Monday, July 13, 2026
Homeবিদেশআততায়ীর হাতে নিহত হলে কতটা কার্যকর হবে ট্রাম্পের ‘রেখে যাওয়া’ নির্দেশ?

আততায়ীর হাতে নিহত হলে কতটা কার্যকর হবে ট্রাম্পের ‘রেখে যাওয়া’ নির্দেশ?

ইরানের দাবি, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ কারণে তারা খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নিতে ট্রাম্পকে হত্যা করতে চায়। এমন দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

এমনকি এটাও বলেছেন ট্রাম্প যে, তাকে হত্যা করা হলে বা হত্যার চেষ্টা চালালে ইরানকে কীভাবে শায়েস্তা করতে হবে, সে নির্দেশনাও তিনি রেখে গেছেন।

তবে এই ‘রেখে যাওয়া’ নির্দেশ পালন করতে বাধ্য নন পরবর্তী সরকারপ্রধান।

গত ১১ জুলাই বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থায় এ ধরনের কোনো ‘ডেড ম্যানস সুইচ’—অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট নিহত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে এমন নির্দেশ দেওয়ার কোনো উপায় নেই।

মার্কিন সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ গ্যারেট এম. গ্রাফ বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্র ডেড ম্যানস সুইচ চালুর বিষয়টি উপেক্ষা করেছে।’

এখানে ডেড ম্যানস সুইচ বলতে মূলত যা বোঝানো হচ্ছে, তা হলো প্রেসিডেন্ট নিহত হলেই আততায়ী দেশের বিরুদ্ধে পরমাণু হামলা চালানো হবে। তবে আদতে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থার অস্তিত্ব নেই।

কাছাকাছি একটি উদাহরণ পাওয়া যায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধের আমলে, ১৯৮৫ সালের দিকে সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে পেরিমিটার নামে একটি নতুন প্রোটোকল যুক্ত হয়।

এর আরেক নাম ছিল ‘মের্তভায়া রুকা’ বা ডেড হ্যান্ড (মৃত মানুষের হাত)।

পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণায় জানা যায়, সোভিয়েতরা এমন একটি আধা-স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করেছিল, যাতে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট বা জ্যেষ্ঠ নেতারা নিহত হলে প্রতিশোধমূলক পারমাণবিক হামলার নির্দেশ কার্যকর করা সম্ভব হতো।

২০২৫ সালের ৩১ জুলাই সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট ও পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দিমিত্রি মেদভেদভ আবারও এই ‘ডেড হ্যান্ডের’ উল্লেখ করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে আসে। তিনি দাবি করেন, ওই প্রযুক্তি এখনো রাশিয়ার হাতে আছে এবং প্রয়োজনে তা কাজে লাগানো উচিত।

সে সময় ইউক্রেনে হামলা বন্ধের জন্য পুতিনকে হুমকি দিচ্ছিলেন ট্রাম্প। তার জবাবেই মেদভেদভের এই উক্তি।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’ বা স্থায়ী নির্দেশ রেখে গেছেন। যদি তিনি ইরানি আততায়ীর হাতে নিহত হন, তাহলে ওই নির্দেশ অনুযায়ী মার্কিন সেনারা ইরানকে এমনভাবে ধ্বংস করবে, যার নজির এর আগে দেখা যায়নি।

ট্রুথ সোশালে পোস্ট করে ট্রাম্প জানান, ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর দিকে ইতোমধ্যে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তাক করে রাখা হয়েছে। আরও হাজারো ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত হওয়ার পথে।

তবে এ ক্ষেত্রে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের কোনো ইঙ্গিত দেননি ট্রাম্প। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে ওয়াশিংটন, সেগুলো ব্যবহার করেই আরও তীব্র আকারে হামলা চালাতে বলেছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প উল্লেখ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে হত্যা বা হত্যার চেষ্টা করতে চায় ইরান। তাদের এই ইচ্ছা তারা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে উল্লেখ করেছে।

