Wednesday, July 1, 2026
Homeবিদেশট্রাম্পের ক্রিপ্টো উদ্যোগ ও ইরানের এক্সচেঞ্জ একই নেটওয়ার্কে যেভাবে

ট্রাম্পের ক্রিপ্টো উদ্যোগ ও ইরানের এক্সচেঞ্জ একই নেটওয়ার্কে যেভাবে

ইরানের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের গ্রাহকদের যখন বিলিয়ন ডলার সরাতে হয়েছে, তখন তারা ক্রিপ্টো জগতের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে গড়া দুটি নেটওয়ার্কের আশ্রয় নিয়েছে।

সেই দুই ব্যক্তিই আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান ক্রিপ্টো উদ্যোগেরও বড় সমর্থক।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে ইরানের নোবিটেক্স এক্সচেঞ্জ ট্রন ও বিএনবি চেইনের মাধ্যমে অন্তত ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করেছে।

এই দুটি ব্লকচেইন গড়ে তুলেছেন যথাক্রমে ক্রিপ্টো ধনকুবের জাস্টিন সান ও চ্যাংপেং ঝাও।

ব্লকচেইন হলো একধরনের উন্মুক্ত ডিজিটাল খাতা, যেখানে সব লেনদেনের তথ্য নিরাপদে সংরক্ষিত থাকে এবং কেউ চাইলেই তা পরিবর্তন করতে পারে না। এই নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য ব্যবহারকারীরা ফি দেন।

ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালেও ওই দুটি ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরানি অর্থের প্রবাহ থামেনি।

সান এবং ঝাওয়ের মালিকানাধীন বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স, দুজনই ট্রাম্প ও তার পরিবারের সহপ্রতিষ্ঠিত ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক।

তবে ট্রাম্প পরিবার যে নোবিটেক্সের এই লেনদেনের বিষয়ে জানত, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবুও এই লেনদেনগুলো একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে, ট্রাম্প পরিবারের বিস্তৃত ব্যবসায়িক স্বার্থ কি প্রেসিডেন্ট পদকে সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাতের মুখে ফেলছে? পরিবার-নিয়ন্ত্রিত ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য এখনো বিদেশি চুক্তির খোঁজ করে যাচ্ছে।

সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ইন্টারনেট এনফোর্সমেন্ট দপ্তরের সাবেক প্রধান জন রিড স্টার্ক এটাকে বলছেন ‘একটি নাটকীয় বিদ্রূপ’।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘যেসব সত্তা এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে ক্রিপ্টো অর্থায়ন করছে, প্রেসিডেন্ট যুদ্ধক্ষেত্রে মূলত তাদেরই পরাজিত করার চেষ্টা করছেন।’

হোয়াইট হাউস অবশ্য এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার রয়টার্সের এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ হাস্যকর।’

আরও প্রশ্নের জন্য তিনি রয়টার্সকে ওয়ার্ল্ড লিবার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

ওয়ার্ল্ড লিবার্টির মুখপাত্র বলেন, নোবিটেক্সের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের আইন মেনে চলে।

তিনি আরও বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি কোনোভাবেই ট্রনের মালিক নয়, এটি পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণও করে না এবং এর মাধ্যমে পরিচালিত লেনদেনের ওপর তাদের কোনো কর্তৃত্ব নেই।’

ক্রিপ্টো বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান আরখামের উন্মুক্ত ব্লকচেইন তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স দেখেছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ নাগরিকদের বহুল ব্যবহৃত নোবিটেক্স ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ট্রনের মাধ্যমে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি লেনদেন করেছে।

একই সময়ে বিএনবি চেইনের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে আরও অন্তত ৩১৭ মিলিয়ন ডলার। বিএনবি চেইনের পূর্ব নাম ছিল বাইন্যান্স স্মার্ট চেইন।

ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেও লেনদেন থামেনি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিএনবি চেইনে অন্তত ২ কোটি ২৬ লাখ ডলার এবং ট্রনের মাধ্যমে অন্তত ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের ক্রিপ্টো লেনদেন হয়েছে নোবিটেক্সের মাধ্যমে।

চারজন ক্রিপ্টো বিশ্লেষক, যাদের মধ্যে দুজন ইরানের ডিজিটাল সম্পদ কার্যক্রম বিশেষজ্ঞ, রয়টার্সের এই হিসাব যাচাই করেছেন। সবাই এটিকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।

তবে প্রকৃত লেনদেনের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করেন স্বাধীন গবেষক রিচ স্যান্ডার্স। কারণ কেবল নোবিটেক্সের মালিকানাধীন বলে পরিচিত ওয়ালেটগুলোর তথ্যই দেখা যাচ্ছে। আর নোবিটেক্স নিজেই প্রকাশ্যে জানিয়েছে, লেনদেন শনাক্ত ও আটকে দেওয়া কঠিন করতে তারা নিয়মিত ঠিকানা বদলায়।

গত ১ মে রয়টার্স জানায়, নোবিটেক্স নিয়ন্ত্রণ করেন ইরানের এক প্রভাবশালী পরিবারের দুই ভাই, যাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটি একটি ছোট স্টার্টআপ থেকে পরিণত হয়েছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সমান্তরাল ইরানি আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে।

রয়টার্সের আগের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, এর ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি।

