রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ‘মিনি কক্সবাজার’ এলাকায় গত ৫ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে একটি মাঠে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের সময় সন্দেহভাজন ৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।
মাঠে জড়ো হওয়া সংক্রান্ত প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় তাদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে দায়ের করা মামলায় ওই ৬ জনকে ৩ দিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত।
গ্রেপ্তার ৬ জন হলেন— মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবির (২৩), তার সহযোগী হোসেন তানিম (২০), আতাউল্লাহ শাহ (৩২), মোহাম্মদ জুনায়েদ (২২), আবিদুর রহমান (২০) ও মোহাম্মদ বায়োজিত (৩০)।
আজ বুধবার সাবির ও তানিমকে আবার আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করে তদন্ত কর্মকর্তা। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম দুজনের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
বাকি ৪ জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, প্রশিক্ষক সাবিরের মোবাইল ফোন থেকে একটি ভিডিও পাওয়া গেছে, যা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, ভিডিওর একাংশে রাতের অন্ধকারে একটি গ্রামের রাস্তায় একাধিক বিস্ফোরণের দৃশ্য রয়েছে। এতে আরও রয়েছে উগ্রবাদী স্লোগান, ধারালো অস্ত্র হাতে সাবিরের হুমকিমূলক বক্তব্য।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ভিডিওটির ব্যাকগ্রাউন্ডে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রচারণামূলক একটি আরবি গান যুক্ত করা হয়েছিল।
তবে ভিডিওটি কোথায়, কখন ধারণ করা হয়েছিল এবং পরে কাকে পাঠানো হয়েছিল—সে বিষয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।
জিজ্ঞাসাবাদে সাবির দাবি করেছেন, ভিডিওটি তার সহযোগীরা ধারণ করেছিলেন। পরে তারা ওই গান যুক্ত করে বিদেশে একজনের কাছে পাঠিয়েছিলেন।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সাবির “এসবিজে” নামে একটি দল গঠন করেছিলেন। এর পূর্ণরূপ ‘সাবির ভাইয়ের জামা’। এই দলে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ জন সদস্য ছিলেন।’
এখানে ‘জামা’ শব্দটি ‘জামাত’ বা একটি সংঘবদ্ধ দলের সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, ‘এই নতুন দলটির সঙ্গে পরিচিত কোনো সংগঠনের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে এটি সাবিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি ছোট, স্বঘোষিত গোষ্ঠী হিসেবে পরিচালিত হতো। সেখানে সাবির নিজেকে “আমির-ই-মুজাহিদ” হিসেবে পরিচয় দিতেন।’
তদন্তকারীদের দাবি, নিষিদ্ধ সংগঠন আনসার আল ইসলাম এবং হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামি বাংলাদেশের (হুজি-বি) নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন সাবির। তবে তাদের আদর্শ ও কৌশলের সঙ্গে নিজের মতের মিল না থাকায় পরে তিনি নিজস্ব একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলেন।
আদালতে শুনানির সময় বিচারক বলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থেই তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে যদি কোনো তথ্য না পাওয়া যায়, তাহলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।’
সাবির ও তানিম ছাড়া গ্রেপ্তার বাকি ৪ জনের মধ্যে আতাউল্লাহ শাহ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাজীপুর মহানগর আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব ছিলেন। গ্রেপ্তারের দুদিন পর, ৭ জুলাই রাতে তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
এক বিজ্ঞপ্তিতে এনসিপি জানায়, নীতি ও আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ ওঠায় দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আতাউল্লাহ শাহকে সব পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা জানান, তারা এখন খতিয়ে দেখছেন উদ্ধার হওয়া ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের ভিডিও, মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং গ্রেপ্তার ৬ জনের সাংগঠনিক যোগাযোগ—এসবের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না এবং সাবিরকে কেন্দ্র করে একটি ছোট উগ্রবাদী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল কি না।
আগামী ১২ জুলাইয়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
