বাউল, ফকির ও সন্ন্যাসীদের ওপর হামলা এবং মাজার ও খানকায় আক্রমণের অভিযোগ তদন্ত করে ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
সম্প্রতি প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ আদেশে পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে বাউল, ফকির ও সন্ন্যাসীদের সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।
স্বরাষ্ট্রসচিব, ধর্মসচিব, সংস্কৃতিসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি রাজিক–আল–জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২১ জুন ওই আদেশ দেন।
রিটকারীদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিলা মমতাজ, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. জাহিদুল ইসলাম (জনি) এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. জাকির হোসাইন, মো. হুমায়ুন কবির সিদ্দিকী, মো. তানভীর প্রধান ও শারমিন হামিদ।
রিট আবেদনে বলা হয়, বাউল ও ফকিরদের ওপর নিপীড়ন শুধু তাদের একতারা ভাঙচুর, আখড়ায় হামলা কিংবা তাদের গান নিষিদ্ধ করার ফতোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
আবেদনে দাবি করা হয়, শত শত বাউল, ফকির ও সন্ন্যাসীর চুল ও জটা জোরপূর্বক কেটে দেওয়া হয়েছে। এতে শুধু তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসই লঙ্ঘিত হয়নি, বরং তাদের শারীরিক ও মানবিক মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা তাদের বিমানবিকীকরণের শামিল।
রিটকারীদের অভিযোগ, ওয়াহাবি ও খারিজি মতাদর্শে বিশ্বাসী গোষ্ঠীগুলোর আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের (বাউল-ফকির) শরীরকে বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের ব্যর্থতার মূল্য দিতে হচ্ছে বাউল ও ফকিরদের। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হওয়া দেশের গণতান্ত্রিক চরিত্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা এ ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়নকে আরও উৎসাহিত করেছে।
রিটে আরও বলা হয়, বাউলদের চুল ও জটা কেটে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর যেসব পেজ ভাইরাল হয়েছিল, সেগুলো এখনও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নকে উসকে দিচ্ছে।
নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা শিরীন পারভীন হক, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক আমেনা মহসিন, সুরেশ্বর দরবার শরিফের পীর হাসান শাহ সুরেশ্বরী দীপু নূরী, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, সংগীতশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ানসহ কয়েকজন সচেতন নাগরিকের পক্ষে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এ রিট আবেদন করেন।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় সংস্কারের নামে একদল দুর্বৃত্তের হাতে ফকির, সুফি অনুসারী ও বাউলদের নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর আচরণের শিকার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রিটটি করা হয়।
রিটকারীদের দাবি, এসব ঘটনা এবং তা প্রতিরোধ বা প্রতিকারে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩৫ (৫), ৩৬, ৩৯ (১) ও ৪১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। এসব অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ থেকে সুরক্ষা, চলাচলের স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম পালন, চর্চা ও প্রচারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
