Thursday, July 2, 2026
Homeবাংলাদেশচাঁদ-তারা যেভাবে ইসলামের প্রতীক হলো

চাঁদ-তারা যেভাবে ইসলামের প্রতীক হলো

আকাশে চাঁদ উঠলে সবাই দেখতে পায়—বাংলার এমন প্রবাদ যেন বলে দেয়—আসমানের চাঁদ সবার। অর্থাৎ, সব জাতিগোষ্ঠী পৃথিবীর এই নিকটতম প্রতিবেশীকে অনাদিকাল থেকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। নানা জাতির কাছে নানাভাবে সম্মান পেয়েছে এই ‘স্বর্গীয়’ গোলকটি। নানা জাতি একে ডাকে নানা নামে।

প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে বিভিন্ন জাতির মানুষ চাঁদকে নিয়ে সৃষ্টি করেছে নানা কল্পকথা। শুধু তাই নয়, চাঁদকে শ্রদ্ধা জানাতে গড়ে তোলা হয়েছিল কত না মন্দির। চন্দ্রদেবীর সেসবের মন্দিরের অনেকগুলোই কালের করালগ্রাসে হারিয়ে গেছে। কিছু কিছু বিলুপ্তপ্রায়।

গবেষকরা বলেন—চাঁদ কোনো নির্দিষ্ট একক জাতির প্রতীক নয়। সময়ের বিবর্তনে চাঁদের সঙ্গে তারা যুক্ত হয়েছে মাত্র। অঞ্চল ও বিশ্বাস ভেদে চাঁদ পেয়েছে ভিন্নভিন্ন রূপ। তবে মানব সভ্যতায় চাঁদ কখনো গুরুত্ব হারায়নি। বরং দিনে দিনে তা আরও উদ্ভাসিত হয়েছে।

এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে ৪৮ দেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে মুসলিমপ্রধান দেশ ১৩টি। তবে চার দেশের পতাকায় চাঁদ-তারা দেখেছে বিশ্ববাসী। দেশগুলো হলো: তুরস্ক, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ও উজবেকিস্তান।

ইতিহাস বলছে—ইসলাম-পূর্ব যুগে নানান অঞ্চলে নানান জাতিগোষ্ঠী ও ধর্ম-বিশ্বাসের মানুষ চাঁদ-তারাকে তাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে। এখনো অনেকে তা ব্যবহার করে আসছে।

তবে নানান ঘটনাক্রমে চাঁদ-তারা বর্তমান ইসলামের প্রতীক হয়ে উঠেছে। মসজিদের গম্বুজ, মিনারের চূড়া, অন্যান্য ধর্মীয়প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই প্রতীকটি বিশেষভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মত—ইসলামের প্রতীক হিসেবে চাঁদ-তারার ব্যবহার খুব একটা পুরোনো নয়।

ব্রিটানিকার তথ্য বলছে—মধ্যযুগে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য হিসেবে পরিচিত বাইজেনটাইন ও তুর্কি সাম্রাজ্যে এবং পরবর্তীতে সাধারণভাবে পুরো মুসলিমবিশ্বে রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে চাঁদ-তারার ব্যবহার দেখা যায়।

অর্থাৎ—৩৩০ খ্রিষ্টাব্দে গ্রিক শহর বাইজেনটিয়াম, রোমানরা যাকে কনস্টান্টিনোপল বলে ডাকতো, সেই শহরকে কেন্দ্র করে বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ১৪৫৩ সালে মুসলিম তুর্কিদের হাতে সেই শহরটির পতনের পর নাম নেয় ইস্তানবুল। সেই সঙ্গে অবসান হয় বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের।

ইতিহাসবিদের ভাষ্য: বাইজেনটাইনদের অনেক রীতি বিজয়ী তুর্কিরা আত্মীকরণ করেছিল। সেগুলোর একটি চাঁদ-তারা। খ্রিষ্টানদের কোনো কোনো চিত্রকর্মে বাঁকা চাঁদকে যিশুর দোলনা হিসেবে দেখানো হয়েছে। তখনো যিশুর মা মেরিকে নতুন চাঁদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

অনেকে মনে করেন—খ্রিষ্টানরা চাঁদ-তারা প্রতীকের ব্যবহার প্রাচীন মূতি উপাসক জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল। খ্রিষ্টসমাজে প্রতীক হিসেবে ক্রসের ব্যবহার এসেছে পরে। তাই পরবর্তীতে খ্রিষ্টানদের শিল্পকর্মে চাঁদ-তারার সঙ্গে ক্রস দেখা যায়।

