Tuesday, August 18, 2026
Homeবাংলাদেশরাজনৈতিক নিয়োগ কিছু হচ্ছে, স্বাস্থ্যে অতটা হয়নি: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

রাজনৈতিক নিয়োগ কিছু হচ্ছে, স্বাস্থ্যে অতটা হয়নি: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ করেছে। এ সময় স্বাস্থ্যখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং এ খাতে সর্বকালের সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গত ছয় মাসের কার্যক্রম কেমন ছিল? মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, অর্জন ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার কথা বলেছে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতের সঙ্গে।

 

দ্য ডেইলি স্টার: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আপনার ছয় মাসের অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন কী?

এম এ মুহিত: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটা বড় মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয় ২০ কোটি মানুষের জীবনকে এফেক্ট করে। সেটা মাথায় রেখেই আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। নির্বাচনের আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা আমরা স্বাস্থ্যখাতের জন্য করেছিলাম, যা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছি। সেই ম্যান্ডেট নিয়ে যখন পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছি, এই খাতটাকে ঢেলে সাজানোর জন্য কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।

ইশতেহারে স্বাস্থ্যখাতে ২০টি প্রতিশ্রুতি করেছি। দায়িত্বে আসার পরে প্রথমেই দেখার চেষ্টা করেছি যে, কী অবস্থায় আমরা এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাকে পেলাম। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়েছি, আপনারাও গিয়েছেন। আমরা দেখেছি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো ভেঙে পড়েছে, ডাক্তার পাঁচজন থাকার কথা হলে আছেন দুইজন, নার্সের সংকট, রোগীরা হাসপাতালে ঢুকতেই পারে না, দালালের খপ্পরে পড়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা নিতে গ্রামের জমিজমা বিক্রি করে ঢাকায় ক্যানসার হাসপাতালে আসতে হচ্ছে, বারান্দায় ঘুমাতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি।

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অবশ্যই আছে এবং আমরাও চাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে, বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাকে জোরদার করতে। দীর্ঘমেয়াদে আমরা প্রিভেনশন, প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জোরদার, জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ওপরে জোর দেবো এবং সুস্বাস্থ্যের ওপর বিনিয়োগ করব।

এই ছয় মাসের অর্জন কয়েকটা বলি। প্রথমত, এই বিরাট খাতের ম্যাপিং করতে পেরেছি, সমস্যাগুলো শনাক্ত করেছি। আপনারা দেখতে পাবেন, আমাদের দৌড়াদৌড়ির কারণে মানুষের কিছুটা আস্থা ফিরেছে। ছয় মাস আগের যে চিত্র বললাম, সেটার তুলনায় আজকে হাসপাতালে গেলে একটু হলেও ভালো দেখবেন। এখন ডাক্তারের উপস্থিতি আগের চেয়ে বাড়ছে। আমরা কয়েকটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছি। সিভিল সার্জনদের সক্রিয় করেছি।

আর উপজেলা পর্যায়ে আমরা বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ঘোষণাও দিয়েছি, আজকে যে ৩০ বা ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে বাংলাদেশের ৫০০টির মতো উপজেলায়, প্রত্যেকটি ১৫১ বেডের পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হবে। সেখানে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনির মতো বিভাগ আলাদাভাবে থাকবে এবং অন্যান্য চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, আগামী তিন বছরের মধ্যে এমন একটা জায়গায় আমরা যেতে পারব, যেখানে অধিকাংশ মানুষ তার উপজেলাতেই বেশিরভাগ রোগের চিকিৎসা নিতে পারবেন। জেলা পর্যায়ের জন্যও আমরা কিছু কাজ করেছি। জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত সেবা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগী অনেক। ঢাকা আর চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রত্যেকটা জেলা হাসপাতালে ডায়ালাইসিস ইউনিট তৈরি করব। ক্যানসার চিকিৎসার জন্য জাতীয় পর্যায়ে যেমন ক্যানসার ইনস্টিটিউটকে জোরদার করছি, সারাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছি।

