শত বছরের ইতিহাস আর নানা রোমাঞ্চকর গল্পে ভরা আমাদের এই ঢাকা শহর। প্রতিদিন এই নগরীর যেসব রাস্তা দিয়ে মানুষ হাঁটে কিংবা যেসব এলাকা দিয়ে যাতায়াত করে, সেগুলোর নাম কেন এমন হলো—এই প্রশ্ন হয়তো অনেকের মনেই উঁকি দেয়। কিছু নামের পেছনের ইতিহাস তো রূপকথাকেও হার মানায়। তেমনই দুটি পরিচিত এলাকা—পুরান ঢাকার নারিন্দা আর ব্যস্ত তোপখানা রোডের নামকরণের গল্প জেনে নেওয়া যাক।
পুরান ঢাকার নারিন্দা কিন্তু সাধারণ কোনো এলাকা নয়। ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন টিকে থাকা বিনত বিবির মসজিদ এই নারিন্দাতেই অবস্থিত।
প্রায় ১৪৫৬ সালে নির্মিত এই মসজিদটি প্রমাণ করে যে ঢাকার বয়স কেবল ৪০০ বছর নয়, এটি প্রাক-মুঘল আমল থেকেই এক সমৃদ্ধ শহর ছিল।
ইতিহাসের পাতায় বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবেও এলাকাটির বেশ গুরুত্ব দেখা যায়। ১৭৩৫ সালের দিকে ইংরেজরা এখানে একটি কারখানা (ফ্যাক্টরি) স্থাপন করেছিল। তবে মজার বিষয় হলো, আজ আমরা যে এলাকাকে ‘নারিন্দা’ নামে চিনি, এটি কিন্তু এর আসল নাম ছিল না।
একসময় নারিন্দার নাম ছিল ‘নারায়ণদিয়া’। এর অর্থ হলো ‘নারায়ণ দেবতার দ্বীপ’। কালক্রমে নারায়ণদিয়া শব্দটি মুখে মুখে বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে আজকের ‘নারিন্দা’ রূপ নিয়েছে।
সময়ের আবর্তে ঢাকা অনেক বদলেছে। আজকের ব্যস্ততম ও যানজটপ্রবণ তোপখানা রোড দেখে অতীত রূপ কল্পনা করা সত্যিই কঠিন। তবে অতীতে সৈন্যসামন্ত আর গোলাবারুদের যে সামরিক দাপট ছিল, তা কিন্তু রয়ে গেছে এর নামের ভেতরেই।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বর্তমান তোপখানা, পল্টন ও এর আশেপাশের এলাকা জুড়ে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনানিবাস (ক্যান্টনমেন্ট)। পুরো এলাকাটিকে তখন একনামে ডাকা হতো ‘গার্ড বাজার’।
এর মধ্যে নির্দিষ্ট একটি অংশ ব্যবহৃত হতো সৈন্যদের কামান বা গোলাবারুদ রাখার স্থান হিসেবে। ‘তোপ’ শব্দের অর্থ কামান, আর ‘খানা’ মানে স্থান বা ডিপো। অর্থাৎ যেখানে সেনাবাহিনীর তোপ বা কামান রাখা হতো, সেই জায়গার নামই হয়ে যায় ‘তোপখানা’।
পরবর্তী সময়ে, ১৮৪০ সালের দিকে সেনানিবাসটি গুটিয়ে নিয়ে এলাকাটি সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ফলে পুরোনো সেই ‘গার্ড বাজার’ হারিয়ে গেলেও ইতিহাসকে সাক্ষী রেখে ‘তোপখানা’ নামটি রয়ে গেছে আগের মতোই।
তথ্যসূত্র:
১. ঢাকা: হিস্ট্রি অ্যান্ড রোমান্স ইন প্লেস নেইমস, আজিমুশ্বান হায়দার
২. নোটস অন দ্য অ্যান্টিকুইটিজ অব ঢাকা, সৈয়দ আওলাদ হাসান
