Monday, July 27, 2026
Homeঅর্থনীতিবৃষ্টি-বন্যায় ৪৭৮ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি

বৃষ্টি-বন্যায় ৪৭৮ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি

এই মৌসুমে ৫ দশমিক ২৬ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের পরিকল্পনা ছিল পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কৃষক হানিফ চৌকিদারের। চার মণ বীজের পেছনে প্রায় ২২ হাজার টাকা খরচ করে তিনি একটি বীজতলা প্রস্তুত করেছিলেন।

কিন্তু টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বীজতলাটি প্রায় এক সপ্তাহ পানির নিচে তলিয়ে থাকায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।

হানিফ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, মৌসুমের শুরুতেই এমন বড় ক্ষতির মুখে পড়বো তা কখনো ভাবিনি। এখন সব জমিতে কীভাবে আমন ধান লাগাব তা নিয়ে চিন্তায় আছি। মনে হচ্ছে কিছু জমি অনাবাদিই রেখে দিতে হবে।

তিনি আরও জানান, নতুন করে বীজতলা তৈরি করা মানে বাড়তি খরচের বোঝা।

রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার কৃষক জগৎময় চাকমা দুই বিঘা (০ দশমিক ২৬৮ হেক্টর) জমিতে ৮৭২টি পেঁপে গাছ রোপণ করতে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। বাগানটি টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে তিনি প্রায় ২৩ হাজার কেজি পেঁপে ফলনের আশা করেছিলেন।

তিনি বলেন, যদিও পানি নেমে গেছে, কিন্তু গাছগুলো মরে যাচ্ছে এবং ফল ঝরে পড়ছে। তার মতে, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮-৯ লাখ টাকা।

হানিফ ও জগৎ ময়ের মতো সারা দেশের ৪৩টি জেলার ২ লাখ ৪৩ হাজারেরও বেশি কৃষক গত ৭ থেকে ১৯ জুলাইয়ের ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, বরিশাল, খুলনা, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, মাগুরা, পটুয়াখালী, শরীয়তপুর ও সিলেট।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার টন ফসল নষ্ট হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৭৮ কোটি টাকা। মোট ৮ লাখ ১৭ হাজার হেক্টর চাষাবাদকৃত জমির মধ্যে ২৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমি (প্রায় ৩ শতাংশ) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের তালিকায় রয়েছে আউশ ধান, আমন বীজতলা, শাকসবজি, আদা, মরিচ, হলুদ, পেঁপে, তরমুজ, চীনাবাদাম, পাট, কলা, আখ, খরমুজ, ভুট্টা ও পান। মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির মধ্যে ১২ হাজার ৭৮৩ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছিল আউশ ধান। ১ হাজার ৭৪৬ হেক্টর আমন বীজতলা এবং প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির শাকসবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম জানান, জেলার প্রায় ২ লাখ আমন চাষির মধ্যে ২৩ হাজার কৃষক নিয়মিত সরকারি প্রণোদনার অংশ হিসেবে এরইমধ্যে ৫ কেজি বীজ এবং ৫ কেজি এমওপি সার পেয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির পর জেলায় এখনো কোনো অতিরিক্ত সহায়তা এসে পৌঁছায়নি।

তিনি বলেন, আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি এবং সহায়তা পাওয়া মাত্রই তা বিতরণ করা হবে।

রাঙ্গামাটির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানান, বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। জেলায় প্রায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১১ হাজার কৃষক।

তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুতই সহায়তা দেওয়া হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল জানান, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলার কৃষকদের জন্য সরকার পুনর্বাসন সহায়তা অনুমোদন করেছে।

জেলাগুলো হলো—ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি। তিনি বলেন, আউশ ধান ও রোপা আমনের বীজতলা হারানোর পর ওই জেলাগুলোর প্রায় ৬৩ হাজার কৃষককে ইতোমধ্যে নাবি জাতের (দেরিতে রোপণযোগ্য) আমন বীজ সরবরাহ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাকি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের শীতকালীন ফসল রোপণ মৌসুমের আগেই সহায়তা দেওয়া হবে। 
বন্যা-বৃষ্টিতে ৪৩টি জেলায় ক্ষতির খবর পাওয়া সত্ত্বেও কেন মাত্র ৭টি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল ইসলাম বলেন, সরকার ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ জেলা ও ‘মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ জেলার মধ্যে পার্থক্য করে থাকে।

তিনি বলেন, এই ৭টি জেলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে কারণ সেখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। এর মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

গত ১১ জুলাই এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছিলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুনির্দিষ্টভাবে পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার তালিকা প্রস্তুত করছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, এই ক্ষয়ক্ষতি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হওয়ার মতো কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করার মতো বড় কিছু নয়। তিনি বলেন, প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো বাজারের কারসাজি।

অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে তিনি কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঘরবাড়ি মেরামত, হাঁস-মুরগির খামার পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মাছের পুকুর সংস্কারের জন্য নগদ অর্থ সহায়তার সুপারিশ করেন তিনি।

তিনি আরও যোগ করেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় এবং আপাতত নতুন কোনো বন্যার শঙ্কা না থাকায় কৃষকরা এখন নতুন বীজতলা তৈরি, আমন চারা রোপণ এবং শীতকালীন শাকসবজি চাষ শুরু করতে পারবেন।

[প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা রিকোর্স চাকমা]

Most Popular