১৯২৩ সালের এপ্রিল মাস। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর কাছে ডালমুরের শিপইয়ার্ড থেকে জলে ভাসানো হলো নতুন একটি জাহাজ। এর প্রথম শ্রেণির কামরাগুলো সাজানোর জন্য ফ্লোরেন্স থেকে সুনির্দিষ্টভাবে ইতালিয়ান কারিগর ও শিল্পীদের আনা হয়েছিল। লাইব্রেরিটি সাজানো হয়েছিল তাসকান রেনেসাঁ শৈলীতে, যেখানে ছিল রঙিন কাঁচের জানালা ও ছাদের দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ।
চতুর্দশ শতাব্দীর স্যাভয়ের কাউন্ট আমাদিউস সিক্স-এর নামানুসারে ইতালিয়ান বিলাসবহুল জাহাজটির নাম রাখা হয় ‘কন্তে ভার্দে’। এটি কেবল সাধারণ কোনো সমুদ্রযাত্রার জন্যই তৈরি হয়নি, বরং এর গন্তব্য ছিল ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকা।
এর সাত বছর পর ১৯৩০ সালে বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছিল। উরুগুয়ের মাটিতে বসতে চলেছে ইতিহাসের প্রথম ফিফা বিশ্বকাপের আসর। কিন্তু ইউরোপ তখন গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার অর্থ ছিল দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও ব্যয়বহুল এক সমুদ্রযাত্রা। ফলে ইউরোপের দেশগুলো একে একে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল।
সেই চরম অনিশ্চয়তার মেঘ কাটিয়ে বিশ্বকাপের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ত্রাতা হয়ে এসেছিল এই কন্তে ভার্দে। ইউরোপিয়ান দলগুলোকে বুকে ধারণ করে আটলান্টিকের ঢেউ পেরিয়ে জাহাজটি পাড়ি জমিয়েছিল উরুগুয়েতে। আর এভাবেই তা জড়িয়ে যায় বিশ্বকাপ শুরুর অবিচ্ছেদ্য এক গল্পে।
অলিম্পিক গেমসে ফুটবলের তুমুল জনপ্রিয়তা দেখে ফিফার নিজস্ব একটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়। ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে টানা দুবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বমঞ্চে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করে উরুগুয়ে। কেবল ১৯২৪ সালের অলিম্পিক ফাইনাল দেখতেই গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন ৬০ হাজার দর্শক। সেখানে উরুগুয়ে ৩-০ গোলে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে শিরোপা জেতে।
ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আসে পূর্ণতা। ১৯২৮ সালের ২৬ মে আমস্টারডামে ফিফা কংগ্রেসে বিশ্বকাপের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়, জন্ম নেয়— বিশ্বকাপ। নিজেদের স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় উরুগুয়ে।
ফিফার এই সিদ্ধান্ত ইউরোপে খুব একটা সাড়া জাগাতে পারেনি। গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট আর দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সমুদ্রযাত্রার ধকল ছিল। তাছাড়া, ক্লাবগুলোকে প্রায় দুই মাসের জন্য দলের সেরা খেলোয়াড়দের ছেড়ে দিতে হতো, যা আজও ফুটবলে একটি প্রাসঙ্গিক সমস্যা। সুইডেন, স্পেন, ইতালি ও নেদারল্যান্ডস শুরুতে বিশ্বকাপ আয়োজনে আগ্রহী হলেও উরুগুয়েকে দায়িত্ব দেওয়ায় তারা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। প্রতিবাদস্বরূপ ইতালি অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং আরও অনেকে তাদের পথ অনুসরণ করে। ফলে একের পর এক ইউরোপিয়ান দেশ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়াতে থাকে।
জুলাইতে টুর্নামেন্ট শুরুর দুই মাস আগেও কোনো ইউরোপিয়ান দেশ অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। শেষ পর্যন্ত ফিফা সভাপতি জুলে রিমের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টায় চারটি দেশ— বেলজিয়াম, ফ্রান্স, যুগোস্লাভিয়া ও রোমানিয়া রাজি হয় উরুগুয়েতে যেতে।
এই দলগুলোর অংশগ্রহণের পেছনের গল্পটাও বেশ নাটকীয়। রোমানিয়া বিশ্বকাপে অংশ নিতে একরকম বাধ্য হয়েছিল তাদের নতুন রাজা দ্বিতীয় ক্যারলের নির্দেশে, যিনি ফুটবল নিয়ে প্রচণ্ড উৎসাহী ছিলেন। রাজা নিজেই স্কোয়াড নির্বাচন করেছিলেন। তিনি যুগোস্লাভিয়াকেও দল পাঠাতে রাজি করান। আর ফিফার বেলজিয়ান সহ-সভাপতি রোডলফ সিলড্রেয়ার্সের পীড়াপীড়িতে বেলজিয়াম অংশ নেয়।