ইতিহাস বলছে—মুসলমানদের হাত থেকে জেরুসালেম শহর পুনর্দখলের জন্য ১০৯৫ সাল থেকে ১২৯১ সালের মধ্যে চলা ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধে খ্রিষ্টান যোদ্ধাদের বহন করা পতাকায় ক্রসের পাশাপাশি চাঁদ-তারাও আঁকা ছিল। মুসলমানদের পতাকায় তা ছিল না।

যুদ্ধ শেষে খ্রিষ্টান যোদ্ধারা ইউরোপে ফিরে গেলে নিজ নিজ দেশে চাঁদ-তারা প্রতীককে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেন। ফ্রান্সসহ কোনো কোনো দেশে তা কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে ক্রস খ্রিষ্টানদের প্রধান প্রতীক হয়ে উঠে।

পরবর্তীতে, খ্রিষ্টান বাইজেনটাইন শাসকদের ক্রস ও চাঁদ-তারা প্রতীকের মধ্যে তুর্কি শাসকরা চাঁদ-তারাকে সরকারি প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে তা পতাকা ও দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করা হয়।

আঠারো ও উনিশ শতকে তুর্কি সুলতান তৃতীয় সেলিম ওসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতীক হিসেবে কৌশলগতভাবে চাঁদ-তারাকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর মাধ্যমে তিনি খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন।

তুরস্কের ওসমানীয় খেলাফত এক পর্যায়ে ইসলামী শাসনব্যবস্থার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠলে চাঁদ-তারা ইসলামের প্রতীক হয়ে উঠে, বলে মনে করেন অনেক ইতিহাসবিদ।

সেই ভাবনা থেকে এই প্রতীকটি স্থান পায় তুরস্কের পতাকায়; ব্যবহৃত হয় মসজিদের গম্বুজ, মিনার ও মিম্বরে। শুধু তুরস্ক নয়, ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এমন কয়েকটি স্বাধীন মুসলিম দেশও তাদের পতাকায় প্রতীক হিসেবে চাঁদ-তারাকে গ্রহণ করে।

পুরোনো কিছু যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্রকর্মে শিল্পীরা মুসলিম শাসক ও সেনাপতিদের হাতের পতাকা এবং পরনের বর্ম ও শিরস্ত্রাণে চাঁদ ও চাঁদ-তারা যুক্ত করলেও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য—বাস্তবে তা তেমনটি ছিল না। প্রতীকটি এত শক্তিশালী ছিল যে তা পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের প্রভাবিত করেছিল।

তবে মুসলমানরা নতুন চাঁদ হিসেবে যে ছবিটি ব্যবহার করে, তা আসলে পুরোনো চাঁদ বা কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ। কেননা, এটি দেখতে ইংরেজি ‘সি’ বর্ণের মতো। পরিক্রমণ হিসাবে তা চাঁদের শেষ সময়ের ছবি।

অনেক অমুসলিম দেশও তাদের জাতীয় পতাকায় নিজ নিজ ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে আসছে।

২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর পিউ রিসার্চ জানায়—১৯৬ দেশের মধ্যে ৬৪টির জাতীয় পতাকায় ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করা।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩১ দেশের জাতীয় পতাকায় খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় প্রতীক ক্রস ও অন্যান্য চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। ইসলামী প্রতীক হিসেবে চাঁদ-তারা ব্যবহার করা হয় ২১ দেশে।

তবে মুসলিম দেশগুলোর পতাকায় চাঁদ-তারার গঠন ও অবস্থান এক রকম নয়।

অন্যদিকে, নেপালের ত্রিকোণাকৃতির পতাকায় চাঁদ-তারা হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হলেও সিঙ্গাপুরের পতাকায় থাকা চাঁদ-তারাকে কোনো ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে গণ্য হয় না।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এই নগররাষ্ট্রটির পতাকার চাঁদ ‘নতুন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং, এর পাঁচটি তারা—গণতন্ত্র, শান্তি, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও সাম্যের ভাবনা বহন করে’—দাবি সিঙ্গাপুর সরকারের।

কম্বোডিয়ার পতাকায় অ্যাঙ্কর ওয়াট মন্দিরের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে জড়িত। ভারতের পতাকায় ব্যবহৃত ‘চক্র’ হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

ইহুদিদের পবিত্র প্রতীক ‘ডেভিড স্টার’ ব্যবহার করা হয়েছে ইসরায়েলের জাতীয় পতাকায়। এর সাদা ও নীল পটভূমিকে ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীটির ঐতিহ্যবাহী প্রার্থনা শাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জাপানের পতাকায় ‘হিনোমারু’ বা ‘উদীয়মান সূর্য’ দেশটির প্রাচীন আধ্যাত্মিক ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করে।

উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার পতাকায় ব্যবহৃত সোনালি সূর্য ইনকা জাতিগোষ্ঠীর ‘সূর্য দেবতা’ ইনতির ছবি।

যুক্তরাষ্ট্রের পতাকায় ধর্মীয় প্রতীক না থাকলেও দেশটির ফ্লোরিডা ও আলাবামা অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব পতাকায় ক্রস ব্যবহার করা হয়েছে।

আরবি দিনপঞ্জি গোনা হয় চাঁদের ওপর নির্ভর করে। কৃষিকাজের জন্য সূর্য ও ঋতু বৈচিত্র্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু, বেদুইন বা যাযাবর আরবদের তেমন কোনো কৃষিকাজ ছিল না। ঊষর মরুভূমিতে রাতে চলাচল করতে প্রাচীনকালে আরবরা চাঁদ-তারার অবস্থানকে দেখে নিতো।

ইসলামপূর্ব যুগে আরব জ্যোতির্বিদরা চাঁদের ওপর ভিত্তি করে যে দিনপঞ্জি তৈরি করেছিলেন তা মেনে চলা আরব বেদুইনদের জন্য খুবই সহজ হয়। তাদের ব্যবহারিক জীবনে চাঁদের হিসাব রাখা সহজ। এক চাঁদ থেকে আরেক চাঁদের ২৯ বা ৩০ দিনের হিসাবে তারা দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

ইসলাম-পরবর্তী যুগেও আরব দেশে সেই চাঁদ-ভিত্তিক দিন-গণনা গ্রহণযোগ্যতা পায়। চাঁদ দেখে মুসলমানরা রোজা ও হজের প্রস্তুতি নেন। পরবর্তীতে, অনারব মুসলমানরাও সেই রীতি মেনে চলে।

ইতিহাস বলছে—ইসলামের প্রথম যুগে প্রতীক হিসেবে চাঁদ বা চাঁদ-তারার ব্যবহার ছিল না। আরব বণিক ও শাসকরা নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে তারা ভিন্ন ধর্মের বিশ্বাসীদের মধ্যে চাঁদ-তারার ব্যবহার দেখতে পায়। এটি আরবদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলে যায়।

অন্যদিকে, ইসলামের অনুসারীরা চান্দ্রমাস ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা একে সাংঘষিক না ভেবে সম্প্রীতির অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

ঐতিহাসিকদের ভাষ্য: ইসলামের প্রথমদিকে যুদ্ধের সময় মুসলমানরা সাধারণত এক রঙা পতাকা ব্যবহার করতেন। পতাকাগুলোয় কোনো প্রতীক থাকতো না।

ব্রিটানিকা বলছে—শুক্লপক্ষের বা নতুন চাঁদ সুপ্রাচীনকাল থেকে ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিকটপ্রাচ্য বা মধ্যপ্রাচ্য হিসেবে সুপরিচিত পশ্চিম এশিয়ায় চাঁদকে দেবী ‘আসতারতে’ বলে গণ্য করা হতো। কালক্রমে সেই প্রতীক খ্রিষ্টান বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

বলা হয়ে থাকে—কোনো এক নতুন চাঁদের আবির্ভাবের সময় কনসটানটিনোপল শহর এক আচমকা হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। অনেকের বিশ্বাস চাঁদ শহরটিকে রক্ষা করেছে।

এরপর ১৪৫৩ সালে ওসমানীয় তুর্কিরা কনসটানটিনোপল দখলে নিয়ে খ্রিষ্টানদের নতুন চাঁদ প্রতীকটিকে তাদের নিজেদের পতাকায় যুক্ত করে।

ব্রিটানিকার তথ্য আরও বলছে—পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনসটানটিনোপল তুর্কিদের দখলে যাওয়ার অন্তত ১০০ বছর আগে অর্থাৎ, সুলতান ওরহানের (১৩২৪-১৩৬০ খ্রিষ্টাব্দ) অধীনে পদাতিক বাহিনী চাঁদ-তারা প্রতীক ব্যবহার করেছে।

ধরে নেওয়া যায়, বিভিন্ন সময় অঞ্চল ভেদে প্রতীক হিসেবে চাঁদ-তারা ব্যবহারের কারণ ভিন্ন ছিল।

ওসমানীয় সাম্রাজ্যের স্থল ও নৌবাহিনী চাঁদ-তারা প্রতীক ব্যবহার করতো। পরে সেই প্রতীক মসজিদের মিনারগুলোয় ব্যবহার হয়।

