Thursday, July 16, 2026
Homeপ্রযুক্তি‘শুধু ডিজিটাল প্রবেশাধিকার নয়, গড়ে তুলতে হবে এআই সক্ষমতা’

‘শুধু ডিজিটাল প্রবেশাধিকার নয়, গড়ে তুলতে হবে এআই সক্ষমতা’

দেশে এআই সক্ষমতা গড়ে তুলতে কেবল ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ নয়, বরং মানুষ, দক্ষতা ও উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে জাতীয় এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এআই সক্ষমতা তৈরি এখন সময়ের দাবি।

বুধবার দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে গ্রামীণফোন ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘ফিউচার-রেডি বাংলাদেশ: এআই, স্কিলস অ্যান্ড ইয়ুথ এমপ্লয়্যাবিলিটি ইন দ্য ডিজিটাল ইকোনমি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ আহ্বান জানান বক্তারা।

তারা বলেন, এআই যুগে বাংলাদেশের সাফল্য প্রযুক্তি গ্রহণের চেয়ে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সমন্বিত জাতীয় নীতি প্রণয়নের ওপর বেশি নির্ভর করবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমআইটির গবেষণা সহযোগী এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জুলকারিন জাহাঙ্গীর।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে এআই এখন মূলধারায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ৭৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করছে এবং প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান এআই এজেন্টের মাধ্যমে তাদের কাজের পুরো ধারা স্বয়ংক্রিয় করে ফেলেছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন এখন এটা নয় যে বাংলাদেশ এআই গ্রহণ করবে কিনা, বরং প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ অন্যদের চেয়ে দ্রুত এআই সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে কিনা।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এআই যুগে এসে শুধুমাত্র ডিজিটাল প্রস্তুতি দেশকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারবে না।’

দেশে এখন ডিজিটাল প্রবেশাধিকারকে এআই সক্ষমতায় রূপান্তর করতে হবে বলে জানান তিনি।

ইউনেস্কোর এআই রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট, স্ট্যানফোর্ড এআই ইনডেক্স এবং অন্যান্য বৈশ্বিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে জুলকারিন জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এখন দেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত মানুষের ওপর।’

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষাব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন। প্রাতিষ্ঠানিক কাজে এআই ব্যবহারে নীতিমালা, এআই-সহায়ক একাডেমিক কাজের ক্ষেত্রে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও বিষয়ভিত্তিক এআই শিক্ষা বা দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেন তিনি।

পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান জুলকারিন জাহাঙ্গীর। বলেন, ‘এআই শেখার গতি বাড়াবে, কিন্তু কখনোই শেখার বিকল্প হতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশি প্রযুক্তির কেবল ভোক্তা হয়ে থাকলে চলবে না। বাংলা ভাষার ডেটাসেট, এআইভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং, মডেল মূল্যায়ন, ডেটা অ্যানোটেশন ও প্রয়োগভিত্তিক এআই গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিজস্ব এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।’

এ লক্ষ্যে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে একটি ‘জাতীয় এআই স্কিলস কমপ্যাক্ট’ বা ‘জাতীয় এআই দক্ষতা উদ্যোগ’ গঠনের প্রস্তাব দেন এই গবেষক।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদি আমিন বলেন, ‘সরকার একটি জাতীয় এআই নীতি প্রণয়নের কাজ করছে। এর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, নীতিনির্ধারণ, প্রকল্প পর্যবেক্ষণ ও জনসেবা প্রদানের মতো সরকারি কার্যক্রমে এআই সংযুক্ত করে সেবার মানসহ সামগ্রিক ব্যবস্থা উন্নত করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রকল্পের তদারকি ও পর্যবেক্ষণকে আরও কার্যকর করতে পারে এআই এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কমাতে সহায়তা করবে।’

সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়, আর এআই এ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানান তিনি।

মাহদি আমিন আরও বলেন, ‘সরকার নিজেকে নীতিগত সহায়ক হিসেবে দেখছে, যেখানে শক্তিশালী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দেবে বেসরকারি খাত।’

দেশে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মাহদি আমিন জানান, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ধাপে ধাপে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, স্কুলগুলোতে কারিগরি ল্যাব (টিভিইটি) স্থাপন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, ‘দেশে উচ্চশিক্ষা খাত এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা দ্বিধার সম্মুখীন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও।’

এর কারণ হিসেবে শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাবকে দায়ী করে তিনি জানান, শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, শিক্ষক ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সহযোগিতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ইউজিসি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ করছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এএসএম আমানউল্লাহ বলেন, ‘এআই যুগের জন্য প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রস্তুত করতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন 
প্রয়োজন।’

ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং পাঠ্যক্রমে মৌলিক পরিবর্তন অপরিহার্য, যোগ করেন তিনি।

গ্রামীণফোনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা অটো ম্যাগনে রিসবাক আজকের তরুণদের ‘ডিজিটাল নেটিভ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তারা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বদলে দিতে সক্ষম।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুতগতির এআই উদ্ভাবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগও জরুরি।

গ্রামীণফোনের এনভায়রনমেন্ট, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (ইএসজি) বিভাগের প্রধান ফারহানা ইসলাম বলেন, ‘দেশে প্রতি বছর ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও স্নাতক বেকারত্বের হার ২৮ শতাংশ রয়ে গেছে। ফলে দক্ষতার ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে।’

এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, অক্সফোর্ড ইনসাইটস গভর্নমেন্ট এআই রেডিনেস ইনডেক্সে ১৯৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ এআই ব্যবহার করছে মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনের জন্য, কর্মজীবনে উন্নয়নের জন্য নয়। অথচ বিশ্বজুড়ে দুই-তৃতীয়াংশ নিয়োগদাতা এখন এআই দক্ষতাসম্পন্ন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

তরুণদের এই ঘাটতি পূরণে গ্রামীণফোন একাডেমির ভূমিকার কথা তুলে ধরে ফারহানা ইসলাম জানান, গ্রামীণফোন একাডেমি এ পর্যন্ত ৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি তরুণকে প্রশিক্ষণের আওতায় এনেছে এবং ১ লাখ ৩১ হাজারের বেশি তরুণকে সনদ প্রদান করেছে।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘এআই যুগে দক্ষতাই নির্ধারণ করবে একটি দেশ নির্ভরশীল হবে নাকি উৎপাদনশীল হবে। আমরা যদি দক্ষ না হই, তাহলে ভিক্ষুকের মতো অন্যের ওপর নির্ভর করতে হবে। আর দক্ষ হলে দেশের জন্য উৎপাদন করতে পারব।’

মাহফুজ আনাম আরও বলেন, ‘তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে বড় পরিসরে বিনিয়োগ না করলে এআইয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক সাধারণ ও রুটিনধর্মী চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে।’ এর ফলে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

শিখোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহির চৌধুরী বলেন, ‘মেশিন লার্নিং ও ডেটা সায়েন্সের মতো প্রযুক্তিগত এআই দক্ষতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আরও বড় সুযোগ হলো লাখো মানুষকে কার্যকরভাবে এআই ব্যবহার করতে সক্ষম করা। তাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে শুধু আজকের চাকরির জন্য নয়, আগামী দিনের সম্ভাবনার জন্যও মানুষকে প্রস্তুত করতে হবে।’

গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মারুফ আজম, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি মুনির হাসান, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ এবং তরুণ প্রতিনিধি মো. আমান উল্লাহ আমান ও মারিয়া নাওয়ার।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দ্য ডেইলি স্টারের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপস বিভাগের প্রধান তানজিম ফেরদৌস।

Most Popular