ইরান যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে সামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও জ্বালানি—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করছে চীন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেইজিং সফরের আগমুহূর্তে ফাঁস হওয়া মার্কিন সামরিক গোয়েন্দাদের এক গোপন নথিতে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
আজ বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট এ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের জন্য রিপোর্টটি তৈরি করেছে জয়েন্ট স্টাফের গোয়েন্দা বিভাগ। এ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের ভেতরে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গোয়েন্দা নথি পড়েছেন এমন দুই মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, রিপোর্টটিতে ‘ডাইম’ ফ্রেমওয়ার্ক বা রাষ্ট্রীয় শক্তির চারটি ক্ষেত্র—কূটনীতি, তথ্য, সামরিক ও অর্থনীতিকে বিবেচনায় নিয়ে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে চীনের কৌশল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এতে মূলত ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের চিত্র উঠে আসে বলে জানিয়েছেন ওই দুই কর্মকর্তা।
গোয়েন্দা নথিতে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করে, তখন থেকেই চীন অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে চাল চালছে।
একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা যখন ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের তেল অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটি রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন চীন সেই মিত্রদের কাছেই বিপুল অস্ত্র বিক্রি করছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে যে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, চীন সেখানে ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
নিজেদের বিশাল জ্বালানি মজুত এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের কারণে চীন খুব সহজে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। একইসঙ্গে জ্বালানি সংকটে পড়া বিভিন্ন দেশকে সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে বেইজিং।
মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের’ চীন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রায়ান হ্যাস বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে থাকা দেশগুলোকে সহায়তা করার মাধ্যমে চীন আসলে কোনো পরোপকার করছে না। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে ফাটল ধরানোর সুপরিকল্পিত চাল।’
হ্যাসের মতে, অতীতে জ্বালানি সংকট নিয়ে বিশ্বজুড়ে জরুরি বৈঠক আয়োজন করত ওয়াশিংটন। কিন্তু এবার ট্রাম্প প্রশাসন তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
বেইজিং এখন সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে বলে মনে করেন তিনি।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল সংখ্যক অস্ত্র খরচ করে ফেলায় তাইওয়ান, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় গোয়েন্দা রিপোর্টে।
বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র, থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়াকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্যাকব স্টোকস বলেন, ‘এই যুদ্ধ মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র কত দ্রুত অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে পারে, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। একইসঙ্গে তাইওয়ানের সামরিক বাজেট কমানোর অজুহাতও তৈরি হয়েছে।’
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা খরচ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব অস্ত্রের বড় অংশ ভবিষ্যতে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছে চীন।
গোয়েন্দাদের মতে, ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনায় এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারবে বেইজিং।
রিপোর্টে বলা হয়, চীন তাদের সরকারি প্রচারে ইরান যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দায়িত্বশীল রক্ষক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি দুর্বল করতে চাইছে বেইজিং। ইরান যুদ্ধকে সেই প্রচারের বড় উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করছে তারা।
চীন প্রচার করছে, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বারবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গোয়েন্দা নথিতে ইরান যুদ্ধ নিয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন মিত্রদের অস্ত্র সরবরাহ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এক ধরনের পরিবর্তন এনেছে চীন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির’ সিনিয়র ফেলো জ্যাকব স্টোকস বলেন, ‘সার্বিকভাবে বিচার করলে ইরান যুদ্ধ চীনের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করেছে। চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি আগ্রাসী ও একতরফা শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। কারণ তারা নিজেদের মধ্যপ্রাচ্যের ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে।’
তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল গোয়েন্দা মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো দেশের দিকে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য চলে গেছে, এমন দাবি ভুল।’
ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বেইজিং সফরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সামলে কীভাবে চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা যায়।
