ইংরেজি ডিকশনারিতে ‘ওয়ান্ডারওয়াল’ শব্দটির কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯৬৮ সালে ‘ওয়ান্ডারওয়াল মিউজিক’ নামে জর্জ হ্যারিসনের একটি সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবাম বের হয়েছিল বটে। তবে এ শব্দটিকে পরিচিতি দিয়েছে ব্রিটিশ ব্যান্ড ‘ওয়েসিস’। আর ‘ওয়ান্ডারওয়াল’-এ নতুন অর্থ যোগ করেছেন এবারের ফিফা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ম্যাচ চলাকালে মাঠে উপস্থিত ভক্তরা।
‘ওয়ান্ডারওয়াল’ গানটিতে এমন একজন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে হিমশিম খান; কিন্তু বিশ্বাস করেন যে আরেকজন মানুষ তার জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বারবার উচ্চারিত ‘মেইবি’ (হয়তো) শব্দটি যতখানি ‘দ্বিধা’ বোঝায়, তার চাইতে বেশি বোঝায় ‘আশা’। গানটির রচয়িতা নোয়েল গ্যালাঘারের মতে, গানটি এমন এক ‘কাল্পনিক বন্ধু’র কথা বলে, যে এসে আপনাকে আপনার নিজের ভেতরের সংকট থেকে উদ্ধার করবে।
ইংল্যান্ডের ফুটবলপ্রেমীরা এই ‘কাল্পনিক বন্ধু’-কে পার্থিব করে তুলেছেন। এবারের বিশ্বকাপ মিশনের প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ৪–২ গোলে হারানোর পর গোটা স্টেডিয়াম ইংল্যান্ডের উদ্দেশে একসঙ্গে গেয়ে ওঠে ‘মেইবি ইউ গনা বি দ্য ওয়ান দ্যাট সেইভস মি’। সেসময় পর্দায় বারবার উঠে আসতে থাকে হ্যারি কেইনের মুখ। ইংল্যান্ড দলের সব ফুটবলার একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে দর্শকের দিকে তাকিয়ে গানটি গাইছিলেন। দৃশ্যটি নাড়া দিয়ে যায়নি এমন ফুটবলপ্রেমী (ও সংগীতপ্রেমী) বোধহয় কমই আছে।
সেই অনন্য মুহূর্তের কারণেই গানটি পরে ইংল্যান্ডের সব ম্যাচের নিয়মিত অংশ হয়ে ওঠে। যেন এটিই ইংল্যান্ড ফুটবল দলের থিম সং।
‘ওয়ান্ডারওয়াল’ ইংলিশ ফুটবল লিগের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জায়গা তৈরি করে নিয়েছিল অনেক আগেই। তবে হাজারো ভক্ত যখন হ্যারি কেইনের দিকে তাকিয়ে গায় ‘মেইবি ইউ গনা বি দ্য ওয়ান দ্যাট সেইভস মি’ তখন মনে হয়, ‘হ্যারি কেইনই সেই খেলোয়াড়, যার পায়ে একটি জাতির স্বপ্ন’।
ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক হ্যারি কেইনও বলেছেন, ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে এটি তার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি।
তার ভাষায়, ‘সেই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে সমর্থকদের দারুণ এক বন্ধন তৈরি হয়। স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় সবার গানটির লিরিক্স মুখস্থ ছিল, সবাই একসঙ্গে গাইছিল।’
গান বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এক দশক আগেও ম্যাচ চলাকালে স্টেডিয়ামে গানের ব্যবহার সীমিত ছিল। দশর্করাই নিজেদের গান ও স্লোগানে স্টেডিয়াম মাতিয়ে রাখতেন। ধীরে ধীরে স্টেডিয়ামগুলোতে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন করা হয় এবং ক্লাবগুলো নিয়মিতভাবে পরিকল্পনামাফিক প্লেলিস্ট সাজাতে শুরু করে। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর অনেকেরই নিজস্ব ‘সংগীত পরিচয়’ আছে।
জাতীয় দলের ক্ষেত্রে ঠিক সেই অভিজ্ঞতাই তৈরি করতে চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, কোন গান কখন বাজানো হবে তা আগেভাগেই ঠিক করে রাখা হয়েছে। ফিফার ‘স্টেডিয়াম এন্টারটেইনমেন্ট টিম’ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এমন প্লেলিস্ট তৈরি করেছে।
এ বছর প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ায় এবারের প্লেলিস্টেও এসেছে অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য। এ বছর ৭৫০টিরও বেশি গান নির্বাচন করা হয়েছে। এসব প্লেলিস্টে সাধারণত স্টেডিয়ামে বাজানো হয় এমন জনপ্রিয় ক্লাসিক গানগুলোর পাশাপাশি প্রতিটি দেশের সমর্থকদের প্রিয় গানও রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ফিফার প্লেলিস্টে জায়গা পেয়েছে ‘স্টেডিয়াম-সং’ খ্যাত দ্য হোয়াইট স্ট্রাইপসের ‘সেভেন নেশন আর্মি’, এসি/ডিসির ‘থান্ডারস্ট্রাক’। আছে ১৯৯০-এর দশকের জনপ্রিয় ইউরোড্যান্স গান গ্যালার ‘ফ্রিড ফ্রম ডিজায়ার’। গানটি অন্তত এক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে নিয়মিত বাজানো হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও নিয়মিত শোনা যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের মাঠে।
