Sunday, August 16, 2026
Homeবাংলাদেশবুদ্ধিমান মানুষদের মধ্যে যে অভ্যাসটি সাধারণ, মিলিয়ে নিন নিজের সঙ্গে

বুদ্ধিমান মানুষদের মধ্যে যে অভ্যাসটি সাধারণ, মিলিয়ে নিন নিজের সঙ্গে

আমরা সাধারণত বুদ্ধিমান মানুষ বলতে এমন কাউকে বুঝি, যিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন কিংবা কোনো বিষয়ে খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন।

কিন্তু মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, বুদ্ধিমত্তার আরও একটি চিহ্ন আছে। সেটি হলো, নিজের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা মেনে নেওয়া ও নতুন তথ্য সামনে এলে নিজের অবস্থান বদলানো। অর্থাৎ, সত্যিকারের বুদ্ধিমান মানুষ কেবল নিজের মতের পক্ষে যুক্তি খোঁজেন না। বরং এমন তথ্যও খোঁজেন, যা তার নিজের বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করতে পারে।

মনোবিজ্ঞানে এই অভ্যাসকে বলা হয় অ্যাক্টিভলি ওপেন-মাইন্ডেড থিংকিং (এওএমটি), সহজ বাংলায় বলা যায়, খোলা মনে চিন্তা করার অভ্যাস।

১৯৯৭ সালে মনোবিজ্ঞানী কিথ স্টানোভিচ ও রিচার্ড ওয়েস্ট এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। ৩৪৯ জন কলেজ শিক্ষার্থীকে নিয়ে করা ওই গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ কোনো যুক্তি বিচার করার সময় নিজের আগে থেকে থাকা বিশ্বাসের প্রভাব থেকে কতটা বেরিয়ে আসতে পারে এবং তার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও খোলা মনে চিন্তা করার প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছিল জার্নাল অব এডুকেশনাল সাইকোলজিতে।

এই ধারণা নিয়ে পরবর্তীতে আরও গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালের একটি বিস্তৃত পর্যালোচনায় স্টানোভিচ ও ম্যাগি টপলাক দেখিয়েছেন, এওএমটি কীভাবে পরিমাপ করা যায় এবং যুক্তি ও চিন্তার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব কী।

সহজ করে বললে, এর অর্থ হলো, ‘আমি ভুল জানতে পারি।’

ধরা যাক, আপনি কোনো একটি বিষয়ে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। আপনার কাছে সেই বিশ্বাসের পক্ষে বেশ কিছু যুক্তিও আছে। সাধারণত তখন আমরা কী করি? নিজের বিশ্বাসের পক্ষে তথ্য খুঁজি। বিপরীত মত দেখলে সেটিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করি। এমনকি কখনো কখনো তথ্যের চেয়ে নিজের মতটাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

কিন্তু খোলা মনে চিন্তা করা মানুষটি অন্যভাবে ভাবেন। তিনি ভাবে, ‘আমার ধারণা ভুলও হতে পারে।’

এই ছোট্ট পরিবর্তনটাই চিন্তার ধরনকে অনেকটাই বদলে দেয়। ফলি তিনি অন্য মানুষের মতামত শোনেন। নিজের মতের বিপরীত তথ্য খোঁজেন। কোনো বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন না। আর নতুন তথ্য তার ধারণার সঙ্গে না মিললে নিজের অবস্থান বদলান।

আমাদের সমাজে অনেকে মনে করেন, যে ব্যক্তি নিজের কথা বারবার বদলায়, সে হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বা দুর্বল! কিন্তু বাস্তবে সব সময় এমনটা নাও হতে পারে। কখনো কখনো নিজের মত পরিবর্তন করা মানে বিষয়টি নিয়ে ভাবা ও পর্যালোচনা করা।

কারণ একজন মানুষ যখন নতুন তথ্য পাওয়ার পর নিজের অবস্থান বদলান, তখন বোঝা যায় তিনি নিজের আগের সিদ্ধান্তকে আঁকড়ে ধরে বসে নেই। বরং তিনি নতুন তথ্যকে পুরোনো বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।

অন্যদিকে, কেউ যদি ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও কেবল নিজের বিশ্বাস নিয়ে তর্ক করেন, তাহলে সেটিকে আত্মবিশ্বাস বলা ঠিক হবে না। তাই বুদ্ধিমান মানুষরা সব সময় বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই, আরও তথ্য দরকার, এ বিষয়ে আমি ভুল জানতাম কিংবা আমি হয়তো ভুল ছিলাম।’

