২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কারের দ্বিতীয় ঘোষণা আজ মঙ্গলবার। পদার্থবিজ্ঞানে এবার মেটাম্যাটেরিয়াল, ‘ইনভিজিবিলিটি ক্লোক’, কণাপদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও উন্নত আলোকপ্রযুক্তির গবেষণা পুরস্কারের জন্য আলোচনায় রয়েছে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টকহোমে বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। গতকাল সোমবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও নিউরোলজিস্ট কার্ল ডাইসেরথ এবং জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল। আলো দিয়ে স্নায়ুর সংকেত নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি অপ্টোজেনেটিকস নিয়ে গবেষণার জন্য তারা পুরস্কৃত হয়েছেন।
পদার্থবিজ্ঞানে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকাদের একজন ব্রিটিশ পদার্থবিদ জন বি. পেন্ড্রি। মেটাম্যাটেরিয়াল নিয়ে তার গবেষণা এবং আলোকে কোনো বস্তুর চারপাশ দিয়ে বাঁকিয়ে দেওয়ার ধারণা, যা ‘ইনভিজিবিলিটি ক্লোক’ বা অদৃশ্যতার আবরণ তৈরির তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত, তাকে সম্ভাব্য নোবেলজয়ীদের তালিকায় রেখেছে।
এএফপিকে সুইডেনের পাবলিক ব্রডকাস্টার এসভেরিয়েস রেডিওর বিজ্ঞানবিষয়ক প্রযোজক ক্যামিলা উইডেবেক বলেন, পেন্ড্রির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডেভিড স্মিথও পুরস্কার পেতে পারেন। মেটাম্যাটেরিয়াল নিয়ে গবেষণার এই ক্ষেত্র গত দুই দশকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ফিজিক্স ওয়ার্ল্ডের পূর্বাভাসেও পেন্ড্রি, ডেভিড স্মিথ ও ইতালীয়-আমেরিকান পদার্থবিদ ফেদেরিকো ক্যাপাসোর নাম এসেছে। মেটাম্যাটেরিয়াল, ট্রান্সফরমেশন অপটিকস ও কোয়ান্টাম ক্যাসকেড লেজার নিয়ে তাদের কাজের জন্য এই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে ফিজিক্স ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে।
টুইস্ট্রনিকস ও গ্রাফিন
২০১০ সালে গ্রাফিন নিয়ে গবেষণার জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল দেওয়া হয়েছিল। এবার সেই ধারাবাহিকতায় গ্রাফিনের দুটি স্তরকে নির্দিষ্ট কোণে ঘুরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরির গবেষণা ‘টুইস্ট্রনিকস’ও পুরস্কারের আলোচনায় এসেছে।
স্পেনের পাবলো জারিলো-হেরেরো, কানাডার অ্যালান ম্যাকডোনাল্ড এবং ইসরায়েলের রাফি বিস্ট্রিটজারের নাম এ ক্ষেত্রে আলোচনায় রয়েছে। তাদের গবেষণায় দুটি গ্রাফিন স্তর ঘুরিয়ে সাজানোর মাধ্যমে সুপারকন্ডাক্টিভিটি তৈরির সম্ভাবনা দেখা গেছে। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তবে এ গবেষণার জন্য নোবেল স্বীকৃতি পেতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে মনে করেন উইডেবেক।
ফিজিক্স ওয়ার্ল্ডও টুইস্ট্রনিকসকে এবারের সম্ভাব্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্ষেত্রগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে। ম্যাগাজিনটির মতে, দুই স্তরের দ্বিমাত্রিক পদার্থের আপেক্ষিক কোণ পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি ‘মোয়ারে সুপারল্যাটিস’ নানা ইলেকট্রনিক বৈশিষ্ট্য, এমনকি সুপারকন্ডাক্টিভিটিও তৈরি করতে পারে।
কণাপদার্থবিজ্ঞান ও নতুন প্রযুক্তি
পুরস্কারের সম্ভাব্য তালিকায় কণাপদার্থবিজ্ঞান ও কনডেন্সড-ম্যাটার ফিজিক্সের গবেষণাও রয়েছে। গবেষণার প্রভাব ও উদ্ধৃতির সংখ্যা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য নোবেলজয়ীদের তালিকা তৈরি করা ক্ল্যারিভেট এবার জাপানের চিহায়া আদাচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টিফেন আর. ফরেস্ট ও মার্ক ই. থম্পসনের নাম উল্লেখ করেছে।
তাদের গবেষণা ‘আল্ট্রাহাই-এফিশিয়েন্সি অর্গানিক লাইট-এমিটিং ডায়োড’ বা ওএলইডি নিয়ে। স্মার্টফোন, টেলিভিশন ও কম্পিউটারের পর্দায় কম বিদ্যুৎ খরচে উন্নতমানের ছবি প্রদর্শনে এই প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। ফিজিক্স ওয়ার্ল্ডও ক্ল্যারিভেটের ২০২৬ সালের সম্ভাব্য তালিকায় এই তিন গবেষকের নাম থাকার কথা জানিয়েছে।
