দুর্গম পাহাড়ি জনপদ কুরুকপাতায় হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে রোগী পরিবহন ও চিকিৎসাসেবায় ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া সরকারি গাড়ি ও সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম অবশেষে জনগণের সেবায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারে সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন সরেজমিন তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায় এবং উপজেলা প্রশাসন গাড়িটি উদ্ধার করে পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেয়। একইসঙ্গে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত বাড়িতে স্থাপন করা সোলার প্যানেলটি খুলে এনে ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে।
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সংকট বিদ্যমান। সম্প্রতি হাম, নিউমোনিয়া ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলো থেকে অসুস্থ শিশু ও রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছিল স্থানীয়দের।
গত ৯ মে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে আসে, রোগী পরিবহনের সরকারি গাড়ি ও সোলার প্যানেল চেয়ারম্যানের বাড়িতে। ফলে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসানো হলেও বিদ্যুৎ ও রোগী পরিবহন সংকটের কারণে এর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি তদন্তে নামে এবং দীর্ঘদিন অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকা গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলমের উদ্যোগে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে সেটি মেরামত করা হয়।
মেরামত শেষে গাড়িটি আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে গাড়িটি ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যাতে দুর্গম এলাকার রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে আনা-নেওয়া করা যায়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাম আক্রান্ত ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কাজেও গাড়িটি ব্যবহার করা হবে।
একই সঙ্গে প্রায় ৫ হাজার ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, ব্যাটারি ও আইপিএস চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে।
ফলে, সেখানে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনায় বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ ও যানবাহনের অভাব শুধু স্বাস্থ্যসেবাকেই নয়, সামগ্রিক জীবনযাত্রাকেও দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশেষ করে হামের প্রাদুর্ভাবের সময় একটি গাড়ি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা রোগীদের জন্য জীবন রক্ষাকারী সহায়তা হিসেবে কাজ করতে পারে।
ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের নেতারা জানান, শুধু অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। দুর্গম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি রোগী পরিবহন, স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তারা বলেন, উদ্ধার হওয়া গাড়ি ও সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম জনগণের সেবায় ফিরিয়ে দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, ‘দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে আমরা তদন্তে যাই। পরে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সরকারি সম্পদ উদ্ধার করা হয়েছে। জনগণের সেবার জন্য দেওয়া সম্পদ জনগণের কল্যাণেই ব্যবহার হতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘গাড়িটি সচল থাকলে রোগীদের এত কষ্ট করে বহন করতে হতো না। এখন এটি দুর্গম এলাকার অসুস্থ মানুষদের দ্রুত চিকিৎসাসেবার আওতায় আনতে সহায়তা করবে।’
কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে গাড়ি ও সোলার প্যানেল ফেরত দেওয়া হয়েছে।’
হাম রোগে আক্রান্ত রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকা স্বেচ্ছাসেবক ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের নেতা মেনথাক বলেন, ‘প্রশাসনের এই উদ্যোগ কেবল সাময়িক উদ্যোগ হয়ে থাকবে না। এটা দুর্গম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের সূচনা হবে। বিশেষ করে হামসহ সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় জরুরি পরিবহন, বিদ্যুৎ ও স্থায়ী চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।’
