Thursday, July 9, 2026
Homeবাংলাদেশযেভাবে দালালের খপ্পরে পড়ে যুদ্ধে জড়িয়ে ইউক্রেনের কারাগারে ২ বাংলাদেশি

যেভাবে দালালের খপ্পরে পড়ে যুদ্ধে জড়িয়ে ইউক্রেনের কারাগারে ২ বাংলাদেশি

গত বছরের জুলাইয়ে রাশিয়ার একটি কোম্পানিতে কাজ পেয়ে দেশ ছাড়েন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের লাউর গ্রামের কামরুল। দেশে রেখে গিয়েছিলেন স্ত্রী নাজমিন আক্তারকে।

জীবিকার তাগিদেই বিদেশযাত্রা করেছিলেন কামরুল হাসান (৪০), কোনোভাবেই যুদ্ধ করতে নয়।

বছরের শেষদিকে ওই কোম্পানির প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর, কামরুল ইতালিতে যাওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করেন।

কামরুলের মতো সুমন শাহরিয়ারও এজন্য একজন দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

একটি ভিডিওতে তারা দুজন জানান, সেসময় ‘উদবেঘ গেমার’ নামে এক দালাল তাদের রাশিয়া থেকে বেলারুশ, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া বা পোল্যান্ড ও জার্মানি হয়ে ইতালি নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যকের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেবে বলে জানায় ওই দালাল। কথা ছিল রওনা হওয়ার আগে অর্ধেক আর বাকি অর্ধেক ইতালি পৌঁছানোর পর দিতে হবে।

‘প্রতারণার শিকার হয়ে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ায়’ তাদের আর ইতালি পৌঁছানো হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কামরুল ও সুমন অভিযোগ করে বলেন, দালাল তাদের দুজনের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে নেয়। কিন্তু ইতালি না পাঠিয়ে তাদের দিয়ে রুশ সামরিক বাহিনীর এমন কিছু কাগজে সই করিয়ে নেয়, যেটা তারা বুঝতে পারেননি।

পরে তাদের তুলা এলাকার একটি সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে ৩৫ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং ইউক্রেন সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সেখানে একটি সামরিক অভিযান থেকে পালিয়ে গেলে ইউক্রেনীয় সেনারা তাদের আটক করে।

ভিডিওতে কামরুল বলেন, ‘আমরা রাশিয়ায় এসেছিলাম কাজের জন্য। আমরা যুদ্ধে যোগ দিতে আসিনি।’

ইউক্রেন থেকে দেশে ফিরিয়ে নিতে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন জানান।

এই দুজন বর্তমানে ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি আছেন। সেন্টারটিকে তারা যুদ্ধবন্দিদের জন্য কারাগার হিসেবে উল্লেখ করেছেন ভিডিওতে।

দ্য ডেইলি স্টার অবশ্য তাদের এই অবস্থার সব তথ্য যাচাই করতে পারেনি। এর মধ্যে দালালের নামের সঠিক বানান এবং ভিডিওতে উল্লেখ করা তারিখগুলোর ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এছাড়া তাদের ভিডিওগুলো কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলো তাও স্পষ্ট নয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কামরুলের বাড়িতে গেলেও তার পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তবে, তার অতীত ও রাশিয়ায় কাজের বিষয়ে তথ্য প্রতিবেশী ও অন্যান্য স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা গেছে। কামরুলের পরিবারের কাছ থেকে স্থানীয় প্রতিবেশীরা এসব তথ্য জেনেছিলেন।

প্রতিবেশীরা জানান, কামরুল রাশিয়ায় যাওয়ার আগে দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে ছিলেন। সেখান থেকে ইউরোপে যাওয়ার আশায় তিনি রাশিয়ায় যান।

কামরুলের ভিডিও বক্তব্য অনুযায়ী, এ বছরের মার্চে মস্কোতে তাদের সঙ্গে ওই দালালের পরিচয় হয়। দালাল জানায়, তার অফিস তুলা এলাকায় এবং ইতালি যাওয়ার কাগজপত্রে সই করার জন্য তাদের সেখানে যেতে হবে।

কিন্তু মস্কো থেকে তুলাতে নেওয়ার পর তাদের একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজপত্র দেখানো হয়।