গবেষকরা বলছেন—ইউরোপে গির্জার গম্বুজে ক্রস ব্যবহার করতে দেখে তুর্কি শাসকরা তাদের জয় করা অঞ্চলে মসজিদের গম্বুজ ও পরবর্তীতে মিনার-চূড়ায় ‘হিলাল’ বা নতুন চাঁদ ও ‘সিতারা-হিলাল’ বা চাঁদ-তারাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।

পরে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলোয় সৃষ্ট স্বাধীন মুসলিম দেশ এবং পরে ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন হওয়া মুসলিম দেশেও চাঁদ-তারাকে ইসলামের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রয় কাসাগ্রান্ডা বলেন, ‘নতুন চাঁদ অবশ্যই ওসমানীয় তুর্কিদের প্রতীক। কিন্তু, পাকিস্তানের পতাকায় চাঁদ-তারা কেন? কারণ, এটি এখন ইসলামের প্রতীক। এটি একসময় কনসটানটিনোপল শহরের প্রতীক ছিল।’

‘মুসলমান তুর্কিরা যখন শহরটি দখল করে নেয় তখন চাঁদ-তারা ছিল কনসটানটিনোপল শহরের প্রতীক। তুর্কিরা সেই প্রতীকটিকে নিজেদের করে নেয়।’

ইতিহাস থেকে জানা যায়—প্রাচীনকাল থেকেই যাযাবর মোঙ্গলরা তাদের চলাচলের জন্য চাঁদ-তারার অবস্থান দেখে নিতো। তাদের উত্তরপুরুষ তুর্কিরা সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। তুর্কিরা ইসলাম গ্রহণের পর চাঁদ-তারাকে একটি সর্বজনীন ঐতিহ্য হিসেবে মেনে নেয়।

তাই বিজয়ী তুর্কিরা কনসটানটিনোপলের খ্রিষ্টানদের চাঁদ-তারা প্রতীককে প্রত্যাখ্যান না করে বরং আপন করে নিয়েছিল। কারও কারও মতে, তুর্কিরা পরাজিত খ্রিষ্টানদের সঙ্গে সখ্যতা বাড়াতে তাদের ব্যবহৃত চাঁদ ও চাঁদ-তারা প্রতীককে গ্রহণ করেছিল।

এবং নতুন নতুন জয় করা অঞ্চলের খ্রিষ্টান বাসিন্দাদের মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে মুসলিম তুর্কিরা চাঁদ-তারা প্রতীকের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছিল।

শুধু মোঙ্গল বা তুর্কি নয়, প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যেও চাঁদ ও চাঁদ-তারার ব্যবহার ছিল। সেখানকার ধাতব মুদ্রাগুলোয় এর নজির দেখা যায়। বরং মুসলিম আরবরা প্রতিবেশী পারস্য জয় করলে সেখানে চাঁদ-তারার ব্যবহার কিছুটা কমে যায়। কেননা, প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে ইসলামে কোনো নির্দেশনা নেই।

ব্রিটেনের চেস্টার শহরের ফ্ল্যাগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক উইলিয়াম জি ক্র্যাম্পটন বলেন—বর্তমানে নতুন চাঁদকে বহুলভাবে ইসলামের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হলেও আদতে এটি পুরোপুরিভাবে এই ধর্মের প্রতীক কখনোই ছিল না।

মানবসভ্যতার আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত ইরাকের ব্যাবিলন থেকে চাঁদ-তারা প্রতীকের ব্যবহার পরবর্তীতে খ্রিষ্টানরা গ্রহণ করে।

স্মরণ করা যেতে পারে যে, খ্রিষ্টপূর্ব ২১০০ শতকে মেসোপটেমিয়া বা আজকের ইরাকের রাজা উর নামু-এর এক ফলকে চাঁদ-তারার ব্যবহার দেখা গেছে।

উইলিয়াম জি ক্র্যাম্পটন মনে করেন, উনিশ শতকের শেষের দিকে প্যান-ইসলাম আন্দোলনে তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ নতুন চাঁদকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করলে তা ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বাইরে জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা রেডক্রসের সঙ্গে রেড ক্রিসেন্ট শব্দটি জুড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ওসমানীয় তুর্কিদের অবদান আছে।

১৮৭৬ সালে শুরু হওয়া দুই বছরের রুশ-তুর্কি যুদ্ধে রেডক্রসের সদস্যদের সেবা নিতে তুর্কি সেনারা আপত্তি জানায়। ১৯০৬ রেড ক্রিসেন্ট শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণ করা হয়।

এরপর নতুন চাঁদ আরও পোক্তভাবে ইসলামের প্রতীক হয়ে উঠে।

 

Most Popular