Tuesday, May 12, 2026
Homeখেলাদন্তচিকিৎসকের পায়ে উত্তর কোরিয়ার রূপকথা

দন্তচিকিৎসকের পায়ে উত্তর কোরিয়ার রূপকথা

সেনাবাহিনীর দাঁতের ডাক্তার পাক ডু-ইকের হাতে সকালে থাকে ড্রিল, বিকেলে ফুটবল। তার জীবনের এই দুই ছন্দ কোনোদিন আলাদা হয়নি। পেশা এক দিকে, নেশা আরেক দিকে। আর মাঝখানে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীর সবুজ ইউনিফর্ম। ১৯৬৬ সালের গ্রীষ্ম। সেই মানুষটিই যখন ইংল্যান্ডের মিডলসব্রো শহরে এসে পা রাখলেন, তখন থেকেই বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে লেখা হতে শুরু করল এক নতুন, অবিশ্বাস্য অধ্যায়।

সেই বিশ্বকাপে উত্তর কোরিয়ার আসার গল্পটাই আগে বলা দরকার, কারণ মাঠে নামার আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল তাদের লড়াই। এশিয়া, আফ্রিকা আর ওশেনিয়ার ষোলোটি দেশকে মাত্র একটি কোটায় খেলার সুযোগ দিয়েছিল ফিফা। এই অপমানে আফ্রিকার সমস্ত দল বয়কট করল বিশ্বকাপ। ওশেনিয়ার দলগুলোও। বাছাইপর্বের ময়দানে টিকে রইল কেবল এশিয়ার গুটিকয়েক দল, আর তাদের টপকেই উত্তর কোরিয়া এসে পৌঁছাল ইংল্যান্ডের মাটিতে।

কিন্তু পৌঁছানোর পরও স্বস্তি নেই। ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটির চাপ, এই দলটি যেন খেলতে না পারে। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন শেষমেশ সেই চাপ সরলো বটে, তবে শর্ত রইল, মাঠে কোরিয়ান জাতীয় সংগীত বাজবে না। এরজন্য তৈরি করে অদ্ভুত এক নিয়ম। শেষে একটা দেশ তার নিজস্ব সুর ছাড়া বিশ্বকাপ খেলতে নামে!

রাজনীতির এই অপমানটা বুকে চেপে রেখে মিডলসব্রোর রাস্তায় হাঁটত ১৫ জন কোরিয়ান ছেলে। শহরটা ছিল ইংল্যান্ডের শিল্পাঞ্চলের মাঝে। কয়লা খনি আর ইস্পাত কারখানার শ্রমিকরা এখানে থাকে, টাই পরা ভদ্রলোকেরা নয়। এই শহরের মানুষেরা ছোটখাটো গড়নের কোরীয় ছেলেগুলোকে দেখে প্রথমে বিস্মিত হলেও, অচিরেই তাদের ভালোবেসে ফেলল। তারা স্থানীয় মাছ-ভাজার দোকানে গিয়ে বসে থাকত, পাড়ার শিশুদের সঙ্গে হাসিতে মেতে উঠত, ভাষা না জানলেও ইশারায় আর আন্তরিকতায় স্থানীয়দের সঙ্গে গল্প জমানোর চেষ্টা করত। মিডলসব্রোর শ্রমিকশ্রেণির মানুষেরা খুব সহজেই তাদের আপন করে নিয়েছিল। এর কারণও খুব সহজ, পৃথিবীর ক্ষমতাবান আর বড়লোকেরা যখন কাউকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে, তখন সাধারণ, খেটে-খাওয়া মানুষেরা ঠিকই একে অপরের আত্মার আত্মীয়কে চিনে নিতে পারে।

গ্রুপ পর্বে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গী সোভিয়েত ইউনিয়ন, চিলি আর ইতালি। প্রথম ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের মুখোমুখি হলো কোরিয়া, হারল ০-৩ গোলে। কিন্তু ওই স্কোরলাইন বলে না যা মাঠে ঘটেছিল। প্রথম ঘণ্টা কোরিয়া লড়াই করেছিল, সোভিয়েত দানবের বিরুদ্ধে মাথা নোয়ায়নি। শেষ আধঘণ্টায় শরীরে আর কুলালো না। তবুও ম্যাচ শেষে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে এই অদম্য যোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানিয়েছিল মিডলসব্রোর দর্শকেরা।

