বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী—আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ফাইনালে ওঠার এই লড়াইয়ে নামবে তারা। যে জিতবে, ফাইনালে তার জন্য অপেক্ষা করছে স্পেন।
ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। মাঠের লড়াই তো আছেই, সঙ্গে যোগ হয় দুই দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন। সব মিলিয়ে এই দ্বৈরথকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে এখন টানটান উত্তেজনা।
পরিসংখ্যান ও ইতিহাসের পাতায় দুই দল
কাগজে-কলমে মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসে কিন্তু ইংল্যান্ড অনেকটা এগিয়ে। দুই দলের ১৪বারের দেখায় ইংলিশরা জিতেছে ৬টিতে, ড্র হয়েছে ৬টি। আর আর্জেন্টিনা জিতেছে মাত্র ২টিতে। তবে এই ড্রয়ের একটি ছিল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে, যেখানে টাইব্রেকারে শেষ হাসি হেসেছিল আলবিসেলেস্তেরা।
রেকর্ডগড়া যুগলবন্দি: ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম—দুজনেই চলতি বিশ্বকাপে ৬টি করে গোল করেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম একই দেশের দুই ফুটবলার একই আসরে ৬ বা তার বেশি গোল করার কীর্তি গড়লেন।
আর্জেন্টিনার গোলবন্যা: এবারের আসরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৭টি গোল করেছে আর্জেন্টিনা। আর মাত্র একটি গোল করলেই তারা ছুঁয়ে ফেলবে নিজেদের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। এর মাঝে একাই ৮টি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন লিওনেল মেসি।
ইতিহাসের সেই ‘হ্যান্ড অব গড’: দুই দলের লড়াই বললেই মনে পড়ে যায় ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেই কোয়ার্টার ফাইনাল। দিয়াগো ম্যারাডোনার সেই কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোল ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ দিয়ে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা।
স্কালোনির সামনে অনন্য কীর্তি: আর্জেন্টিনার ডাগআউটে লিওনেল স্কালোনি গড়তে পারেন নতুন ইতিহাস। মাত্র সপ্তম কোচ হিসেবে কোনো দলকে দুটি বিশ্বকাপ ফাইনালে তোলার কীর্তি গড়ার অপেক্ষায় তিনি। আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে কার্লোস বিলার্দোর (১৯৮৬ ও ১৯৯০) পর তিনিই হবেন দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব, যিনি এই গৌরবের অংশীদার হতে যাচ্ছেন।
ইংলিশদের স্বপ্নসারথি টুখেল: দীর্ঘ ৬০ বছরের ট্রফি খরা কাটানোর মিশনে নামা ইংল্যান্ডের ডাগআউটে আছেন টমাস টুখেল। নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার কীর্তি আছে মাত্র তিনজনের। টুখেল ফাইনালে উঠলে হবেন চতুর্থ এবং ১৯৭৮ সালে নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে নেওয়া আর্নস্ট হ্যাপেলের পর প্রথম।
কেইনের রেকর্ড মাইলফলক: সেমিফাইনালে মাঠে নামলেই ইংল্যান্ডের জার্সিতে ১২১তম ম্যাচ খেলবেন হ্যারি কেইন। মাঠের খেলোয়াড় (আউটফিল্ডার) হিসেবে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড। কেইনের সামনে আছেন কেবল সাবেক গোলরক্ষক পিটার শিলটন (১২৫ ম্যাচ)।
দুই কোচের ভাবনা
ম্যাচটিকে নিছক মাঠের লড়াই হিসেবেই দেখতে চান আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি। মাঠের বাইরের রাজনৈতিক উত্তেজনাকে দূরে রেখে তার সরল মন্তব্য, ‘এটি কেবলই একটি ফুটবল ম্যাচ এবং আমরা এক কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মাঠে নামছি। তাদের একজন চমৎকার কোচ আছেন। মাঠের বাইরে আর কোনো সমীকরণ নেই, দিনশেষে এটি স্রেফ একটি ফুটবল খেলা।’
অন্যদিকে, এই রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো দারুণ উপভোগ করছেন ইংল্যান্ডের ডার্লিং টমাস টুখেল। ম্যাচের আগে তার কণ্ঠে ঝরে পড়ল রোমাঞ্চ, ‘লড়াইটা বেশ তীব্র। আমি দারুণ উপভোগ করছি। এই মুহূর্তগুলো আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। আমি ঠিক এই জায়গাতেই থাকতে চেয়েছিলাম। এই মুহূর্তে পৃথিবীর আর কোনো প্রান্তে থাকার কথা আমি ভাবতেই পারি না।’
সেমিফাইনালে আসার পথ
দুই পরাশক্তিই বেশ দাপটের সঙ্গে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে সেমিফাইনালের মঞ্চে পা রেখেছে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক তাদের শেষ চারে ওঠার যাত্রা:
আর্জেন্টিনার পথচলা
গ্রুপ পর্ব: আলজেরিয়া (৩-০), অস্ট্রিয়া (২-০) ও জর্ডান (৩-১)
রাউন্ড অব ৩২: কেপ ভার্দে (৩-২)
রাউন্ড অব ১৬: মিশর (৩-২)
কোয়ার্টার ফাইনাল: সুইজারল্যান্ড (৩-১)
ইংল্যান্ডের পথচলা
গ্রুপ পর্ব: ক্রোয়েশিয়া (৪-২), ঘানা (০-০) ও পানামা (২-০)
রাউন্ড অব ৩২: ডিআর কঙ্গো (২-১)
রাউন্ড অব ১৬: মেক্সিকো (৩-২)
কোয়ার্টার ফাইনাল: নরওয়ে (২-১)