আগামী অক্টোবরে পাঁচটি শিশু হাসপাতাল উদ্বোধন হবে। সেটার কাজ ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এখন শেষ পর্যায়ের সাজানো ও লোকবলের ব্যবস্থা করছি।

কাজেই, ছয় মাস হিসেবে কিন্তু অনেক অর্জন হয়েছে এবং সামনে অনেক কাজ আছে। জনগণকে আমরা আস্থায় নিয়ে যদি এগোতে পারি, তাহলে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারব।

 

ডেইলি স্টার: আপনারা যখন এসেছেন, তখন বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। ততদিনে হামের প্রাদুর্ভাব প্রকট হয়ে গেছে এবং আমরা দেখলাম, আপনারা দ্রুত টিকা দিতে পেরেছেন। কিন্তু, এখন দেখা যাচ্ছে এবং সরকারের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হচ্ছে যে, ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং এখনো হামের প্রাদুর্ভাব চলছে, প্রায় প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছে। জুলাইয়ের চেয়ে আগস্টে দৈনিক মৃত্যুর হারও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপনারা শুধুমাত্র টিকার ওপর জোর দিয়েছেন, কিন্তু হাসপাতালে ব্যবস্থাপনার জায়গায় ঘাটতি থাকায় মৃত্যু বেড়েছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?

এম এ মুহিত: হামের প্রাদুর্ভাব বিশাল একটা শকিং ব্যাপার ছিল পুরো সরকার ও দেশবাসীর জন্য। আমরা সেই সময়ে যে কাজগুলো করেছি, খুবই দ্রুতগতিতে কারণটা শনাক্ত করেছি। ২০২০ সালের পর থেকে ঠিকভাবে আমাদের ইমিউনাইজেশন প্রোগ্রাম হয়নি। বিশেষ করে চার-পাঁচ বছর পরপর একটা বিশেষ ক্যাম্পেইন করতে হয়। সেটা ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল, যা হয়নি। আমাদের টিকার সরবরাহটা বিগত সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে ভেঙে পড়েছে। ঠিক সময়ে টিকা আসেনি। এই কারণেই হামের প্রাদুর্ভাবটা হয়েছে। বিগত সরকার ও তার আগের সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণেই এই পর্যায়ে এসেছে।

আমরা দায়িত্বে এসেই পেলাম আগের সরকারের এই রেশ। মনে রাখতে হবে, করোনার চেয়ে হামের জীবাণু চার-পাঁচ গুণ বেশি সংক্রামক। হামের ক্ষেত্রে একজন সংক্রমিত হলে আরও ১৮ জনকে আক্রান্ত করে। ফলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ করা, টিকা দেওয়া।

আমরা দ্রুত দেশ-বিদেশে যোগাযোগ করে এক মাসের মধ্যে টিকা নিশ্চিত করলাম। এক মাসের মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দিতে পেরেছি। এটা কিন্তু বৈশ্বিক মানদণ্ডে সবচেয়ে বড় টিকাদান ক্যাম্পেইনের মধ্যে অন্যতম। কাজেই আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না।

কিন্তু আপনি যথার্থই বলেছেন, এখনো হামের সংক্রমণ হচ্ছে এবং আমরা এখনো সিরিয়াস। গতকাল ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীসহ আমরা বিষয়টা নিয়ে এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেছি তথ্য-উপাত্ত নিয়ে। সেখানে কয়েকটা জিনিস পেয়েছি। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি এবং আমি নিজেও এই অঙ্গনেরই মানুষ। এখানে যেটা হয়েছে, হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গেছে, প্রতিদিন মৃত্যু বাড়ছে; পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুতগতিতে আমাদের পরিকল্পনা করতে হয়েছে। নিয়মিত হামের ক্যাম্পেইন যেভাবে পরিকল্পনা করা হয় সেটাই করা হয়েছে, ব্লক বাই ব্লক ম্যাপিং করার মতো সময় আমাদের ছিল না। আমরা একটা সম্ভব্য সংখ্যা পেয়েছি ইউনিসেফের কাছ থেকে। এই সংখ্যা একটু পুরোনো প্রাক্কলনের হওয়ায় একটু কম হয়ে গেছে। ফলে দেখা গেছে, যখন আমরা টিকা দিয়েছি ওই সংখ্যা পার হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে সংখ্যাটায় হয়তো কিছু মিসিং চিলড্রেন ছিল।

