Sunday, August 16, 2026
Homeবাংলাদেশনৌকায় খাবার-পানির অভাবে ভূমধ্যসাগরে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু

নৌকায় খাবার-পানির অভাবে ভূমধ্যসাগরে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু

খাবার ও পানি ছাড়া ভূমধ্যসাগরে প্রায় ১১ দিন ভেসে থাকার পর গ্রিসগামী একটি নৌকায় অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি বলে জানিয়েছেন বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশি।

মিশরে চিকিৎসাধীন ওই বাংলাদেশির বরাতে কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, দূতাবাসের কর্মকর্তারা স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে তারা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বেঁচে যাওয়া সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আবদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

দূতাবাসকে দেওয়া করিমের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট ৪২ জন যাত্রী লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হন। পরে ভূমধ্যসাগরে নৌকাটি ভেঙে যায় এবং এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এরপর প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট তারা মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছান।

জাকির হোসেন বলেন, স্থানীয় লোকজন নৌকাটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে প্রায় ২৯-৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের অনেকেই অচেতন ছিলেন। তাদের দুটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে।

‘তারা পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন,’ বলেন জাকির হোসেন।

বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে দূতাবাস অনুমতি চেয়েছে। এই সুযোগ পাওয়া গেলে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানান তিনি।

যাত্রীদের মৃত্যুর বিষয়ে জাকির হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ওই বাংলাদেশি যাত্রী দূতাবাসকে জানিয়েছেন যে, খাবার ও পানির অভাব এবং প্রচণ্ড গরমে তারা ১০ সহযাত্রী মারা যান। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়।’

তবে তিনি বলেন, ‘মিশরের পুলিশ দূতাবাসকে জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগরে কোনো মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করার মতো তথ্য তাদের কাছে নেই।’

ফার্স্ট সেক্রেটারি জাকির হোসেন জানান, ওই যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবদুল করিমের একটি ভিডিও ইতোমধ্যে ছড়িয়ে গেছে। ভিডিওতে তিনি বলেন, ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করার পর কাছাকাছি গিয়ে নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তারা আর এগোতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘নৌকায় কোনো খাবার বা পানি ছিল না। নয় বাংলাদেশি তাদের চোখের সামনে মারা যান। পরে আরও দুজন মারা যান। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয় বলেও জানান করিম।’

দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার পর বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথাও জানান তিনি।

‘দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পচতে শুরু করেছে এবং দুর্গন্ধ বের হচ্ছে,’ বলেন করিম।

ভিডিওতে করিম আরও বলেন, রাবারের নৌকাটিতে সর্বোচ্চ ২৫ যাত্রী বহনের সক্ষমতা ছিল। কিন্তু এতে ৪২ জনকে তোলা হয়। নৌকাটিতে ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাতে ব্র্যাকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৩ হাজার ৬০৮ বাংলাদেশি এই পথে গ্রিসে পৌঁছেছেন। তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছে সুদান ও আফগানিস্তান।

এর আগে, মার্চেও লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি নৌকায় অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ১২ জন ছিলেন সুনামগঞ্জের।

ব্র্যাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১ মার্চ লিবিয়ার তব্রুক থেকে নৌকাটি যাত্রা করে। পরে সেটি পথ হারিয়ে খাবার ও পানি ছাড়া ছয় দিন সাগরে ভেসে ছিল।

পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে যাওয়ার এই পথটি ‘সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট’ নামে পরিচিত।

ব্র্যাকের উদ্ধৃত ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।

ব্র্যাক জানায়, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪ হাজার ২৪৯ জন ইতালিতে এবং ৩ হাজার ৬০৮ জন লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কয়েক বছর ধরে ইতালির উদ্দেশে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি। এখন গ্রিসের উদ্দেশে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যেও বাংলাদেশিরা শীর্ষে।

তিনি বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান এবং দারিদ্র্যপীড়িত সুদানের চেয়েও বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেশি হওয়া দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।

‘এসব ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে,’ বলেন শরিফুল।

তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার ছাড়া এই মানবপাচার বন্ধ করা কঠিন।

এদিকে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, শান্তিগঞ্জের অন্তত পাঁচ যুবকের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা হলেন পাগলা শত্রুমর্দান গ্রামের হৃদয় পাল, চিকরকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খান এবং রানসি গ্রামের মো. তালহা।

হৃদয়ের চাচা কানন পাল বলেন, ৩১ জুলাই তিনি সর্বশেষ হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলেন। তখন হৃদয় জানিয়েছিলেন, ৩ আগস্ট তিনি গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করবেন।

কানন বলেন, ওই দিন দুটি নৌকা ছেড়ে যায়। পরে প্রথম নৌকার একজন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, হৃদয় দ্বিতীয় নৌকায় ছিলেন। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তার কোনো খোঁজ পাননি।

করিমের পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। যোগাযোগ করা আরও দুটি পরিবারও কথা বলতে রাজি হয়নি।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, প্রভাবশালী দালালরা পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করেছেন যে তাদের সন্তানরা বেঁচে আছেন। একইসঙ্গে তারা পরিবারগুলোকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার পরামর্শ দিয়েছেন।

(এই প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টারের সিলেট প্রতিনিধি তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন।)

Most Popular