মনোবিজ্ঞান বলছে, এসব বাক্য দুর্বলতা নয়, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো পরিণত চিন্তার পরিচয়।

এই বিষয়টির সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ জড়িত বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল। অর্থাৎ, কোনো বিষয়ে কেবল প্রয়োজনের জন্য নয়, জানার আনন্দ থেকেও জানতে চাওয়া।

রিসার্চগেট বলছে, মানুষের নতুন ধারণা ও অভিজ্ঞতার প্রতি আগ্রহের পেছনে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। নতুন কিছু জানতে আগ্রহী হওয়া মানেই সবকিছুকে সত্য বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো, নতুন তথ্য আগে শুনব, তারপর যাচাই করব। ভালো লাগলেই সত্য ধরে নেব না। আবার নিজের পুরোনো বিশ্বাসের সঙ্গে মিলছে না বলে সরাসরি বাতিলও করব না।

মনোবিজ্ঞানে নিড ফর কগনিশন নামে একটি ধারণা আছে। এর সহজ অর্থ হলো, কেউ জটিল ও পরিশ্রমসাধ্য চিন্তা করতে কতটা আগ্রহী এবং মানসিকভাবে সেই কাজটি কতটা উপভোগ করেন।

যাদের এই প্রবণতা বেশি, তারা কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার বদলে তা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন। কোনো যুক্তি তাদের আগের ধারণার বিরুদ্ধে গেলেও সেটি নিয়ে চিন্তা করতে আগ্রহ দেখান।

২০২৪ সালের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় জার্মানির ৩৪১ জন শিক্ষার্থীকে এক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, নিড ফর কগনিশন ও ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্স একে অপরের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্স হলো নতুন ও অপরিচিত সমস্যা সমাধানের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা। একটির পরিবর্তন অন্যটির পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক দেখিয়েছে।
জার্নাল অব ইন্টেলিজেন্সে এই গবেষণাটি প্রকাশ করেছিল।

জার্নাল অব ইন্টেলিজেন্সের তথ্য মতে, তবে এর মানে এই নয় যে, বেশি কৌতূহলী হলেই কেউ বেশি বুদ্ধিমান হয়ে যাবেন। গবেষণাটি মূলত দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যের পারস্পরিক সম্পর্ক দেখানো হয়।

এই জায়গায় আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইন্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটি বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয়। এর অর্থ নিজেকে ছোট ভাবা নয়। বরং নিজের জ্ঞান ও সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা।

২০১৯ সালে পারসোনালিটি অ্যান্ড ইনডিভিজুয়াল ডিফারেন্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তার নমনীয়তা (কগনিটিভ ফ্লেক্সিবিলিটি) দুটিই বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে অন্যের মতামতকে সম্মান করা এবং নতুন তথ্য পাওয়ার পর নিজের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক স্পষ্ট ছিল।

অর্থাৎ, বুদ্ধিমান মানুষ হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, ‘আমি অনেক জানি, কিন্তু সবকিছু জানি না।’

আর এই চিন্তায় মানুষকে শেখার সুযোগ দেয় বলে জানা গেছে মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায়।

খোলা মনে চিন্তা করা মানুষ সাধারণত শুধু নিজের মতো মানুষের সঙ্গে কথা বলেন না। তারা ভিন্ন পেশার মানুষ, ভিন্ন অভিজ্ঞতার মানুষ কিংবা ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হন। এর উদ্দেশ্য সব সময় তর্কে জেতা নয়। বরং তারা জানতে চান, তার জানার ঘাটতি কোথায়।

কারণ আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু ব্লাইন্ড স্পট বা বা অদেখা জায়গা থাকে। কেউ কোনো বিষয়ে যতই জ্ঞানী হোক না কেন, হয়তো ওই বিষয়ে অভিজ্ঞতা সীমিত। অভিজ্ঞ কেউ হয়তো একই বিষয়ের কিছু জানেন, যা জ্ঞানী লোকটার চোখে পড়েনি।

তাই ভিন্নমত শোনা মানেই নিজের বিশ্বাস অস্বীকার করা না। বরং নিজের চিন্তাকে আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এ ধরনের চিন্তা কেবল জন্মগত কোনো ক্ষমতা নয়। এর অনেকটাই অভ্যাসের মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব। চাইলে প্রতিদিনের চিন্তার ধরনে কিছু ছোট পরিবর্তন আনা যেতে পারে। এজন্য কেউ আপনার সঙ্গে দ্বিমত করলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেওয়ার বদলে আগে বোঝার চেষ্টা করুন, সে কেন এমন ভাবছে।

Most Popular