Thursday, July 2, 2026
Homeবিদেশস্বীকৃতি নেই, যেভাবে আফগানিস্তানের গ্রামীণ জীবনকে টিকিয়ে রেখেছেন নারীরা

স্বীকৃতি নেই, যেভাবে আফগানিস্তানের গ্রামীণ জীবনকে টিকিয়ে রেখেছেন নারীরা

তুষারাবৃত পাহাড়ে ঘেরা উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানের একটি প্রত্যন্ত প্রদেশে নিজেদের সম্প্রদায়ের টিকে থাকার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন নারী কৃষকেরা।

এএফপি বলছে, জুন মাসে এশতিউই গ্রামের মাঠগুলোতে ফসলের অঙ্কুরোদ্গমের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায়। গ্রামের চারপাশে মাটি ভেদ করে ছোট ছোট সবুজ চারা মাথা তুলে।

এমন এক সময়েই আগাছা পরিষ্কারের কাজ করতে করতে এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাবিবা জানান, নুরিস্তান প্রদেশে কয়েক দশক ধরে কৃষিকাজ করে আসতে পেরে তিনি গর্বিত।

৪৬ বছর বয়সী হাবিবা বলেন, ‘আট বছর বয়স থেকেই মায়ের সঙ্গে মাঠে যেতাম।’

তিনি বলেন, ‘শরৎকালে যখন আমরা গম, শিম, আলু ও ভুট্টা তুলে বাড়িতে আনি, তখন খুব আনন্দ লাগে।’

আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের অধীনে নারীরা অধিকাংশ পেশায় নিষিদ্ধ হলেও তাদের কৃষিকাজ করার সুযোগ এখনও রয়েছে।

৩৪ বছর বয়সী কৃষিবিদ মোহাম্মদ ইয়াহিয়া ফাইজির মতে, নারীদের এই শ্রমের প্রতি সবারই শ্রদ্ধা থাকা উচিত।

তিনি বলেন, ‘নারীরা কাজ না করলে শীতের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের আর খাবারই থাকত না।’

গ্রীষ্মকালেই কেবল কাঁচা রাস্তা দিয়ে এশতিউই গ্রামটিতে পৌঁছানো যায়। এএফপির সফরের আগে বহু বছর ধরে কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সেখানে যায়নি।

ফাইজি জানান, পারুন উপত্যকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারী ও পুরুষের কাজ ভাগ করে নেওয়ার একটি ঐতিহ্য রয়েছে। এখানকার বাসিন্দারা নিজেদের স্বতন্ত্র উপভাষায় কথা বলেন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও কাজ করা এই কৃষক বলেন, ‘নারীরা কৃষিকাজ, বীজ বপন, সেচ ও গৃহস্থালির রান্নাবান্নায় ব্যস্ত থাকেন।’

অন্যদিকে পুরুষেরা পশুচালিত লাঙল ব্যবহার, গবাদিপশুর দেখভাল এবং শীতের জন্য জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কাজ করেন।

তুষারপাতের কারণে বছরের প্রায় ছয় মাস গ্রামটি বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থাকে।

হাবিবার দিন শুরু হয় ভোর চারটায়। নামাজ আদায়ের পর মেয়েদের নিয়ে কাঠের চুলায় নাশতা তৈরি করেন তিনি।

নিজের উৎপাদিত গমের আটা দিয়ে রুটি বানান তিনি। সঙ্গে থাকে নিজের ক্ষেতের লাল শিম, আর স্বামীর তৈরি মাখন ও শুকনো দই।

যে ঘরটি রান্নাঘর ও শোবার ঘর—দুই কাজেই ব্যবহৃত হয়, সেটির দেয়ালে ফুল এঁকেছে হাবিবার ১১ বছর বয়সী মেয়ে নাহিদা। গ্রামের স্কুলে শেখা ইংরেজিও অনুশীলন করছে সে।

হাবিবা কখনও স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি। আর নাহিদার শিক্ষাজীবনও শিগগিরই থেমে যাবে, কারণ সারা দেশে ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

