Sunday, October 4, 2026
Homeবাংলাদেশপ্রথম আলো-ডেইলি স্টারে আগুন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার: মতিউর রহমান

প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে আগুন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার: মতিউর রহমান

গণমাধ্যম সংক্রান্ত নীতির প্রশ্নে শেখ হাসিনা ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করেছেন প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান। সেই সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও গণমাধ্যম খাতের সংস্কারে বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারায় বর্তমান বিএনপি সরকারেরও সমালোচনা করেন তিনি।

তবে সংবাদমাধ্যমকে ‘যথেষ্ট স্বাধীনতা’ দেওয়ার জন্য খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিগত বিএনপি সরকারের প্রশংসা করেন তিনি।

আজ রোববার বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-এ ‘জার্নালিজম আফটার টার্নিং পয়েন্ট’ শীর্ষক অধিবেশনে এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি ক্ষমতাসীন দলকে তাদের ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি ও নির্বাচনী ইশতেহারের কথা মনে করিয়ে দেন। সেখানে গণমাধ্যম কমিশন গঠন, নিবর্তনমূলক আইন বাতিল এবং ভয়হীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ছিল।

মতিউর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দল ও সরকার হিসেবে বিএনপির এই প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও সংবাদপত্র এবং সার্বিক গণমাধ্যম খাতের সংস্কারে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’

আওয়ামী লীগ আমলের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তখন সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠানো হতো। প্রথম আলোকে টানা চাপের মধ্যে রাখা হয়েছিল। সরকারের নির্দেশে ৫০টি বড় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে পত্রিকার ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হয়। তার বিরুদ্ধে প্রায় ৮০টি মামলা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাও রয়েছে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সংসদে প্রকাশ্যে প্রথম আলোকে আওয়ামী লীগ ও দেশের শত্রু আখ্যায়িত করেছিলেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের আগে তাকে সরিয়ে দিতে এবং মালিকানা বদলাতে বাধ্য করতে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘প্রচণ্ড চাপ’ তৈরি করেছিল। সেই সরকার আরও কয়েক মাস ক্ষমতায় থাকলে প্রথম আলোর নিয়ন্ত্রণ বেহাত হতে পারত বলে তিনি মনে করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মতিউর রহমান।

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপে সংবাদমাধ্যমের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হওয়ায় গণমাধ্যম শিল্প ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এতে অনেক সাংবাদিক চাকরি হারান। অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশের কারণে প্রথম আলোসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যম সেলফ-সেন্সরশিপ চর্চায় বাধ্য হয়।’

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যত কোনো উদ্যোগই নেয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, উগ্রবাদীদের ‘বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার’ ও বিক্ষোভের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘সবকিছু পুড়ে যাওয়ার পরই ফায়ার সার্ভিসের জন্য রাস্তা পরিষ্কার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতে সরকারি কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো নির্দেশনা দেয়নি।

এর বিপরীতে, খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬) ভোরের কাগজ ও প্রথম আলোর সম্পাদক হিসেবে তিনি ‘যথেষ্ট স্বাধীনতা’ উপভোগ করেছেন। প্রথম আলো ২০০১-২০০৬ সালের সরকারের তীব্র সমালোচনা করলেও বড় কোনো আইনি হয়রানির মুখে পড়তে হয়নি বলেও জানান মতিউর রহমান।

স্মরণ করে তিনি বলেন, সে সময় খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল। কিন্তু এর জন্য কোনো ধরনের প্রতিশোধের মুখে তাকে পড়তে হয়নি।

১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবিতে আইয়ুব খান সরকারের বিরুদ্ধে এক ছাত্র বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেই স্মৃতিচারণা করে তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ৬৪ বছর পরও একই দাবি প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।

মতিউর রহমান বলেন, ‘৬৪ বছর পরও আমাদের সেই দাবিগুলো নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। এখনো আমাদের এসব চাইতে হচ্ছে। ক্ষমতায় থাকাদের মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে যে কথা বলার অধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এগুলো মৌলিক অধিকার। ৫৬ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে আমি নিজেকে আবারও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি।’

Most Popular