Thursday, July 2, 2026
Homeঅর্থনীতিঋণ নয়, এখন সরকারি সিকিউরিটিতেই ব্যাংকের বেশি আয়

ঋণ নয়, এখন সরকারি সিকিউরিটিতেই ব্যাংকের বেশি আয়

২০২১ সালেও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল ঋণ বিতরণ। কিন্তু মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সেই চিরচেনা চিত্র পুরোপুরি উল্টে গেছে। এখন আর ঋণ নয়, বরং সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগেই মুনাফা বেশি হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সুদভিত্তিক আয় (নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম) ক্রমেই চাপে পড়েছে। একই সময়ে আমদানি কমে যাওয়ায় এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলাসহ বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা থেকে কমিশন আয়ও কমেছে।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে এবং মুনাফার ধারা বজায় রাখতে ব্যাংকগুলো এখন আর ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। এর বদলে তারা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড, যেখানে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই মিলছে চড়া সুদ।

কাগজে-কলমে ব্যাংকগুলোকে এখন বেশ লাভজনক দেখাচ্ছে। কারণ কোনো ঋণ-ঝুঁকি ছাড়াই তারা সরকারি সিকিউরিটি থেকে বিপুল মুনাফা তুলে নিচ্ছে। 

তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলছেন, এই সাময়িক লাভের পেছনে দুটি বড় বিপদ লুকিয়ে আছে।

প্রথমত, ব্যাংকগুলো যদি মূল ব্যবসা ঋণ দেওয়া ছেড়ে কেবল সরকারকে টাকা ধার দেওয়াকেই অগ্রাধিকার দেয়, তবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি ধীর হয়ে পড়বে।

দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে যদি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার কমে যায়, তখন ব্যাংকগুলোর পক্ষে এই আয়ের ধারা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

দ্রুত বদলে গেছে ব্যাংকের আয়ের ধরন

২০২১ সালে দেশের ৫২টি প্রধান ব্যাংকের মোট আয় ছিল ৪০ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা।

এর মধ্যে মোট আয়ের ৪৭ শতাংশ এসেছিল ঋণের সুদ থেকে। সরকারি সিকিউরিটিসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে এসেছিল ৩৪ শতাংশ। বাকি ১৯ শতাংশ ছিল কমিশনভিত্তিক আয়। এসব তথ্য পাওয়া গেছে ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন থেকে।

২০২২ সালে বিনিয়োগ থেকে আয় বাড়লেও তা তখনও সুদ আয়ের চেয়ে কম ছিল। ২০২৩ সালেও আয়ের কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি।

তবে ২০২৪ সালে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ওই বছর প্রথমবারের মতো সুদ আয়ের চেয়ে বিনিয়োগ থেকে আয় বেশি হয় এবং সেটিই ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় আয়ের উৎসে পরিণত হয়।

আর ২০২৫ সালে এসে তো মূল ব্যাংকিং ব্যবসা বা নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম মোট আয়ের মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। বিপরীতে, বিনিয়োগ থেকে আয় এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট আয়ের ৭৩ শতাংশে। বাকি প্রায় ২০ শতাংশ এসেছে কমিশন থেকে। 

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এই প্রবণতাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছেন যে ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমতে শুরু করলেই ব্যাংকগুলো বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

আয়ের এই পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আমানতের বিপরীতে সুদের খরচ এবং ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বাড়ায় ঋণের মুনাফার মার্জিন কমে গেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ ঋণের বিপরীতে ব্যাংক কোনো সুদ পাচ্ছে না, অথচ আমানতকারীদের ঠিকই সুদ গুনে যেতে হচ্ছে।

তিনি আরও যোগ করেন, একটি ব্যাংকের প্রধান আয় হওয়া উচিত ঋণ বিতরণ থেকে। কিন্তু খেলাপি ঋণের বোঝা ব্যাংকগুলোকে পঙ্গু করে দিয়েছে। একই সাথে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য কমে যাওয়ায় কমিশন এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের মুনাফাও উধাও হয়ে গেছে। 

তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে মূল ব্যবসায় ফিরতেই হবে, তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে এর কোনো লক্ষণ দেখছি না।

বিনিয়োগ ও অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ

ত তিন বছর ধরে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ঋণ ব্যবসার আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। এমনকি ২০২৫ সালে কমিশন আয়ও আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে। বিপরীতে গত পাঁচ বছর ধরে কেবল সরকারি বন্ডের আয়ই ঊর্ধ্বমুখী। 

শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মনিরুল ইসলাম বলেন, ট্রেজারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলোর স্পষ্ট প্রণোদনা ছিল। কারণ সেখানে ভালো মুনাফা পাওয়া যাচ্ছিল, অথচ ঋণ দেওয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এ কারণেই বিনিয়োগ থেকে আয় বেড়েছে।

তার ভাষায়, ব্যাংক স্বাভাবিকভাবেই এমন খাতে অর্থ বিনিয়োগ করবে, যেখানে কম ঝুঁকিতে বেশি মুনাফা পাওয়া যায়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যাংকগুলো যদি ঋণ দেওয়ার বদলে সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ সীমিত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীর হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, ট্রেজারি সিকিউরিটির সুদের হার যত দিন বেশি থাকবে, তত দিন ব্যাংকগুলো ভালো মুনাফা করতে পারবে। পরে সুদের হার কমতে শুরু করলে শুরুতে ট্রেজারি বন্ড থেকে মূলধনী মুনাফা (ক্যাপিটাল গেইন) মিলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর মোট আয়ও কমে আসবে।

তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরালো না হলে বর্তমানে সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করা বিপুল অর্থ উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে ঋণ হিসেবে স্থানান্তর করা ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হবে।

কমিশন আয় কমে যাওয়ার বিষয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, আমদানি ও রপ্তানি—দুটিই দুর্বল থাকায় বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট ফি ও কমিশন কমেছে। এছাড়া শেয়ারবাজারে লেনদেন তলানিতে নামায় যেসব ব্যাংকের নিজস্ব ব্রোকারেজ হাউস আছে, তাদের কমিশনও কমেছে। তবে চলতি বছরে এই কমিশন আয় কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯৬০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে আরও কমে হয় ৫৭৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ৫৬৬ কোটি টাকায়। আর ২০২৫ সালে দৈনিক গড় লেনদেন আরও কমে মাত্র ৫১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

 

Most Popular