ভিডিওতে কামরুল বলেন, কাগজগুলো রুশ ভাষায় থাকায় আমরা সই করতে রাজি হইনি।

তবে, কাগজপত্র দেখানোর আগেই দালাল তাদের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে নিয়েছিল বলে জানান তিনি।

তাদের প্রায় এক ঘণ্টা ওই রুমে আটকে রাখা হয়। পরে রুশ সেনা সদস্যরা এসে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

সুমনও তার ভিডিও জবানবন্দিতে একই বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, কোম্পানির প্রজেক্টের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা রাশিয়ায় কাজ করেছিলেন। এরপর তারা দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের বিশ্বাস ছিল যে ওই দালাল তাদের ইতালি পাঠাবে।

সুমন বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকে ৫ লাখ টাকা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ইতালির চুক্তি করার পরিবর্তে সে আমাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে কাজের চুক্তিতে সই করিয়ে নেয়।’

তারা দুজনেই জানান, তাদের তুলায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে একটি ক্যাম্পে তারা ৩ দিন থাকেন। এরপর তারা ৩৫ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ নেন এবং ইউক্রেনের দিকে পাঠানোর আগে তাদের ৭ দিনের বিশ্রাম দেওয়া হয়।

ভিডিওতে কামরুল বলেন, গত ১১ মার্চের দিকে তারা অভিযানের জন্য একটি জায়গায় পৌঁছান। সেখানে খাবারের তীব্র সংকট ছিল। চার দিনে তাদের মাত্র দুবার ১০০ মিলিগ্রাম করে পানি এবং একটি ৩০০ গ্রামের গরুর মাংসের টিন দেওয়া হয়েছিল।

১২ মার্চ রাতে তাদের কমান্ডার জানান, পরদিন ভোর ৬টায় তাদের একটি অভিযান আছে। তারা সেই অভিযানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

কামরুল বলেন, ‘রাত প্রায় ৩টার দিকে আমরা সেনাবাহিনীর পোশাক, হেলমেট ও বন্দুক ফেলে রেখে ওই জায়গা থেকে পালিয়ে যাই।’

ইউক্রেনের দিকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার হেঁটে যাওয়ার পর ২ ইউক্রেনীয় সেনা তাদের আটক করে।

সুমন জানান, তারা খুবই বিপদের মধ্যে ছিলেন এবং ঠিকমতো খাবার না পাওয়ায় পালিয়ে যান।

‘আমরা অভিযানে যাইনি। সবকিছু ফেলে আমরা ইউক্রেনের দিকে চলে যাই। রাস্তায় ইউক্রেনের সেনারা আমাদের ধরে ফেলে এবং কারাগারে নিয়ে যায়,’ বলেন তিনি।

পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস ইউক্রেন সংক্রান্ত বিষয়গুলোও দেখভাল করেন। ওই দূতাবাসের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ইউক্রেনে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের বিষয়ে তারা অবগত এবং ভুক্তভোগীদের স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করছি এবং ভুক্তভোগীদের উদ্ধারের চেষ্টা করছি।’

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১০৪ বাংলাদেশি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন এবং ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

এর আগে, ব্যাংকক-ভিত্তিক ‘ফরটিফাই রাইটস’ এবং ইউক্রেন-ভিত্তিক ‘ট্রুথ হাউন্ডস’-এর যৌথ প্রতিবেদনের বরাতে ডেইলি স্টার এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেককেই ক্লিনার, ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার, ইলেকট্রিশিয়ান বা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা দালালদের ১ থেকে ৫ হাজার ডলার বা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছিলেন।

পরে তারা রুশ ভাষায় লেখা কিছু চুক্তিপত্রে সই করেন। ভাষা না জানায় তারা সেগুলো পড়তেও পারেননি। পরে তাদের প্রথমে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা থেকে সম্মুখ সমরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কয়েকজন জীবিত ফিরে এলেও তারা জানিয়েছে, তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, মারধর, বেতন না দেওয়া এবং চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান ডেইলি স্টারকে বলেন, অনেক কর্মীকে কোম্পানি বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না পেয়ে অনেকে ঝুঁকিতে পড়েন।

তিনি বলেন, ‘তারা যখন কাজ পায় না, তখন প্রায় ক্ষেত্রে ২-৩ দিনের মধ্যে অন্য কাজের ব্যবস্থার নামে চুক্তিতে সই করতে বলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের চুক্তি ব্যবহার করে শ্রমিকদের যুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’

Most Popular