন্য ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর ব্যবহার হতো। তবে এবার লাইনসম্যান বা রেফারি ভুল করে কর্নার দিয়েছেন কি না, তাও চেক করবে ভিএআর।
তবে বল কার পায়ে লেগে বাইরে গেছে ভিএআর এই কর্নার চেক করলেও রেফারি যদি ভুল করে কর্নারের জায়গায় গোল-কিক দিয়ে বসেন, সেটা চেক করবে না ভিএআর।
ফিফার যুক্তি হলো, কর্নার থেকে সরাসরি গোল হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে, তাই কর্নারই চেক করা গুরুত্বপূর্ণ। এই চেকের জন্য ২৫ সেকেন্ড সময়ও বেঁধে দিয়েছে ফিফা।
কর্নার যাচাই ছাড়াও আরও তিনটি ক্ষেত্রে এবার কাজ করবে ভিএআর প্রযুক্তি।
দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের রিভিউ: কোনো খেলোয়াড় দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পাওয়ার পর লাল কার্ড দেখলে, রেফারি ভুল করেছেন কি না তা খতিয়ে দেখবে ভিএআর।
বল মাঠে গড়ানোর আগের ফাউল: কর্নার নেওয়ার সময় বল কিক করার আগেই যদি কোনো আক্রমণভাগের খেলোয়াড় ফাউল করেন এবং তার জের ধরে গোল বা পেনাল্টি হয়, তবে ভিএআর সেটি বাতিল করতে পারবে।
ভুল পরিচয় সংশোধন: ভুল করে এক দলের খেলোয়াড়ের অপরাধে অন্য দলের খেলোয়াড়কে কার্ড দিলে ভিএআর তা শুধরে দেবে।
ডাক্তার মাঠে এলে ১ মিনিট বাইরে থাকতে হবে
আগে নিয়ম ছিল কোনো খেলোয়াড় আঘাত পেলে মাঠে যদি ফিজিও বা ডাক্তার আসেন, তবে চিকিৎসা শেষে ওই খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হতো।
এখন এই সময় বাড়িয়ে ১ মিনিট করা হয়েছে। এটি শুধু বিশ্বকাপের জন্য নয়, ফুটবলের স্থায়ী নিয়ম হিসেবে সব দেশের সব লিগ ও টুর্নামেন্টে আগামী মৌসুম থেকে বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হবে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এই নিয়ম চালুর পেছনে মূল কারণ হলো—ফুটবলাররা যাতে ফাউলের শিকার হওয়ার ভান করে বা সামান্য চোটে মাঠে শুয়ে অযথা সময় নষ্ট করতে না পারেন।
তবে অনেকেই মনে করছেন ১ মিনিট সময়টা একটু বেশি দীর্ঘ। এতে করে যারা আসলেই সত্যি সত্যি আঘাত পেয়েছেন, তাদের দল অন্যায্যভাবে ১ মিনিটের জন্য একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে খেলবে।
আবার অনেক খেলোয়াড় দলের ক্ষতির কথা চিন্তা করে বড় চোট পেলেও মাঠে ফিজিও ডাকতে ভয় পেতে পারেন।
কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়কে ১ মিনিট বাইরে বসে থাকতে হবে না, তিনি সরাসরি খেলায় ফিরতে পারবেন। ব্যতিক্রমগুলো হলো:
১. যদি গোলকিপার আহত হন।
২. একই দলের গোলকিপার এবং মাঠের অন্য কোনো খেলোয়াড় যদি নিজেদের মধ্যে ধাক্কা খেয়ে চোট পান।
৩. কোনো মারাত্মক চোট লাগলে, বিশেষ করে মাথায় আঘাত লাগলে কিংবা অচেতন হয়ে গেলে।
৪. ফাউলের কারণে খেলোয়াড় চোট পেয়েছেন এবং সেই ফাউলের জন্য প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে রেফারি হলুদ বা লাল কার্ড দেখিয়েছেন।
৫. দল যদি পেনাল্টি পায় এবং চোট পাওয়া খেলোয়াড় নিজেই যদি সেই পেনাল্টি কিকটি নিতে চান।
সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, খেলোয়াড়দের ‘নাটকবাজি’ বন্ধ করতে ফিফা এবার এমন সব কঠিন নিয়মের ফাঁদ পেতেছে, যা উল্টো মাঠে ভিন্ন এক নাটকীয় পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