‘এ ক্ষেত্রে আমিই সেই ব্যক্তি,’ যোগ করেন ট্রাম্প।

তিনি আরও বলেন, ‘যদি ইরান সরকার তাদের এই হুমকি বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায়, তাহলে কী করতে হবে, সে নির্দেশ ইতোমধ্যে দেওয়া আছে। মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের সব এলাকাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম।’

ট্রাম্পের দাবি, এই নির্দেশের মেয়াদ অন্তত এক বছর এবং প্রয়োজনে তা আরও বাড়ানো যাবে।

ট্রুথ সোশালের ওই পোস্টের শেষ বাক্যে তিনি ব্যঙ্গ করে লেখেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র।’

এর আগেও ইরানের উদ্দেশে দেওয়া হুমকিমূলক পোস্ট তিনি একই কায়দায় শেষ করেছেন।

এর আগে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল ট্রুথ সোশালের একটি পোস্টে ‘হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের জনগণকে নরক যন্ত্রণা পোহাতে হবে’ বলে হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। খ্রিস্টানদের পবিত্র ইস্টার দিবসে দেওয়া ওই পোস্টের শেষেও একই কথা উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাম্প নিহত হলে তাৎক্ষণিকভাবে দেশ শাসনের ক্ষমতা চলে যাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের হাতে। প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্বও ভ্যান্সের ওপর বর্তাবে।

কোনো ধরনের প্রতিশোধ, কূটনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়ার এখতিয়ার তিনিই পাবেন।

এ বিষয়টি মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী ও ১৯৪৭ সালের প্রেসিডেনশিয়াল উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে।

বলাই বাহুল্য, এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অন্তিম ইচ্ছা বা ‘রেখে যাওয়া’ নির্দেশনা পালনের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করবে জেডি ভ্যান্সের সিদ্ধান্তের ওপর।

এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প যা বলে গেছেন, তা অক্ষরে অক্ষরে পালনের সুযোগ থাকবে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ ভ্যান্সের সামনে।

কিন্তু চাইলে তিনি একেবারেই কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোর সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। আবার ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়াও আসতে পারে তার কাছ থেকে।

পরমাণু হামলা বা অন্য কোনো মহাবিপর্যয়ের মুখে সরকারের বেশিরভাগ সদস্য নিহত হলেও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে ওয়াশিংটন।

তবে এসব পরিকল্পনায় প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা হামলা চালানোর কোনো উল্লেখ নেই।

এমনকি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট যদি এমন কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করে থাকেন, বা নির্দেশ দিয়ে থাকেন, সেটাও ‘বাধ্যতামূলক’ হিসেবে বিবেচিত নয়।

ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় চার মার্কিন প্রেসিডেন্ট আততায়ীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। তারা হলেন:

আব্রাহাম লিঙ্কন (১৮৬৫)

জেমস এ. গারফিল্ড (১৮৮১)

উইলিয়াম ম্যাককিনলে (১৯০১)

জন এফ. কেনেডি (১৯৬৩)

প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন এবং দেশটিতে কোনো ধরনের সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়নি।

তবে এআই-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের যুগে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন।

ট্রাম্প নিজেই মনে করেন যে তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ঝুঁকি থেকে তা হুমকিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

তবে এবারই প্রথম নয়। ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন সেনারা ইরানের কুদস বাহিনীর প্রধান জেনারেল কাশেম সোলেইমানিকে হত্যা করে। সে সময় থেকেই প্রতিশোধ নিতে ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে ইরান। খামেনির মৃত্যুর পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

চলতি বছরের জুনে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ট্রাম্পকে হত্যার জন্য নতুন ছক কষছে তেহরান। এ বিষয়টি ওয়াশিংটনকে জানায় ইসরায়েলি গোয়েন্দা বাহিনী।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেল আবিবের এই তথ্যকে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেনি ওয়াশিংটন। তা সত্ত্বেও, তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়া ট্রাম্পকে বাড়তি সুরক্ষা দিতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কাতারের কাছ থেকে পাওয়া নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে চেপে আঙ্কারা গেলেও ফেরার সময় ট্রাম্পকে বহন করে একটি পুরোনো এবং তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত এয়ার ফোর্স ওয়ান উড়োজাহাজ।

