বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েছেন ইলন মাস্ক। সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা) পৌঁছায়।
রকেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের রেকর্ড গড়া প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) পর ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হন মাস্ক।
এই মাইলফলক বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের উচ্ছ্বাসের নতুন যুগ হিসেবে ঘটনাটিকে দেখছেন অনেকে। তবে এর মধ্যেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিশ্বের প্রথম বিলিয়নিয়ার কে ছিলেন?
আজ পৃথিবীতে ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি বিলিয়নিয়ার রয়েছেন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই তাদের সংখ্যা ৯০০-এর বেশি। কিন্তু খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন পৃথিবীতে একজনও বিলিয়নিয়ার ছিলেন না।
সেই পরিস্থিতি বদলে যায় ১৯১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর।
মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে ১৯১৬ সালের ১ বিলিয়ন ডলারের বর্তমান মূল্য ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা) বেশি।
সেদিন তেলশিল্পের এক কিংবদন্তি ধনকুবের যুক্তরাষ্ট্রের এবং সম্ভবত বিশ্বেরও প্রথম বিলিয়নিয়ার হন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘গিল্ডেড এজ’ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার ম্যাকনাইট নিকোলস এমনটাই জানিয়েছেন নিউইয়র্ক টাইমসকে।
আজ মাস্ককে ঘিরে যে ধরনের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তাকে ঘিরে তেমনই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। সম্পদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ এবং একইসঙ্গে অতিরিক্ত সম্পদ সঞ্চয় নিয়ে অস্বস্তি—দুইয়ের সমন্বয়ে তার সম্পদ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সে সময়ও ধনীদের তালিকা প্রকাশিত হতো, যা আজকের ফোর্বসের ধনকুবের তালিকার মতোই জনপ্রিয় ছিল।
সে সময় নিউইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের শেয়ারের দাম ২ হাজার ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় ওই ধনকুবের এই মাইলফলক স্পর্শ করেন।
ওই ধনকুবের ছিলেন স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের প্রতিষ্ঠাতা জন ডি রকফেলার।
নিকোলস বলেন, ‘মানুষ তখনও আজকের মতোই ভাবত যে, এখন তিনি তালিকার পরের ব্যক্তির চেয়ে দ্বিগুণ ধনী হয়ে গেলেন।’
তার মতে, সে সময় অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই এক বিলিয়ন ডলার কত বড় অঙ্ক, তা কল্পনা করা কঠিন ছিল। আজ যেমন অনেকের কাছে ট্রিলিয়ন ডলার কল্পনার বাইরে।
নিকোলসের ভাষায়, ‘তখনকার এক বিলিয়নিয়ার বর্তমানের এক ট্রিলিয়নিয়ারের মতো। এতগুলো শূন্য কল্পনা করাও কঠিন।’
তবে ১৯১৬ সালের সাধারণ মানুষ প্রথম বিলিয়নিয়ারের আবির্ভাবে খুব একটা উচ্ছ্বসিত ছিল না বলেই মনে করেন তিনি। কারণ তখন যুক্তরাষ্ট্রে ‘প্রগ্রেসিভ এরা’ চলছিল, যখন সরকারের কাছ থেকে সম্পদের চরম বৈষম্য নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো হচ্ছিল।
নিকোলস উল্লেখ করেন, ১৯১১ সালে স্ট্যান্ডার্ড অয়েলকে ভেঙে কয়েক ডজন ছোট প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত করতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে এসব প্রতিষ্ঠানের মূল্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, যা রকফেলারের সম্পদ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রকফেলারেরও প্রায় এক শতাব্দী আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মিলিয়নিয়ার হয়েছিলেন জন জ্যাকব অ্যাস্টর। নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন।
ঠিক কখন তিনি মিলিয়নিয়ার হয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে নিকোলসের ধারণা, ১৮২০-এর দশকে জীবনের মধ্যভাগে তিনি সেই মাইলফলক স্পর্শ করেন।
১৮৪৮ সালে মৃত্যুর সময় তার সম্পদের পরিমাণ ছিল কয়েক কোটি ডলার।
তখন অল্প কয়েকজনের হাতে বিপুল সম্পদ জমা হওয়ার বিষয়টি বড় কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক বিতর্কের জন্ম দেয়নি। ফলে অ্যাস্টরের সম্পদ রকফেলার কিংবা মাস্কের সম্পদের মতো আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। সাধারণ মানুষ তার প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কেও খুব বেশি জানত না।
তবে অ্যাস্টরই শেষ মিলিয়নিয়ার ছিলেন না। আর ১৯৩৭ সালে রকফেলারের মৃত্যুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তার মতো সম্পদের মালিক, অন্তত সম্পদের পরিমাণের বিচারে, শত শত মানুষ দেখা গেছে।
বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পর এখন নতুন প্রশ্ন, দ্বিতীয় ট্রিলিয়নিয়ার কবে আসবেন?
নিকোলসের ধারণা, সেটি খুব বেশি দূরের ভবিষ্যৎ নয়।
তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতই পরবর্তী ট্রিলিয়নিয়ার তৈরির সবচেয়ে সম্ভাব্য ক্ষেত্র।
তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, অদূর ভবিষ্যতেই এআইভিত্তিক কোনো আইপিও থেকে আমরা আরেকজন ট্রিলিয়নিয়ার দেখতে পাব।’