১৯৩০ সালের ২১ জুন ইতালির জেনোয়া বন্দর থেকে রোমানিয়া দলকে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে কন্তে ভার্দে। এই যাত্রাটি মোটেও সহজ ছিল না। রোমানিয়ার অধিনায়ক রুডলফ ওয়েটজার স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘জেনোয়া যাওয়ার পথে ট্রেনে আমাদের দুটি রাত কেটেছে। সিটগুলো ছিল খুবই বাজে— আমাদের হাড়গোড় সব যেন ভেঙে যাচ্ছিল। তবুও এই কষ্ট সার্থক।’
এরপর ফ্রান্সের ভিলফ্রঁশ-সুর-মের বন্দরে কন্তে ভার্দে থামলে ফরাসি দল এবং ফিফার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জাহাজে ওঠেন। তাদের সঙ্গেই ছিলেন জুলে রিমে নিজে। তার সুটকেসের ভেতরে সযত্নে রাখা ছিল সেই মহামূল্যবান বিশ্বকাপ শিরোপা, যা পরবর্তীতে তারই নামে পরিচিতি পায়। এরপর স্পেনের বার্সেলোনা বন্দর থেকে বেলজিয়াম স্কোয়াডকে তুলে নেয় জাহাজটি। অন্যদিকে, কন্তে ভার্দেতে জায়গা না পাওয়া একমাত্র ইউরোপিয়ান দল ছিল যুগোস্লাভিয়া। তারা তিন দিনের ট্রেন যাত্রার পর ফ্রান্সের মার্সেই বন্দর থেকে ফ্লোরিডা নামের অন্য একটি জাহাজে চড়ে রওনা হয়।
আটলান্টিকের বুকে ১৫ দিনের দীর্ঘ যাত্রায় খেলোয়াড়দের ফিটনেস ধরে রাখা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাই কন্তে ভার্দের ডেকের ওপরই চলত তাদের দৈনন্দিন অনুশীলন। বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা ফ্রান্সের লুসিয়েঁ লরাঁ সেই দিনগুলোর স্মরণে বলেছিলেন, ‘মাঠের কৌশল বা ওই জাতীয় কিছু নিয়ে কোনো কথা হতো না, কোনো কোচিং ছিল না। শুধু ডেকের ওপর দৌড়ানো হতো। সব সময় শুধু দৌড় আর দৌড়। নিচে আমরা ব্যায়াম করতাম— স্ট্রেচিং, লাফানো, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা আর ভারোত্তোলন। সেখানে একটা সুইমিং পুলও ছিল, আবহাওয়া ঠান্ডা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা সবাই সেটা ব্যবহার করতাম।’
তিনি যোগ করেছিলেন, ‘এটা অনেকটা ছুটিতে ক্যাম্পিংয়ের মতো ছিল। আমরা কেন উরুগুয়েতে যাচ্ছি, সেটার বিশালত্ব তখনও আমরা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারিনি। বহু বছর পর আমরা ইতিহাসের পাতায় আমাদের অবস্থান বুঝতে পেরেছি। এটা ছিল স্রেফ একটা রোমাঞ্চকর অভিযান। আমরা ছিলাম আনন্দ করতে থাকা কিছু তরুণ। কন্তে ভার্দেতে আমাদের যাত্রা ছিল ১৫ দিনের। সেগুলো ছিল দারুণ আনন্দের ১৫টি দিন।’
আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার পর কন্তে ভার্দে ২৯ জুন পৌঁছায় ব্রাজিলের রিও দি জানেইরোতে। সেখান থেকে সেলেসাওদের স্কোয়াডকে তুলে নিয়ে অবশেষে ৪ জুলাই জাহাজটি উরুগুয়ের রাজধানী মন্তেভিদিওতে নোঙর করে।
কোনো বাছাইপর্ব না থাকায় ফিফার আমন্ত্রণ পেয়ে শেষ পর্যন্ত ১৩টি দেশ অংশ নেয় বিশ্বকাপের অভিষেক আসরে। এর মধ্যে সাতটি ছিল দক্ষিণ আমেরিকার— স্বাগতিক উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি, প্যারাগুয়ে, পেরু ও বলিভিয়া এবং দুটি উত্তর আমেরিকার— মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র।
ইউরোপিয়ানদের অনুপস্থিতি নিয়ে টুর্নামেন্টের আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোলরক্ষক জেমস ডগলাস মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমার মতে ইউরোপের ফুটবল খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি এই টুর্নামেন্টকে খাটো করবে না। অলিম্পিক গেমস দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফুটবল খেলুড়ে দেশগুলো রিভার প্লেটের (দক্ষিণ আমেরিকার নদী রিও দে লা প্লাতা) দুই পাশেই অবস্থিত।’
ডগলাসের কথাই যেন সত্য প্রমাণিত হয়। ১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বকাপটি ক্রীড়াসুলভ ও আর্থিক— উভয় দিক থেকেই এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে। ৩০ জুলাইয়ের ফাইনালে ৬৮ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে উল্লাস করে স্বাগতিক উরুগুয়ে। প্রথমার্ধে ২-১ গোলে পিছিয়ে থাকলেও দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে তারা আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে পরাজিত করে প্রথম দল হিসেবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়।
কন্তে ভার্দে তাই কেবল কয়েকশ যাত্রী আর একটি ট্রফি বয়ে আনেনি, বরং আটলান্টিকের নীল জলরাশি চিরে সেই সমুদ্রযাত্রা আসলে উন্মোচন করেছিল ফিফা বিশ্বকাপ নামক এক মহাকাব্যিক উন্মাদনার প্রবেশদ্বার।