দ্বিতীয় ম্যাচে চিলির বিপক্ষে ১-১ ড্র। সেই গোলটি করেছিলেন পাক সেউং-জিন, বাঁ দিক থেকে তীরের মতো ছুটে এসে। স্টেডিয়াম ফেটে পড়েছিল। চিলির বিরুদ্ধে পয়েন্ট ভাগ হওয়ায় কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন সরু হয়ে আসে। তবে শুধু ইতালিকে হারাতে পারলেই হবে। শুধু ইতালিকে।

ইতালি সেবারের টুর্নামেন্টে অন্যতম ফেভারিট। মাজ্জোলা, রিভেরা, বুলগারেল্লি, নামগুলো ইউরোপিয়ান ফুটবলে সোনার হরফে লেখা। কোচ এদমোন্দো ফাব্রি খেলার আগের দিন কোরিয়ান ফুটবল নিয়ে বিশেষ কিছু জানতেও আগ্রহ দেখাননি। ইতালীয় মিডিয়া পরের রাউন্ডের হিসাব কষছিল। কয়েকজন খেলোয়াড় কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন বলে শোনা যায়। এই অহংকারটুকু সেদিন তাদের কাল হয়েছিল।

১৯ জুলাই, ১৯৬৬। আয়েসম স্ট্রিট স্টেডিয়াম, মিডলসব্রো।

পঁচিশ হাজার দর্শকের মধ্যে বেশিরভাগই কোরিয়াকে সমর্থন করছে, কারণ মিডলসব্রো ইতিমধ্যে তাদের নিজের দল বানিয়ে নিয়েছে। ইতালি শুরু থেকে চাপ অব্যাহত রাখে, বলও বেশি সময় ছিল তাদের, কিন্তু গোল হলো না। কোরিয়ার রক্ষণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। প্রতিটি আক্রমণে একজন পিছিয়ে আসছে, একজন কভার দিচ্ছে। এরা সেনাবাহিনীর মানুষ, শৃঙ্খলা তাদের হাড়ে-মজ্জায়।

বিরতির তিন মিনিট আগে লি ডং-উন বাঁ দিক থেকে বল টেনে এনে ঢুকে পড়লেন ইতালির বক্সের ভেতরে। ডিফেন্ডাররা হকচকিয়ে গেলেন এক মুহূর্তের জন্য। সেটুকুই যথেষ্ট। বল অরক্ষিত হয়ে ছিটকে এলো পাক ডু-ইকের সামনে। গোলরক্ষক আলবার্তোসি এগিয়ে এলেন। কিন্তু ততক্ষণে পাক ডু-ইকের ডান পা থেকে বেরিয়ে গেছে এক ভীতিজাগানিয়া শট। নিচু, ধারালো, নির্দয়। বল জালে ঢুকল এমন শব্দে যে শব্দটা স্টেডিয়ামের ছাদে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো।

দ্বিতীয়ার্ধে ইতালি মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাজ্জোলা এবং রিভেরা পালা করে আক্রমণ করলেন। বল আসতে লাগল একের পর এক। কোণ থেকে, দূর থেকে, কাছ থেকে। কিন্তু গোলরক্ষক রি চান-মিউং সেদিন যেন লোহার দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। ডাইভ দিচ্ছেন, পাঞ্চ করছেন, ধরে ফেলছেন। একটা নিশ্চিত গোল ছিল যেটা তিনি এক হাতে ঠেকিয়ে দেন। স্টেডিয়াম চিৎকার করে ওঠে, আর সেটা কোরিয়ার জন্য। নব্বই মিনিট শেষ হলো। রেফারি বাঁশি বাজালেন। স্কোরবোর্ডে লেখা রইল: উত্তর কোরিয়া ১, ইতালি ০।

সেদিন রাতে ইতালীয় দল নেপলস বিমানবন্দরে ফিরলে ক্রুদ্ধ সমর্থকরা পচা টমেটো আর ডিম নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। খেলোয়াড়দের পেছনের দরজা দিয়ে বেরোতে হয়। তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করা হয় কোচ ফাব্রিকেও। ইতালীয় ফুটবলের ইতিহাসে এই হারটি এখনও সবচেয়ে বিব্রতকর মুহূর্তগুলোর একটি।