স্বীকৃতিহীন অবদান

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারী কৃষকদের অপরিহার্য ভূমিকা তুলে ধরে এফএও ২০২৬ সালকে ‘আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সংস্থাটি বলছে, নারী কৃষকদের অবদান এখনও যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।

আফগানিস্তানে এই বাস্তবতা আরও প্রকট। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন।

৭০ বছর বয়সী বিবি জান, যিনি শিম ও আলু চাষ করেন, বলেন কৃষিকাজ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, হাতে চামড়া উঠে যায়… কিন্তু সন্তানদের তো খাওয়াতে হবে।’

হাবিবার স্বপ্ন একটি ট্রাক্টর কেনার। কিন্তু সেটি তার সামর্থ্যের বাইরে। পুরো গ্রামে মাত্র একটি ট্রাক্টর রয়েছে, যা একটি পরিবার ভাড়া দেয়।

তিনি বলেন, ‘আমি আর তেমন শক্তিশালী নই। পিঠ ও পায়ে ব্যথা করে।’

গোপনীয়তার স্বার্থে পদবি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানো ২৮ বছর বয়সী নাজিয়া বলেন, স্থানীয় কৃষকদের আরও যন্ত্রপাতি ও পণ্য বিক্রির সুযোগ প্রয়োজন।

পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা নাজিয়ার ভাষায়, ‘কৃষিকাজ একটি মহান পেশা; এটি শুধু পুরুষদের জন্য নয়।’

তিনি বলেন, অনেক সময় কৃষকদের উদ্বৃত্ত ফসল থাকে, কিন্তু তা বিক্রির জন্য কোনো সুসংগঠিত বাজার নেই।

প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসের কারণে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। মাঝেমধ্যে যেসব ব্যবসায়ী এ পথে যাতায়াত করেন, তাদের সঙ্গেই কেবল যোগাযোগের সুযোগ মেলে।

নাজিয়া বলেন, ‘আমি সাত কেজি আলু ৭০ আফগানি (প্রায় ১ দশমিক ১০ ডলার) দামে বিক্রি করি। কিন্তু সম্মানজনক আয় করতে হলে অন্তত ১৫০ আফগানি মুদ্রা দরকার।’

জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চ্যালেঞ্জ

জাতিসংঘের অর্থায়নে নির্মিত সংরক্ষণাগারগুলো কৃষকদের ফসল মজুত রাখতে সাহায্য করছে, যাতে বাজারদর ভালো হলে পরে বিক্রি করা যায়। কিছু নারী উন্নত মানের বীজও পেয়েছেন।

এফএও কৃষিজমিতে একইসঙ্গে গাছ ও ফসল চাষের ‘অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি’ পদ্ধতি চালু করেছে, যাতে আয়ের উৎস বৈচিত্র্যময় হয়।

ফাইজি বলেন, একসময় গ্রামটিতে শুধু আপেল ও আখরোট উৎপাদিত হতো। এখন সেখানে চেরি, নাশপাতি ও পিচসহ নানা ফলের গাছ রয়েছে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুষারপাত ও বৃষ্টিপাতের ধরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, আবার হঠাৎ বন্যায়ও ফসল নষ্ট হচ্ছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বলেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে কম অবদান রাখা দেশগুলোর অন্যতম আফগানিস্তান, অথচ এর সবচেয়ে বড় ক্ষতিও তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।

নাজিয়া বলেন, ‘আবহাওয়া এখন আর আগাম বোঝা যায় না; হঠাৎ করেই আঘাত হানে।’

তবুও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নারীরা একসঙ্গে মাঠে কাজ করতে ভালোবাসেন বলে জানান তিনি।

‘আমরা একে অন্যকে সাহায্য করতে পারি,’ বলেন নাজিয়া। একইসঙ্গে তারা গ্রামের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যও নিশ্চিত করছেন।

তার ভাষায়, ‘আমাদের নিজের হাতে উৎপাদিত খাবার খুবই স্বাস্থ্যকর।’

Most Popular