যেসব শিশু মারা গেছে, আমরা দেখেছি যে তাদের ৯০ শতাংশ টিকা পায়নি। তাহলে টিকা ছাড়া এই শিশুগুলো থাকলো কীভাবে? আমাদের স্বাস্থ্যের এটাও সংকট। এখানে দুর্নীতি হয়েছে, কাজ কিন্তু হয়নি। চেক করে পেলাম, আমাদের প্রায় ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী থাকার কথা থাকলেও ১৫ হাজার পদ খালি। অর্থাৎ, আমার ৪০ শতাংশ লোকবল নেই। স্বাভাবিকভাবেই যতটুকু জনবল আছে, তারা কাজ করলে ৬০ শতাংশ কভারেজ হওয়ার কথা। তারা কিন্তু ভীষণ পরিশ্রম করে সেটাকে ৯০ শতাংশে নিয়েছেন। এটা সিস্টেমের সমস্যা।

বিজ্ঞান বলছে, হাম সংক্রামক রোগ, খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিরোধের একমাত্র উপায় টিকা। এগুলো আমাদের করছি এবং করতে হবে। বাস্তবে বিজ্ঞান আমাদের এটাও বলছে, এখন যে হার আছে তাতে প্রাদুর্ভাব পুরো শেষ হতে ওই ১০ শতাংশ মিসিং চিলড্রেনকেও টিকা দিতে হবে। তাতে করে পুরো কমিউনিটিতে একটা ইমিউনিটি হবে। যদি সেই টিকা দিতে আরও এক মাস লাগে, এরপরে ইমিউনিটি হতে তার আরও দু-একমাস লাগবে। কাজেই আগামী তিনমাস এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রক্রিয়াগুলো আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। তাহলে হয়তো অন্তত তিন মাস পরে আমরা দেখব যে, এটা শেষ হয়েছে।

তারচেয়েও বড় কথা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা অনুমান আছে যে, ২০৩০ সালে বিশ্বে আবার হামের মহামারি হতে পারে। ২০৩০ কিন্তু দূরে না। ২০৩০ যেহেতু ধারণা করেছে, এটা ২০২৯ সালেও হতে পারে। কাজেই একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি মনে করি, আমাদের এই হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে এবং এবার যা শিখলাম, যে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করলাম, সেগুলোর থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ফেলতে হবে।

অর্থাৎ, এখনই স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে হবে; টিকার কোল্ড চেইন ঠিক রাখার জন্য লজিস্টিক নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো সময় যেকোনো মহামারি আসতে পারে। সে কারণেই শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর যেকোনো দেশের স্বাস্থ্যখাতের অগ্রাধিকার এটাই। আমরাও সেই লক্ষ্যে কাজ করছি।

 

ডেইলি স্টার: আপনাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কতগুলো বড় বিষয় ছিল। যেমন: এক লাখ জনবল নিয়োগ, হেলথ কার্ড, যেসব রোগে বেশি টাকা খরচ হয় সেগুলোতে পিপিপির আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু, সেগুলো খুব বেশি এগোয়নি বলেই দৃশ্যত মনে হচ্ছে। বেশিরভাগই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে কি আটকে আছেন? হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে কি আপনাদের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়েছে?

