ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্প প্রশাসনের সমঝোতার প্রচেষ্টা ভেস্তে দিতে ইসরায়েল সরকারের সমর্থনে একটি সুসংগঠিত প্রচার অভিযান চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কিছু অংশ যুক্তরাষ্ট্রের জনমত প্রভাবিত করে এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে।
টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, গতকাল বুধবার জনপ্রিয় পডকাস্টার জো রোগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স এসব অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক প্রচার ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পারস্কেল এমন একটি প্রভাব বিস্তারকারী প্রচারণার নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা ইসরায়েল সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে। ওই প্রচারণার লক্ষ্য ছিল ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন (মাগা)’ সমর্থকদের মধ্যে ইসরায়েলপন্থি অবস্থান জোরদার করা।
ভ্যান্সের ভাষ্য, ‘আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, কারণ আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্ধারিত আলোচনার লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। এটি ছিল আলোচনাকে ব্যাহত করার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও বিপুল অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রচারণা।’
মঙ্গলবার প্রকাশিত টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্র্যাড পারস্কেলের প্রতিষ্ঠান ক্লক টাওয়ার এক্স গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ইসরায়েলের পক্ষে একটি প্রভাব বিস্তারকারী প্রচারণা পরিচালনা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট (ফারা)–সংক্রান্ত নথির ভিত্তিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচারণাটির আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য ছিল অনলাইনে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলা করা।
তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রকৃত লক্ষ্য ছিল তরুণ রক্ষণশীল মার্কিনিদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব তৈরি হওয়া ঠেকানো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে ইরান যুদ্ধ অবসানে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) সমালোচনা করে একযোগে প্রকাশিত একাধিক পোস্ট ট্রাম্প প্রশাসনের নজরে আসে। টাইমের দাবি, এগুলো ওই প্রভাব বিস্তারকারী প্রচারণার অংশ হতে পারে।
তবে ব্র্যাড পারস্কেল স্বীকার করেন যে, তরুণ মার্কিনিদের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান থেকে বিরত রাখাই ছিল প্রচারণার উদ্দেশ্য।
ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান-সংক্রান্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এর লক্ষ্য ছিল না বলেও জানান তিনি।
Quite the listen pic.twitter.com/U9TpsTa1Yt
‘আমেরিকার স্বার্থই আগে’
রোগানের সঙ্গে আলাপচারিতায় ভ্যান্স অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যমে তথ্য ফাঁস এবং বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে তাকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা নয়, বরং অনির্দিষ্টকাল সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমাকে কাতারের প্রভাবাধীন, বিদেশি সরকারের নিয়ন্ত্রিত কিংবা টাকার কার্লসনের নির্দেশে চলা ব্যক্তি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
ভ্যান্স বলেন, বিদেশি সরকারগুলো সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ‘ইসরায়েল করে, অন্য দেশও করে। কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন মার্কিন নেতৃত্ব সেই প্রভাবকে নিজেদের সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারণে জায়গা দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন দেখি একটি বিদেশি প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠী আমার আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত সমঝোতা ভেস্তে দেওয়ার জন্য অর্থায়ন করছে এবং সেই অর্থ পাওয়া ব্যক্তিরা অসৎ উপায়ে আমাকে আক্রমণ করছে, তখন আমার জবাব একটাই—নরকে যাও। আমি আমেরিকান জনগণের স্বার্থেই কাজ করব। আমার প্রথম দায়িত্ব আমেরিকার প্রতি।’
ভ্যান্স আরও দাবি করেন, ‘ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কিছু অংশ যে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত প্রভাবিত করে যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যেতে চাইছে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই।’
রোগানের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রভাব না থাকলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এত দীর্ঘ সময় ধরে চলত কি না—সে প্রশ্নে ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন, ইসরায়েলের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
Joe Rogan asks JD Vance why President Trump keeps saying a deal has been made with Iran and then starts bombing them again.
Vance: “We are on the right trajectory, it’s just going to be really messy. There’s going to be a lot of starts and stops.” pic.twitter.com/FimEZHfGJK
‘আলোচনার পথ এখনও খোলা’
ইরানের সঙ্গে আলোচনার বর্তমান অবস্থা নিয়ে ভ্যান্স বলেন, ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে একটি বিভাজন রয়েছে। একপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা চায়, অন্যপক্ষ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
তার দাবি, সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে ব্যাপক পরিমাণে তেল পরিবহন নিশ্চিত করতে সক্ষম হওয়ায় ইরানের কট্টরপন্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং সে কারণেই তারা ওই অঞ্চলে জাহাজে হামলা শুরু করে।
ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা অর্থনৈতিক চাপ, প্রণোদনা এবং কূটনৈতিক সংলাপ—সবকিছু একসঙ্গে ব্যবহার করছি। যখন সহিংসতা হয়, তখন তারও জবাব দিচ্ছি। সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ইতিবাচক দিকে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে তেহরান এখনও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বাইরে থাকা কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনা ধরে রেখেছে।
যুদ্ধ নয়, কূটনীতির পক্ষে
সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থি রক্ষণশীলদেরও সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, তাদের একমাত্র সমাধান হলো ‘ইরানকে পুরোপুরি বোমা মেরে ধ্বংস করা’ এবং সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করা। কিন্তু অতীতে এমন নীতি সফল হয়নি এবং এর জন্য বিপুলসংখ্যক স্থলসেনা মোতায়েন করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ট্রাম্পের জায়গায় থাকলে হয়তো তিনি সামরিক অভিযানের বিষয়ে প্রশাসনের অন্যদের তুলনায় কম উৎসাহী হতেন। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের বৈধ ও নৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা করা।
এপস্টিনকে নিয়েও মন্তব্য
সাক্ষাৎকারে আলোচিত আরেকটি বিষয় ছিল জেফরি এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি। ভ্যান্স বলেন, এই ইস্যু পরিচালনায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভুল ছিল, তবে ট্রাম্প কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন।
একইসঙ্গে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করেই দাবি করেন, দণ্ডিত যৌন অপরাধী এপস্টিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের পাশাপাশি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগ ছিল।
তবে এপস্টিনের সঙ্গে মোসাদের সম্পর্ক নিয়ে ভ্যান্সের এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