ট্রুথ সোশালে ট্রাম্পের পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি জানান, ইরানের জনগণ তার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্যোগ চালিয়ে যাবে।

টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে প্রতিশোধ প্রসঙ্গে মোজতবা খামেনি বলেন, ‘দুইবারের যুদ্ধে ঘৃণ্য অপরাধী ও হত্যাকারীদের হাতে শহীদ হওয়া ইরানিদের পবিত্র রক্তের প্রতিশোধ নিতে আমরা অঙ্গীকার করছি। জাতি হিসেবে এই প্রতিশোধ আমাদের চাহিদা এবং তা অবশ্যই পূরণ করা হবে,’ যোগ করেন তিনি।

ট্রাম্প নিহত হলে তার রেখে যাওয়া নির্দেশনার কতটুকু পালন করবে সামরিক বাহিনী, এ বিষয়ে হোয়াইট হাউজকে প্রশ্ন করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।

গ্রাফ জানান, আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত হামলার মুখে পড়লে কীভাবে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টির ব্যবস্থাপনা করা হবে, সেটা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে পরিকল্পনা করে গেছে। বিশেষত, ৩০ বছরের স্নায়ুযুদ্ধের আমলে বিষয়টি প্রায় সব সময়ই প্রাসঙ্গিক ছিল।

সে আমলে নিয়মিত একজন জেনারেলসহ একটি উড়োজাহাজ ২৪ ঘণ্টা আকাশে উড়ানো হতো। প্রেসিডেন্ট নিহত হলে ওই জেনারেল পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা হাতে পেতেন।

তবে সাংবাদিক-ইতিহাসবিদ গ্রাফের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন।

ট্রাম্প বিশেষ অর্থবহ কোনো নির্দেশ ‘রেখে যাচ্ছেন না’ বলেই মনে করেন গ্রাফ।

গ্রাফের মতে, তার এই স্ট্যান্ডিং অর্ডারের আইনি বৈধতা নেই। স্ট্যান্ডিং অর্ডারের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ট্রাম্পের কথোপকথন।

তিনি হয়তো ভ্যান্সকে ডেকে বলবেন, ‘আমি মারা গেলে ইরানে পরমাণু হামলা চালিও।’

সে ক্ষেত্রে এটি নির্দেশ নয়, বরং একটি অনুরোধ। আর প্রিয়, ততদিনে ‘প্রয়াত’ হয়ে যাওয়া নেতার অনুরোধ ফেলতে পারবেন না—এমনটিও হতে পারে।

সে ক্ষেত্রে বিষয়টি বৈধতাও পাবে।

কারণ ট্রাম্পের অবর্তমানে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বৈধ অধিকার পাবেন ভ্যান্স।

মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা দপ্তরের নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কখনো পরমাণু অস্ত্র হামলার মুখে পড়লে পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের (যিনি একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক) ইচ্ছাই যথেষ্ট। এজন্য আর কোনো ধরনের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।

এমনকি আক্রান্ত না হয়েও শত্রুর বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারেও নেই কোনো অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা।

তবে একটি সুনির্দিষ্ট যোগাযোগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই নির্দেশ প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছাতে হবে।

অতীতে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক করার প্রচেষ্টা এলেও তা ব্যর্থ হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন পর্যন্ত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেননি। 

এমনকি ট্রাম্পও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথা বলেছেন—পরমাণু অস্ত্রের বিষয়টি আলাদা করে বলেননি।

যার ফলে, ট্রাম্প নিহত হলেই পরমাণু যুদ্ধ বেঁধে যাবে, এমন ভাবার আপাতত তেমন কোনো যুক্তি নেই। 

 

 

Most Popular