এম এ মুহিত: এর উত্তর হ্যাঁ এবং না। প্রভাব পড়ার কথা ছিল। হামের মতো এমন একটা প্রাদুর্ভাব সামলাতে আমাদের অনেক সময় চলে গেছে। কিন্তু আমরা সচেতন ছিলাম। অতিরিক্ত সময় দিয়ে ওই কাজগুলোও করেছি। যে কাজগুলোর কথা বললেন, এর আগে কোনো সরকার স্বাস্থ্যখাতে এমন সুনির্দিষ্ট ও বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে আসেনি। প্রত্যেকটিই স্বাস্থ্যখাতের জন্য বড় কাজ। পুরো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করে ফেলা বিশাল কাজ। প্রায় ১৫ হাজারের মতো হেলথ ফ্যাসিলিটিজ আছে। প্রত্যেকটাকে প্রস্তুত করতে হবে এর জন্য। তারপর পুরো সিস্টেমটার ডিজাইন ও আর্কিটেকচার লাগবে।

ই-হেলথ কার্ড নিয়ে আমরা কাজ এগিয়েছি। ২০ কোটি মানুষের একটা ডিজিটাল সিস্টেম নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে, যেখানে প্রচুর ব্যক্তিগত তথ্য থাকবে। কাজেই সেই তথ্যের নিরাপত্তার বিষয় আছে। আমরা এই ছয় মাসে বিষয়গুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করছি। এই ডিজিটাল আর্কিটেকচার কীভাবে হবে, সেটা নিয়ে কিছু ডেমো তৈরি হচ্ছে এবং আমরা কাজ এগিয়ে নিচ্ছি, পিছিয়ে নেই।

আমরা পরিকল্পনাতেও বেশি সময় দিতে চাই। কারণ, এই কাজগুলো ভুল পথে করলে অনেক বড় ভুল হবে। সময় নিয়ে ঠিক পথে করলে আমরা হয়তো ধীরে এগোবো, কিন্তু ঠিক দিকে এগোবো। ই-হেলথ কার্ডের পাইলট প্রকল্প এ বছরই শুরু হবে। এডিবির সঙ্গে সেটা নিয়ে চুক্তি ও প্রস্তাবনা ইতোমধ্যেই আছে। সেটার কাজও এগোচ্ছে।

এক লাখ জনবল আমরা নিয়োগ দেবো। কিন্তু, সবাইকে একবারে নিয়োগ দিয়ে প্রশিক্ষণসহ সবকিছু একবারে করতে পারবো না। তাই ধাপে ধাপে করবো। কী কী ধরনের জনবল নেবো, সেটার বিশ্লেষণ ইতোমধ্যে করেছি। আমরা অন্তত ২০ হাজার জনবল নিয়োগ দিয়ে শুরু করব এবং সেই প্রক্রিয়া চলছে।

এখানে কিছু প্রশাসনিক বিষয় আছে। বর্তমানে যে মাঠকর্মীরা আছেন, তারা তিন ভাগে বিভক্ত। একভাগ স্বাস্থ্যর অধীনে, একভাগ পরিবার পরিকল্পনার অধীনে এবং আরেকভাগ কমিউনিটি ক্লিনিকের সঙ্গে। তাদের একীভূত করে এবং নতুন যারা নিয়োগ পাবে তাদের প্রশিক্ষণ দেবো। তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করতে হবে, প্রত্যেককে একটা করে কিট দেওয়া হবে। সেখানে অনেকগুলো আধুনিক ডিভাইস থাকবে এবং সেগুলো ডিজিটালি সংযুক্ত থাকবে। এই সবকিছুর জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চলছে।

 

ডেইলি স্টার: আপনাদের একটা অর্জন হলো, স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির ১ শতাংশের উপরে নিতে পেরেছেন। কিন্তু, সমস্যা হলো স্বাস্থ্য বিভাগ তার উন্নয়ন বরাদ্দ কখনোই পুরোপুরি খরচ করতে পারে না। এবারের বরাদ্দের প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা আপনারা কীভাবে ব্যয় করবেন?

