চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের দুটি পার্কিংয়ের ইজারা-সংক্রান্ত রুল হাইকোর্টে খারিজ হয়েছে চার মাস আগে। কিন্তু এর পরও ওই দুটি পার্কিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ফি আদায় করছেন সাবেক ইজারাদার মো. শাহ আলম।
প্রকাশ্য দিবালোকে এই ফি আদায় চললেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে যেন চোখ বন্ধ করে রেখেছে।
গত ২০ মে হাইকোর্ট ইজারা-সংক্রান্ত ওই রুল ডিসচার্জ করেন। এরপর গত ২৪ ও ২৭ সেপ্টেম্বর পার্কিং দুটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কার, মাইক্রোবাস, মিনিবাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও মোটরসাইকেল রাখা হচ্ছে। স্টেশন ভবনের পূর্ব ও উত্তর পাশের এই পার্কিং দুটিতে রাখা যানবাহন থেকে ফি আদায় করছেন সাবেক ইজারাদার মো. শাহ আলমের প্রতিষ্ঠান এসএ করপোরেশনের কর্মীরা।
২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ মাসুদ পূর্ব পাশের পার্কিংয়ে মোটরসাইকেল রাখেন। এ জন্য তার কাছ থেকে ৩০ টাকা ফি নেওয়া হয়। তাকে একটি রসিদও দেওয়া হয়। রসিদে আদায়কারীর স্বাক্ষরের পাশাপাশি এসএ করপোরেশনের নাম লেখা ছিল।
একাধিক চালক ও মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পার্কিংয়ে মোটরসাইকেলের জন্য ৩০ টাকা এবং কার ও মাইক্রোবাসের জন্য ৫০ টাকা ফি নেওয়া হয়। এ ছাড়া ছোট কাভার্ড ভ্যান ও মিনিবাসের জন্য ১৩০ টাকা এবং বড় কাভার্ড ভ্যান ও বাসের জন্য ১৫০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।
পার্কিংয়ের ম্যানেজার ও এসএ করপোরেশনের কর্মী মো. আলাউদ্দিন জানান, প্রতিদিন সেখানে অন্তত ২০০টি যানবাহন রাখা হয়। তবে রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, দুই পার্কিংয়ের আয়তন এক লাখ বর্গফুটের বেশি। সেখানে অন্তত ৩০০টি যানবাহন রাখা সম্ভব।
রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রধান আইন কর্মকর্তা আল মাহমুদ বলেন, শাহ আলম নতুন করে ইজারা নেওয়ার পরিবর্তে পুরোনো ইজারা নবায়নের জন্য হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আদালত রুল ডিসচার্জ করে দেওয়ার পর শাহ আলম আর পার্কিং দুটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। সেখান থেকে পার্কিং ফি আদায় করাও আইনগতভাবে অনুমোদিত নয়।’
চট্টগ্রামের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সাবেক ইজারাদার পার্কিং ফি আদায় করছেন—এ বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না। যানবাহন থেকে ফি আদায়ের কোনো অনুমতি তাদের নেই, কারণ তারা আর বৈধ ইজারাদার নন।’
তিনি আরও বলেন, রুল ডিসচার্জের বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানে। এরপর নতুন করে ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। কিন্তু নতুন রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিধিমালায় পার্কিংয়ের ইজারা দর আলাদাভাবে উল্লেখ ছিল না। তাই প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা দরপত্র প্রক্রিয়া বন্ধ রাখেন এবং নতুন দর নির্ধারণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেন।
ডিআরএম বলেন, ‘গত ২৮ সেপ্টেম্বর আমরা নতুন দর পেয়েছি। এখন শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে।’
রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, স্টেশন ভবনের পূর্ব পাশে ৭০ হাজার বর্গফুট এবং উত্তর পাশে ৩৮ হাজার বর্গফুট জায়গা শাহ আলমকে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই বছরের জন্য তাকে ইজারা দেওয়া হয়।
সে সময় দুই বছরের জন্য পূর্ব পাশের পার্কিংয়ের ইজারা মূল্য ছিল ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর উত্তর পাশের পার্কিংয়ের জন্য এই মূল্য ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
চুক্তিতে ওই জায়গায় কেবল প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও মিনি কাভার্ড ভ্যান রাখার কথা উল্লেখ ছিল। তবে ইজারাদার সেখানে বাস, কাভার্ড ভ্যানসহ সব ধরনের যানবাহন রাখতেন। পূর্ব পাশের পার্কিংয়ে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
আইন কর্মকর্তা আল মাহমুদ বলেন, দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রেলওয়ে শাহ আলমের সঙ্গে এক বছরের জন্য চুক্তি নবায়ন করে। তবে ওই নবায়ন চুক্তিতে পুনরায় ইজারা নবায়নের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
এরপর নতুন করে ইজারা দেওয়ার জন্য ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে রেলওয়ে। এর বিরুদ্ধে শাহ আলম হাইকোর্টে রিট করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ইজারা কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে রুল জারি করেন। পরে চলতি বছরের ২০ মে হাইকোর্ট ওই রুল ডিসচার্জ করে দেন।
বর্তমানে কীসের ভিত্তিতে এসএ করপোরেশন পার্কিং ফি আদায় করছে, তা জানতে শাহ আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি এসএ করপোরেশনের ম্যানেজার সম্রাটকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে পার্কিংয়ের ম্যানেজার আলাউদ্দিন বলেন, তারা শুধু অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘অফিসের নির্দেশ অনুযায়ী পার্কিং ফি আদায় করছি। এসএ করপোরেশন এখানকার ইজারাদার বলেই আমরা জানি। পার্কিংয়ের ইজারা নিয়ে আদালতের কোনো আদেশ বা রেলওয়ের অন্য কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, আমাদের জানা নেই।’