কোয়ার্টার ফাইনাল।

লিভারপুলের গুডিসন পার্ক। প্রতিপক্ষ পর্তুগাল। এবং পর্তুগালের হয়ে খেলছেন ইউসেবিও, মোজাম্বিক থেকে আসা সেই কালো চিতা, যার পায়ের শট বন্দুকের গুলির চেয়ে কম দ্রুত নয়। পুরো ইউরোপ ধরে নিয়েছে পর্তুগালের জয় নিশ্চিত। সংবাদপত্রগুলো ইউসেবিওর পরিসংখ্যান ছেপেছে, কোরিয়ার নাম মেলেনি।

কিন্তু ম্যাচ শুরু হতে না হতেই পর্তুগালের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো। প্রথম মিনিটেই পাক সেউং-জিনের গোলে কোরিয়া এগিয়ে গেলো। স্টেডিয়াম থমকে গেলো। তারপর পনেরো মিনিটের মাথায় লি ডং-উন করলেন ২-০। পর্তুগাল তখনও বিভ্রান্ত, রক্ষণে সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছে না। পঁচিশ মিনিটে ইয়াং সুং-কুক দিলেন তৃতীয় গোল। ৩-০। কোরিয়া কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের বিরুদ্ধে তিন গোলে এগিয়ে।

গুডিসন পার্কে সেই মুহূর্তে নিস্তব্ধতা নেমে আসে যে ধরনের নিস্তব্ধতা আসে যখন মানুষ বিশ্বাস করতে পারে না কী দেখছে। সাংবাদিকরা নোট নিচ্ছেন, পরে সম্পাদকেরা তা পড়ে মাথা নাড়বেন, এই স্কোরলাইন কি ভুল? কোরিয়া কি সত্যিই ৩-০ এগিয়ে? কিন্তু স্কোরবোর্ড মিথ্যে বলে না।

ঠিক তখনই ম্যাচে নেমে এলো ইউসেবিও নামের ঝড়।

তিনি যেন একাই বদলে দিলেন পুরো গল্প। তার গতি, শক্তি, শট—সবকিছু মিলিয়ে পর্তুগাল ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করে। উত্তর কোরিয়ার ক্লান্ত শরীরগুলো আর সেই তীব্রতা ধরে রাখতে পারেনি।

৩-০ থেকে স্কোর হয়ে গেলো ৩-২। তারপর ৩-৩।

রূপকথা তখনো হার মানতে চাইছিলো না ঠিকই, কিন্তু নির্দয় বাস্তব ধীরে ধীরে তার টুঁটি চেপে ধরলো। শেষ পর্যন্ত ৫-৩ গোলের ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিলো পর্তুগাল। একে একে চারটি গোল করে ইউসেবিও একাই গুঁড়িয়ে দিলেন উত্তর কোরিয়ার স্বপ্ন।

শেষ বাঁশির পর উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়দের মুখে ছিল নিঃশেষ ক্লান্তি আর নিঃশব্দ বেদনা। তারা হেরে গেছে, কিন্তু পৃথিবী জানত, এই হার সাধারণ কোনো হার নয়। কারণ তারা ইতোমধ্যেই অসম্ভবকে ছুঁয়ে ফেলেছিলো।

১৯৬৬ সালের সেই বিশ্বকাপ আজও শুধু শিরোপাজয়ীদের জন্য স্মরণীয় নয়। মানুষ আজও মনে রাখে কয়েকজন অচেনা তরুণকে, যারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে এসে ফুটবলকে কয়েক সপ্তাহের জন্য রূপকথায় বদলে দিয়েছিল।

আর সেই রূপকথার কেন্দ্রে আজও জ্বলজ্বল করে এক নাম, পাক ডু-ইক।

একজন দন্তচিকিৎসক, যিনি এক বিকেলে বিশ্ব ফুটবলের অহংকার ভেঙেছিলেন। আর একটি দল, যারা প্রমাণ করেছিল, কখনো কখনো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লেখে সেই মানুষরাই, যাদের দিকে শুরুতে কেউ তাকিয়েও দেখে না।
 

Most Popular