এম এ মুহিত: এটা একদিকে চ্যালেঞ্জ, আরেকদিকে সুযোগ। প্রথমত, এই বাজেট পাওয়াটা আমাদের সফলতা। আমাদের সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলেছে এবং সেই ফান্ড আমাদের আছে। আমাদের পরিকল্পনাও আছে। কিন্তু আপনার একটা কথা যথার্থ—আমাদের চ্যালেঞ্জ আসলে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং শাসনপদ্ধতি। আরও অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে এবং এর ফলেই বাস্তবায়নের হার খুব কম।

আমরা নির্বাচনের আগে দেড় বছর স্বাস্থ্যখাত নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছি। এবার বাজেটের আগে-পরে কিছু পরিকল্পনার প্রয়োগও করেছি। বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে আন্তঃসংযোগ ছিল না। পূর্বের কিছু পরিকল্পনা আমাদের সঙ্গে মিলে যায় এবং কিছু মেলে না। আমরা সেগুলো নতুন করে সাজিয়েছি। কিছু প্রকল্প বাদ দিয়েছি এবং নতুন কিছু যোগ করেছি।

উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, ৫০০টি ১৫০ শয্যার হাসপাতাল আমরা তৈরি করব। সহজেই বলে ফেললাম। কিন্তু, এটা বিশাল বাজেটের ব্যাপার। আমাদের ডিজিটালাইজ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রচুর কম্পিউটার লাগবে, ট্যাব লাগবে। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়ে তাদের জন্য ডিজিটাল প্রাইমারি হেলথ কেয়ার কিট ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যেকটা উপজেলা হাসপাতালে একটি করে প্যাথলজি ল্যাব, এক্স-রে, আল্ট্রাসাউন্ডের পুরো সেটআপ করা হবে।

 

ডেইলি স্টার: এগুলো কি এই অর্থবছরের মধ্যে করতে পারবেন?

এম এ মুহিত: আমরা বছর দিয়ে ভাবছি না। শুরুতেই বলেছিলাম, আমরা পাঁচ বছরের ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছি এবং পরিকল্পনা ও বাজেটিংয়ের পর এই অর্থবছর আমাদের কাজ বাস্তবায়নের প্রথম বছর। প্রথম বছরের কাজটা কী? আমার ভিত্তিমূল ঠিক করতে হবে। কিছু বড় প্রকল্পের ভিত্তি তৈরি করে ফেলব, যেটা চার বছর ধরে হবে। আমার টিমটাকে সেই জায়গায় তুলতে হবে, যাতে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি থেকে সরে আসতে পারে। এই এক বছরে এটাই আমাদের অগ্রাধিকার।

 

ডেইলি স্টার: আগের সরকারগুলোতে আমরা দেখেছি যে রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হয় অধিকাংশ জায়গায়। আপনারা হাসপাতালগুলোতে প্রায় ১ হাজার ২০০ শয্যা বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছেন, কিন্তু জনবল এখনো দেওয়া যায়নি। এমনকি এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সরকার-সমর্থিত ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন প্রভাব ফেলে বলে সমালোচনা আছে। এ সম্পর্কে কী বলবেন?

এম এ মুহিত: প্রথম কথা, আমরা পুরোনো সরকারের মতো কোনো কিছুই করব না। ১৭ বছরের আন্দোলন, সংগ্রাম এবং তারপরে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আমরা এসেছি। আমরা এটাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি এবং পতিত আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা করেছে, আমরা কোনোভাবেই ওইদিকে যাব না।

শয্যা বাড়ানো হচ্ছে, লোকবল বাড়ছে না—এটা নিয়েও আমরা সতর্ক আছি। আমরা যে ১৫০ শয্যার হাসপাতাল বানানোর পরিকল্পনা করেছি, আর্কিটেক্টদের বলেছি ডিজাইন করতে। তার পরদিনই প্রধানমন্ত্রীসহ আমরা মিটিং করেছি লোকবল নিয়ে। লোকবল নিয়োগে কাজ করছি, দ্রুত ডাক্তার নিয়োগ দিচ্ছি। সোমবারের মিটিংয়েও আমার মূল আলোচনা এটাই ছিল যে, জনবল নিয়োগ না দিয়ে আর একটি ভবনও আমরা বানাব না।