ক্ল্যারিভেটের তালিকায় আরও রয়েছেন সুইস-ব্রিটিশ গবেষক নিকোলা স্পালডিন এবং চীনের কিকুন শিয়ে। স্পালডিনের তাত্ত্বিক কাজ ‘ম্যাগনেটোইলেকট্রিক মাল্টিফেরোয়িকস’ এবং শিয়ের কোয়ান্টাম অ্যানোমালাস হল ইফেক্ট নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণাও এবারের আলোচনায় রয়েছে।
অ্যান্টিম্যাটার ও ওয়েভলেট তত্ত্ব
ফিজিক্স ওয়ার্ল্ডের অনলাইন সম্পাদক হামিশ জনস্টনের মতে, সাম্প্রতিক নোবেল পুরস্কারের ধারা বিবেচনায় কনডেন্সড-ম্যাটার ফিজিক্স এবং কণাপদার্থবিজ্ঞানের কোনো গবেষণা এবার স্বীকৃতি পেতে পারে।
সিইআরএনের এথেনা ও আলফা সহযোগী গবেষণা দলও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে। তারা ঠান্ডা অ্যান্টিহাইড্রোজেন পরমাণু আটকে রেখে সেগুলোকে বিস্তারিতভাবে গবেষণা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই গবেষণার জন্য ডেনমার্কভিত্তিক মার্কিন পদার্থবিদ জেফরি হ্যাংস্ট সম্ভাব্য প্রার্থী হতে পারেন বলে ফিজিক্স ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে।
এ ছাড়া, বেলজিয়ামের পদার্থবিদ ইনগ্রিড ডাউবেচিস এবং ফ্রান্সের স্টেফান ম্যালাট ও ইয়েভেস মেয়ারকে ‘ওয়েভলেট থিওরি’র জন্য সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ছবি ও ভিডিওর কম্প্রেশনসহ কম্পিউটার প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের ব্যবহার রয়েছে।
মহাকাশবিজ্ঞানেও নজর
দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের বড় কোনো আবিষ্কার নোবেল স্বীকৃতি পায়নি। এ কারণে মহাকাশ ও মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণাও এবার আলোচনায় এসেছে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্টিন রিসের নাম রয়েছে। এর আগে তিনি ব্রিটেনের অ্যাস্ট্রোনমার রয়্যাল ছিলেন। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণা এবং ছায়াপথ কীভাবে গঠিত হয়, তা নিয়েও সম্ভাব্য নোবেল পুরস্কারের আলোচনা আছে।
এ ক্ষেত্রে মেক্সিকান-ব্রিটিশ কসমোলজিস্ট কার্লোস ফ্রেঙ্ক, আর্জেন্টিনার জ্যোতির্পদার্থবিদ হুলিও নাভারো এবং ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সাইমন হোয়াইটের নাম উঠে এসেছে।
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাসেও পেন্ড্রির নাম
বিজ্ঞানীদের নিয়ে করা আরেকটি পূর্বাভাসেও পেন্ড্রির নাম উঠে এসেছে। ‘দ্য সায়েন্টিস্ট’ ম্যাগাজিনের পাঠকদের মধ্যে পরিচালিত পূর্বাভাসে ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের কনডেন্সড-ম্যাটার পদার্থবিদ পেন্ড্রিকে মেটাম্যাটেরিয়াল ও ‘ইনভিজিবিলিটি ক্লোক’ নিয়ে কাজের জন্য সম্ভাব্য নোবেলজয়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নোবেল কমিটি সাধারণত পুরস্কার ঘোষণার আগে সম্ভাব্য বিজয়ীদের বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেয় না। ফলে এসব নাম কেবল বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস, চূড়ান্ত বিজয়ীদের নাম ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ‘দ্য সায়েন্টিস্ট’-এর প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এগুলো ব্যক্তিগত পূর্বাভাস, নোবেল কমিটির আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন বা নির্বাচন নয়।
২০২৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন ব্রিটেনের জন ক্লার্ক, ফ্রান্সের মিশেল দেভরেট এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন মার্টিনিস। কোয়ান্টাম মেকানিকসকে বাস্তব প্রযুক্তিতে প্রয়োগ এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশে অবদানের জন্য তাদের পুরস্কৃত করা হয়।
পদার্থবিজ্ঞানের পর বুধবার রসায়নে, বৃহস্পতিবার সাহিত্যে এবং শুক্রবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। ১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বছরের নোবেল মৌসুম শেষ হবে।