এ ছাড়া, প্রতিটি দলের জন্য আলাদা কিছু ‘সিগনেচার’ গান নির্ধারণ করেছে ফিফা ‘স্টেডিয়াম এন্টারটেইনমেন্ট টিম’। যেমন, আর্জেন্টাইন রক ব্যান্ড ‘লোস ফাবুলোসোস ক্যাডিলাকস’-এর ‘এল ম্যাটাডোর’ গানটি স্থান পেয়েছে আর্জেন্টিনা ম্যাচের প্লেলিস্টে। বাস্তবে গানটির অর্থ বেশ গভীর। রেগে প্রভাবিত গানটি মূলত ১৯৭০-এর দশকে লাতিন আমেরিকার সামরিক একনায়কতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে লেখা। গানটির মূল বার্তা রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও সহিংসতার ইতিহাসকে তুলে ধরলেও ফুটবল মাঠে এটি পরিণত হয়েছে বিজয় ও উচ্ছ্বাসের প্রতীক হিসেবে। গানটির কোরাসে বারবার ‘ম্যাটাডোর! ম্যাটাডোর!’ ধ্বনির সঙ্গে লিওনেল মেসির উপস্থিতিতে মনে হয়, গানটি মেসির দুর্দান্ত গোল করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাকে প্রশংসা করেই গাওয়া হচ্ছে।
একইভাবে দলের সিগনেচার গান হিসেবে ঘানার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে ‘ডোপনেশন’-এর ২০২৫ সালের জনপ্রিয় গান ‘কাকালিকা’। গানটির মূল বার্তা হলো বৈচিত্র্য উদযাপন এবং মানুষকে আনন্দের সঙ্গে গান ও নাচ উপভোগ করতে উৎসাহিত করা।
মেক্সিকো বেছে নিয়েছে ‘মারিয়াচি ভারগাস’ ব্যান্ডের তিনটি ভিন্ন গান। মারিয়াচি ভারগাস একটি বিখ্যাত মারিয়াচি লোকসংগীত ব্যান্ড, যা ১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যান্ডটি তাদের সংগীত ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এবং আজও সমান জনপ্রিয়।
আর দক্ষিণ কোরিয়া বরাবরের মতোই তাদের প্লেলিস্টে রেখেছে কে-পপ। আছে ব্ল্যাকপিঙ্ক এবং বিটিএসের একাধিক গান, যা দেশটির আধুনিক জনপ্রিয় সংগীত সংস্কৃতিকে বিশ্বকাপের মঞ্চে তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের জন্য যেন নির্ধারিত ডাফট প্নাকের বিখ্যাত গান ‘ওয়ান মোর টাই’। এমবাপের একের পর এক গোলের সাফল্যের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে গেছে গানটি।
অস্ট্রেলিয়ার সিগনেচার গান মেন অ্যাট ওয়ার্ক ব্যান্ডের বিখ্যাত ‘ডাউন আন্ডার’। এই গানটি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত।
আর বেলজিয়াম তাদের ওয়ার্ম-আপের জন্য বেছে নিয়েছে টেকনোট্রনিকের জনপ্রিয় গান ‘পাম্প আপ দ্য জ্যাম’-কে।
স্বাগতিক দল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকরা শুরুর দিকে মাঠে কেবল ‘ইউএসএ ইউএসএ’ স্লোগান দিলেও তেমন কোনো গানে নিজেদের পরিচিত করাতে পারেনি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসিঠাট্টাও হয়েছে। পরে খুব দ্রুতই নিজেদের একটি গান খুঁজে নিয়ে বিড়ম্বনামুক্ত হয়েছে তারা। জন ডেনভারের বিখ্যাত গান ‘কান্ট্রি রোডস টেক মি হোম’ অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের থিম সংয়ে পরিণত হয়েছে। গানটি গাইতে শুরু করার পর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ও অংশগ্রহণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
ফিফা বলছে, এসব গানের উদ্দেশ্য ম্যাচের আবহ তৈরি করা, প্রতিটি দলের সাংস্কৃতিক পরিচয় ফুটিয়ে তোলা এবং এমন স্মরণীয় মুহূর্ত সৃষ্টি করা, যা অনেক সময় ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও দীর্ঘদিন মানুষের মনে থেকে যায়।
কারণ শেষপর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে মানুষ শুধু গোল, ট্রফি কিংবা স্কোরলাইনই মনে রাখে না। মনে রাখে, সম্মিলিত আনন্দ, উদযাপন কিংবা দুঃখের স্মৃতি। কিশোর বয়সে স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার স্মৃতি কারও মনে হয়ত গেঁথে থাকবে এই গানগুলোর সঙ্গে। যেকোনো পরিস্থিতিতে এই গান আরও একবার কোনো একটি নির্দিষ্ট ম্যাচের কথাই মনে করিয়ে দেবে।