সরকারি প্রক্রিয়ায় লোকবল নিয়োগ দিতে দু-এক বছর লাগে। কাজেই একইসঙ্গে আমাদের ভবন ও জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা শুরু হতে হবে। তাহলে দুই বছর পরে গিয়ে দুটো একইসঙ্গে পাব।

যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে আগের সরকার যেটা করত, অনেক দামি যন্ত্র কিনে প্যাকেটও না খুলে ফেলে রেখেছে, নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা তা করছি না। যন্ত্র কেনার আগে এর জন্য কী কী জনবল লাগবে, সেটা ঠিক করেছি। আমাদের প্রাথমিক চিন্তা ছিল, উপজেলায় ১৫০ শয্যার হাসপাতাল হবে, সেখানেও সম্ভব হলে এখনই অন্তত পাঁচটা ডায়ালাইসিসের শয্যা দিয়ে দিই। কিন্তু লোকবলের দিক দিয়ে চিন্তা করে দেখলাম, এই বিশেষায়িত সেবা দিতে যে লোকবল প্রয়োজন, তারা এখনো তৈরি না। প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টা জানালে তিনিও বললেন, ঠিক আছে, তাহলে তিন বছর পরের জন্য এটা পরিকল্পনা করেন এবং এখন লোকবলকে তৈরি করা শুরু করেন। আমরা জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটকে বলেছি, আগামী তিন বছরে আরও বেশি নার্স ও ডাক্তারকে কিডনি রোগের প্রশিক্ষণ দিতে।

আর বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই যে, আপনারা বারবার এই জিনিসগুলো নিয়ে আলোচনা তোলেন বলেই আমাদেরও সব মনে থাকে এবং আমরা সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করতে পারি।

 

ডেইলি স্টার: রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে কিছু বলবেন?

এম এ মুহিত: রাজনৈতিক নিয়োগ জাতীয় পর্যায়ের বিষয়। হচ্ছে কিছু, হয়। স্বাস্থ্যতে তেমন হয়নি। স্বাস্থ্যতে রাজনৈতিক নিয়োগ সেভাবে হয়নি। এখানে তো ডিগ্রির ব্যাপার থাকে, যোগ্যতার ব্যাপার থাকে, ক্লিনিক্যাল স্পেশালিস্ট লোকজন প্রয়োজন হয়। এ কারণেই এখানে অতটা হয়নি।

কিছু প্রতিষ্ঠানে এর আগেও এটা হয়েছে। আমরা দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজটা করি বলেই ১২ জনকে একইদিনে নিয়োগ দিচ্ছি এবং গণমাধ্যমকে জানাচ্ছি। আগে ১২ জনকে ১২ মাসে নিয়োগ দেওয়া হতো গণমাধ্যমকে না জানিয়ে। আমাদের স্বচ্ছতা আছে এবং আমরা মনে করি, সঠিক ব্যক্তিকেই সঠিক জায়গায় নিয়োগ দিচ্ছি।

আপনারা কাজ দেখুন। সঠিক বা বেঠিক লোক যেই হোক, তিনি যদি দুর্নীতিতে জড়ান, অব্যবস্থাপনা করেন, তার বিরুদ্ধে লিখবেন। সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত যদি তাদের প্রোফাইল দেখেন, তারা মানুষের জন্য কাজ করা ব্যক্তি, এলাকায় মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে, বিভিন্ন সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে, অনেকের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও আছে। সেগুলো মিলিয়ে তারা কাজ করবেন, প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে এগিয়ে নেবে, সহযোগিতা করবে।

Most Popular