Thursday, June 18, 2026
Homeবিদেশএফ-১৮ এর মতো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে যেভাবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ইরানের মিলিশিয়ারা

এফ-১৮ এর মতো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে যেভাবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ইরানের মিলিশিয়ারা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানের সামরিক বাহিনী।

আকাশ প্রতিরক্ষায় জোর দিয়ে তারা ব্যাপকভাবে কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বা ‘ম্যানপ্যাডস’ (ম্যান–পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) মোতায়েন করছে।

সাম্প্রতিক যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশটির বিপ্লবী গার্ডস (আইআরজিএস) তাদের আধাসামরিক বাসিজ বাহিনীর সদস্যদের এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে।

সম্প্রতি ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘ফ্রান্স ২৪’ এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইরানের মিলিশিয়া বাহিনীকে ম্যানপ্যাডস ব্যবহার ও প্রশিক্ষণের বিস্তারিত তথ্য।

মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের প্রতিবেদনের বরাতে সংবাদ মাধ্যমটি জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে অন্তত ৪২টি মার্কিন বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিমান ধ্বংসের সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা না করলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এফ-১৫, এফ-১৮ ও এমসি-১৩০সহ ডজনখানেক বিমান কম উচ্চতার ভূমি থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ম্যানপ্যাডস হলো হালকা ও বহনযোগ্য গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র। একজন অপারেটরই চালাতে পারেন। বিমান ট্র্যাক করার জন্য এর কোনো রাডারের প্রয়োজন হয় না। তবে এর পাল্লা ৫ থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমিত। ১ থেকে ৩ কেজি ওজনের ছোট ওয়ারহেডও রয়েছে। এই বিস্ফোরক অংশটি অনেক সময় বিমানকে পুরোপুরি ধ্বংস না করে সামান্য ক্ষতি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যানপ্যাডস সস্তা, সহজে বহনযোগ্য, সহজে তৈরিযোগ্য এবং এর প্রশিক্ষণ দেওয়াও বেশ সহজ। অথচ শত্রুপক্ষের রাডারে এটি সহজে ধরা পড়ে না। এ কারণেই যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

ইরানের নিজেদের তৈরি ম্যাপ্যাডসের নাম মিসাঘ–১, মিসাঘ–৩ ও সাহান্দ–৩।

মার্কিন থিংকট্যাংক ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সামরিক বিশ্লেষক ফারজিন নাদিমি বলেন, যুদ্ধবিমানের জন্য ম্যানপ্যাডস একটি বিপজ্জনক ও চমকপ্রদ অস্ত্র। এগুলোকে যেকোনো জায়গায় দ্রুত সরিয়ে নেওয়া যায় এবং যেহেতু এগুলো ইনফ্রারেড বা তাপ সনাক্তকরণ প্রযুক্তিতে চলে, তাই এদের নিজস্ব কোনো সিগন্যাল বা নির্গমন থাকে না। ফলে একে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রেখে যেকোনো সময় ছোঁড়া সম্ভব।

কাঁধে বহনযোগ্য এই ছোট ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কিভাবে কাজ করে তার ব্যাখ্যাও দেন এই বিশ্লেষক।

তিনি বলেন, এগুলো বিমানের ইঞ্জিনের তাপমাত্রাকে নিখুঁতভাবে লক বা লক্ষ্যবস্তু করে।

আধুনিক ম্যানপ্যাডসের সেন্সর আরও বেশি সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করেন তিনি বলেন, বিমান চলার সময় বাতাসের ঘর্ষণে যে তাপ তৈরি হয় তা সনাক্ত করতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো।

এগুলো বিমানের সরাসরি গায়ে না লেগে কাছাকাছি গিয়েও বিস্ফোরিত হতে পারে, যা লক্ষ্যবস্তুকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এ সময় তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ক্রুজ মিসাইলের বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ম্যানপ্যাডস থেকে রক্ষা পেতে রাশিয়া তাদের ক্রুজ মিসাইলে ফ্লেয়ার সিস্টেম যোগ করেছে।

যুদ্ধের সময় ধারণ করা অনেক ভিডিওতে ইরানিদের এই সিস্টেম সফলভাবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটে গত ৩ এপ্রিল দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে। সেখানে একটি এফ-১৫ বিমান কাঁধ থেকে ছোড়া মিসাইলের আঘাতে ভূপাতিত হয়।

পরে বিমানটির পাইলটদের উদ্ধারের জন্য আসা আরও দুটি মার্কিন বিমান এমসি-১৩০ ও এ-১০ ওয়ারহগ ম্যানপ্যাডসের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর আগে ২৫ মার্চ দক্ষিণ ইরানে একটি মার্কিন এফ-১৮ বিমান ম্যানপ্যাডসের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি ইরানি মিসাইল মার্কিন এফ-১৮ বিমানের লেজে আঘাত করছে এবং লেজের একটি ছোট অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

