গত বছর ফুডপান্ডা বাংলাদেশের লোকসান ৪০ শতাংশ বেড়ে ১১ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে টানা ১০ বছর লোকসানের বৃত্তেই আটকে রইল প্রতিষ্ঠানটি। তাদের মূল প্রতিষ্ঠান ডেলিভারি হিরোর বার্ষিক বিবরণীতে এই তথ্য উঠে এসেছে।
জার্মান এই কোম্পানিটি বাংলাদেশে চারটি ইউনিটের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে— তাদের মূল ফুড ডেলিভারি সেবা, কুইক-কমার্স প্ল্যাটফর্ম প্যান্ডামার্ট, ক্লাউড কিচেন ইউনিট ডিএইচ কিচেনস এবং হোল্ডিং কোম্পানি জেড ১৩৪৩ জিএমবিএইচ অ্যান্ড কোং।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে এই চারটি ইউনিট সম্মিলিতভাবে ১১০ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ইউরো লোকসান করেছে। আজ পর্যন্ত কোনো বছরই তারা লাভের মুখ দেখেনি।
মোট লোকসানের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি ফুড ডেলিভারি ব্যবসার, যার পরিমাণ ৭৯ দশমিক ২২ মিলিয়ন ইউরো। গত বছর এই একক খাতে লোকসান ৬৫ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়ায়, যা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির মোট বার্ষিক লোকসানের ৬০ শতাংশের বেশি।
অন্যান্য সহযোগী ইউনিটগুলোর মধ্যে প্যান্ডামার্ট গত বছর ২ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ইউরো লোকসান দিয়েছে। ২০২০ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত এই ইউনিটের মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ইউরোতে।
অন্যদিকে, ডিএইচ কিচেনস তাদের লোকসান ১৫ শতাংশ কমিয়ে শূন্য দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ইউরোতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, যদিও ২০২০ সাল থেকে এই ইউনিটের মোট লোকসান ২ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ইউরো।
এ ছাড়া হোল্ডিং কোম্পানি জেড ১৩৪৩ গত বছর ২ দশমিক ০১ মিলিয়ন ইউরো লোকসান গুনেছে, যার ফলে ২০২১ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ইউরোতে।
দীর্ঘ এক দশকের এই লোকসানি ধারার মধ্যেই গত সপ্তাহে ফুড পান্ডার মূল প্রতিষ্ঠান ডেলিভারি হিরো-কে কিনে নিতে উবারের ১৩ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবের খবর সামনে এসেছে।
উবারের ভাষ্য, এর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রস-সেলিং। অর্থাৎ যেসব বাজারে তাদের রাইড শেয়ারিং সেবা জনপ্রিয় কিন্তু ফুড ডেলিভারি সেবা নেই (যেমন: দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য), সেখানকার গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের উভয় সেবায় অভ্যস্ত করে তোলা।
উবার মনে করে, একজন ক্রস-প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর কাছ থেকে আসা মোট বুকিংয়ের পরিমাণ একক ব্যবহারকারীর তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিত্রটা ভিন্ন। ২০২০ সালের জুনে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক এই বাজারে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও শক্ত অবস্থান গড়তে ব্যর্থ হওয়ার পর মাত্র ১৪ মাসের মাথায় ফুড ডেলিভারি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছিল উবার।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি এ কে এম ফাহিম মাসরুর এই চুক্তি নিয়ে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। তার মতে, একটি সম্ভাবনা হলো উবার ফুডপান্ডা ব্র্যান্ডটি বজায় রাখবে এবং বর্তমানে যেভাবে ব্যবসা চলছে, তা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে।
অন্যটি হলো উবার এই ব্র্যান্ডটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু খুব একটা লাভজনক বাজার নয়, তাই ব্র্যান্ডটি বিলুপ্ত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনাও রয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রশ্নের জবাবে ফুডপান্ডা বাংলাদেশ জানিয়েছে, তাদের প্ল্যাটফর্মটি কিনে নেওয়ার ঘোষণার পর তাদের কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাননি।
প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে জানায়, আপাতত কোনো কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে না। সাংগঠনিক বা ব্র্যান্ডিং সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর নেওয়া হবে, যা ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ডেলিভারি হিরোর কাছে বাংলাদেশ অন্যতম একটি গতিশীল বাজার, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য উবারের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
