Wednesday, July 8, 2026
Homeবাংলাদেশটানা বর্ষণে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে কয়েকশ স্কুল ভবন

টানা বর্ষণে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে কয়েকশ স্কুল ভবন

ছাদ থেকে চুঁইয়ে পানি পড়ছে, দেয়ালে ফাটল, হঠাৎ করেই খসে পড়ছে ছাদের পলেস্তারা—এসবই এখন হবিগঞ্জের কয়েকশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিত্যদিনের চিত্র। বর্ষার প্রতিটি দিনই এখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ে আসে নতুন আতঙ্ক।

সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নেয় গত ২০ জুন সকাল প্রায় ১১টার দিকে। মাধবপুর উপজেলার আন্দিউড়া ইউনিয়নের হরিশ্যামা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে অফিস সহকারী প্রকাশ দাস আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

প্রকাশ দাস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বহু বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে কাজ করি। ভবনের যে অবস্থা, এমন দুর্ঘটনা যে ঘটনাতে পারে সেটা আশঙ্কা আমাদের অনেকদিনের।’

তিনি বলেন, ‘এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে যেকোনো সময় আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

পলেস্তারা খসে পড়ার মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘ভাগ্য ভালো যে তখন ক্লাস চলছিল না। নইলে তো অনেক বাচ্চা থাকতো, আর তাদেরও আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকতো।’

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভাষ্য, সেই আতঙ্ক এখনও কাটেনি। বর্ষাকালের আরও অনেকটা সময় বাকি থাকায় অনেকেই আশঙ্কা করছেন, হরিশ্যামা বিদ্যালয়ের এই ঘটনার মতো জেলার শত শত জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবনেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।

হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারপরও এসব ভবনেই প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণ করছে।

হরিশ্যামা বিদ্যালয়ের ঘটনার পর হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য রুহি দাস হবিগঞ্জের প্রধান বিচারিক হাকিম মোহাম্মদ জাকির হোসেন টিপুর আদালতে একটি স্বপ্রণোদিত আবেদন করেন। আবেদনে তিনি জেলার সব ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়েছেন।

রুহি দাস বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের এত বড় সংখ্যা প্রমাণ করে যে, বিষয়টি বছরের পর বছর অবহেলিত ছিল। এটি শুধু রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় নয়, শিশুদের জীবনের প্রশ্ন। জেলার প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হলেও দুর্ঘটনা ঘটার পরই কেবল ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে কোনো বড় দুর্ঘটনার জন্য অপেক্ষা করা উচিত হবে না।’

জেলার আরও কয়েকটি উপজেলা পরিদর্শনেও একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনের চিত্র পাওয়া গেছে।

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গৌরাঙ্গ এলাকার চক বাবুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯৫ জন শিক্ষার্থী ৩৪ বছর পুরোনো জরাজীর্ণ ভবনে পাঠ নিচ্ছে। সম্প্রতি ছাদের পলেস্তারা খুলে পড়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাদি আহত হয়। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘পরীক্ষার সময় হঠাৎ ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ে সাদি আহত হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়েই বিদ্যালয়ে আসে।’

বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক শাহিদা বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে বুক কাঁপে।’

তিনি বলেন, ‘ছাদের পলেস্তারা খুলে পড়ে আমার ছেলেটা আহত হওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই আতঙ্কে থাকি। সে বাসায় না ফেরা পর্যন্ত কোনো কাজেই মন বসে না। বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ানোর সামর্থ্যও আমাদের নেই। তাই বাধ্য হয়ে এখানেই পাঠাতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, দ্রুত ভবনটি মেরামত বা নতুন করে নির্মাণ করা হোক।’

জেলার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সোমেশ্বরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও ভালো নয়।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক দীপঙ্কর রায় জানান, ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও বিদ্যালয়ের সর্বশেষ নতুন ভবন নির্মাণ করা হয় ১৯৯৪ সালে। এরপর থেকে ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্ষাকালে শ্রেণিকক্ষে পানি ঢোকে, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ কারণে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা সন্তানদের অন্য স্কুলে নিয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমছে।’

এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আব্দুল কাশেম বলেন, ‘অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানদের অন্য স্কুলে দেওয়ার কথা ভাবছেন। বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। ছাদ দেখে মনে হয়, যেকোনো দিন ভেঙে পড়বে। আমরা বহুবার স্কুল পরিচালনা কমিটির কাছে অভিযোগ করেছি, কিন্তু কাজ হয়নি। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দায় নেবে কে?’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জের নয়টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৫৯টি বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। অধিকাংশ ভবনেই প্রায় ২৫ বছর ধরে বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। এর মধ্যে ২০টি বিদ্যালয়কে ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হবিগঞ্জ সদর, লাখাই, বাহুবল, মাধবপুর ও চুনারুঘাটে তিনটি করে, নবীগঞ্জে দুটি এবং বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও শায়েস্তাগঞ্জে একটি করে বিদ্যালয় এ তালিকায় রয়েছে।

বর্তমানে জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনগুলোতে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী মো. সেলিম মিয়া বলেন, ‘এসব বিদ্যালয়ের ভবন পুনর্নির্মাণের কাজ জরুরি কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত সরকারের। এগুলো নিয়মিত উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে করলে হবে না। ২৫ বছর ধরে অবহেলিত ভবন জোড়াতালি দিয়ে ঠিক করা যাবে না। আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানাই, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর জন্য আগে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হোক এবং একটি স্বাধীন পরিদর্শন দল গঠন করা হোক, যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।’

হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর জন্য নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

Most Popular