আরেকটি ভিডিওতে পারস্য উপসাগরের কেশম দ্বীপের ওপরে একটি মার্কিন ‘লুকাস’ ড্রোন ভূপাতিত করার দৃশ্য দেখানো হয়।

এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরানি সশস্ত্র বাহিনী এই সিস্টেমের কার্যকারিতা বুঝতে পেরে আরও বেশি জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে।

তারা নিজেদের তৈরি ‘মিসাঘ-১’ এবং ‘সাহান্দ-৩’ ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে শত্রু বিমানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে হয়, তার টিউটোরিয়াল ভিডিও তৈরি করে বাসিজ সদস্যদের কাছে পাঠায়।

افسران پدافند نیروی زمینی ارتش مجهز به موشک های دوشپرتاب کوتاه برد میثاق-3 pic.twitter.com/7BXs8GNKDt

— ⚔ Iranian Militarism ⚔ (@Ir_militarism) November 7, 2025

ভিডিওর পাশাপাশি মৌলিক নির্দেশনার পিডিএফ ফাইলও পাঠানো হয়।

বিশেষজ্ঞ ফারজিন নাদিমি বলেন, এটি ব্যবহারের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে যে কেউ কম উচ্চতায় সীমার মধ্যে আসা বিমানকে আঘাত বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে। বিশেষ করে পাইলট যদি আগে থেকে সতর্ক না থাকেন।

১৯ মে আইআরজিসির টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওর বরাতে ‘ফ্রান্স ২৪’ জানায়, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট ব্যবহার করে লাইভ ট্রেনিং সেশন যুক্ত করেছে ইরানের সেনাবাহিনী।

ভিডিও ক্যাপশনে লেখা ছিল ‘এফ-১৮ শিকারের প্রশিক্ষণ’। এতে দেখা যায়, ভিআর হেডসেট পরিয়ে বাসিজ মিলিশিয়াদের ম্যানপ্যাডস চালানোর কৌশল শেখানো হচ্ছে।

১৬ মে প্রকাশিত আরেকটি গোপন নথিতে মাঠপর্যায়ে এই অস্ত্র ব্যবহারের কৌশল শেখানোর ছবিসহ বিবরণ পাওয়া যায়।

রাশিয়া ও চীনের প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব ম্যানপ্যাডস তৈরি করেছে ইরান। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘মিসাঘ’ সিরিজ।

২০০০ সালের শুরুর দিকে চীনের বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা `কিউডব্লিউ-১’-এর আদলে মিসাঘ-১ তৈরি করে ইরান।

পরবর্তীতে এর উন্নত সংস্করণ মিসাঘ-২ এবং লেজার ফিউজযুক্ত মিসাঘ-৩ তৈরি করে দেশটি। এই সংস্করণগুলো ৫ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত আঘাত করতে পারে।

নতুন প্রজন্মের ‘মিসাঘ-৩’ সম্পর্কে বিশ্লেষক ফারজিন নাদিমি বলেন, এই মিসাইলগুলোতে লেজার প্রক্সিমিটি ফিউজ রয়েছে। যা থেকে সুনির্দিষ্ট লেজার রশ্মি বের হয়। লেজারটি বিমানের বডিতে স্পর্শ করা মাত্রই বিস্ফোরিত হয়।

এর সুবিধা হলো, সরাসরি বিমানের গায়ে আঘাত না করলেও সমস্যা নেই। নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌঁছুলেই এটি বিস্ফোরিত হয়ে বিমানের দিকে অসংখ্য ধারালো ধাতব টুকরো ছুঁড়ে দেয়।

এটি কেবল ইঞ্জিনের ধোঁয়া লক্ষ্য করে নয়, বিমানের মূল বডি বা ককপিট লক্ষ্য করেও চালানো যায়। ফলে পাইলটদের কৌশলে এটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ অনেক কমে যায়।

২০০৮ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ম্যানপ্যাডসকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোটি কোটি ডলার মূল্যের যুদ্ধবিমানকে মাত্র কয়েক হাজার ডলারের গাইডেড মিসাইল দিয়ে ভূপাতিত করার এই কৌশল মোকাবিলায় মার্কিন বিমানবাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

বিশ্লেষক ফারজিন নাদিমির মতে উন্নত ম্যানপ্যাডস ও তার প্রশিক্ষণের প্রভাব শুধু কৌশলগত নয় বরং রণকৌশলগত। ইরান চাইলে অস্ত্র বা কৌশলে পরিবর্তন এনে আরও বেশি ক্ষতি করতে পারবে।

সংঘাত স্থলযুদ্ধে রূপ নিলে হেলিকপ্টার ও নিচু উচ্চতার বিমান ব্যবহার করা হবে তখন ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান শুধু নিজেদের তৈরি ম্যানপ্যাডসই ব্যবহার করছে না, তারা রাশিয়ার তৈরি ‘ভার্বা’ ম্যানপ্যাডস ও বেশ কিছু চীনা সিস্টেমও বিপুল পরিমাণে কিনেছে।

Most Popular