২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নোবিটেক্স ও বাইন্যান্সের মধ্যে প্রায় ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো লেনদেন হয়েছে বলে ২০২২ সালেই জানিয়েছিল রয়টার্স। সেই অর্থের চার ভাগের প্রায় তিনভাগই ছিল ট্রনের ক্রিপ্টোকারেন্সিতে।

নোবিটেক্স তাদের গ্রাহকদের ট্রনের ক্রিপ্টো ব্যবহারে উৎসাহিত করত বলেও জানা গেছে। কারণ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়িয়ে গোপনে লেনদেন করতে এটি সুবিধাজনক।

রয়টার্সের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাইন্যান্স ও বিএনবি চেইনের মুখপাত্ররা বলেন, বাইন্যান্স বিএনবি চেইন পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করে না।

বিএনবি চেইনের মুখপাত্র আনা নিকোয়ারা বলেন, ‘বিএনবি চেইন একটি উন্মুক্ত ও অনুমতিবিহীন ব্লকচেইন, যা বৈশ্বিক স্বাধীন ভ্যালিডেটর সম্প্রদায় পরিচালনা করে। এটি কোনো এক্সচেঞ্জ নয়, কোনো কোম্পানিও নয় এবং বাইন্যান্সও নয়।’

বাইন্যান্সের মুখপাত্র বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বিএনবি চেইনের ‘প্রাথমিক অবদানকারী ও ইনকিউবেটর’ হিসেবে কাজ করেছে এবং শুরুতে পরিচালনাগত সহায়তা দিয়েছে। তবে আবুধাবির করপোরেট নথিতে বাইন্যান্স ও বিএনবি চেইন টেকনোলজির মধ্যে চলমান সম্পর্কের প্রমাণ মিলেছে।

নোবিটেক্সের ট্রন ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রনের মুখপাত্র বলেন, তারা কেবল প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং ‘প্রত্যেক ব্যবহারকারী ও প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করা’ তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কাজ করে এমন একটি উদ্যোগ গড়তে সহায়তা করেছেন বলে ওই মুখপাত্র জানান।

তার দাবি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ‘শত শত মিলিয়ন ডলার’ জব্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তহবিলও রয়েছে।

নোবিটেক্স নিজে ইরান সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বা রাষ্ট্রকে সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ, ইরান সরকার এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

স্যান্ডার্সসহ অপর ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ট্রন ও বিএনবি চেইনের ব্যবহারকারীদের মধ্যে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আছে। আইআরজিসি ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ট্রনের মাধ্যমে ওই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫০ কোটি ডলারের বেশি টেথার কিনেছে।

২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নোবিটেক্স নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েক কোটি থেকে কয়েক শ কোটি ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নোবিটেক্স তাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে, এটি ট্রন ও বিএনবি চেইন জানত কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

এই পরিস্থিতিতে টেথার জানিয়েছে, ইসরায়েলের অনুরোধে তারা নোবিটেক্স-সংশ্লিষ্ট একাধিক ওয়ালেট ঠিকানা জব্দ করেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ক্রিপ্টোর প্রতি তার সমর্থন ট্রাম্প পরিবার, সান এবং ঝাওয়ের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎকে নতুন গতি দিয়েছে।

ট্রাম্প পরিবারের সদস্যরা ওয়ার্ল্ড লিবার্টিসহ একাধিক ক্রিপ্টো ব্যবসা চালু করেছেন। এগুলো ২০২৫ সালে কয়েক শ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে যাত্রা শুরুর পর যখন ওয়ার্ল্ড লিবার্টি বিনিয়োগকারী টানতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন সান ডব্লিউএলএফআই টোকেনে কয়েক কোটি ডলার ঢালেন। এতে স্টার্টআপটি টিকে যায়।

২০২৫ সালের শুরুতে আবুধাবিভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এমজিএক্স বাইন্যান্সে ২ বিলিয়ন ডলারের অংশীদারত্ব কেনে।

ওয়ার্ল্ড লিবার্টি তখন ঘোষণা দেয়, এই লেনদেন হবে তাদের ইউএসডি১ স্টেবলকয়েনের মাধ্যমে। বাইন্যান্সের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে নতুন এই টোকেন বাড়তি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে। এমজিএক্স জানিয়েছে, বিভিন্ন স্টেবলকয়েন যাচাই করে তারা ইউএসডি১ বেছে নিয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প বাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী ঝাওকে ক্ষমা করে দেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প একের পর এক ক্রিপ্টোবান্ধব নীতি নিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অনেক পদক্ষেপ স্থগিত রেখেছে।

মার্চে প্রতারণার অভিযোগে সানের বিরুদ্ধে করা মামলার নিষ্পত্তি করে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। ১ কোটি ডলার জরিমানা দিলেও সান কোনো অপরাধ স্বীকার করেননি।

তবে সম্প্রতি সান ও ওয়ার্ল্ড লিবার্টির সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। এপ্রিলে সান ওয়ার্ল্ড লিবার্টির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি তাকে তাদের স্টেবলকয়েনে বিনিয়োগ করতে চাপ দিয়ে চাঁদাবাজির চেষ্টা করেছে। জবাবে মে মাসের শুরুতে ওয়ার্ল্ড লিবার্টি মানহানির অভিযোগে পাল্টা মামলা করে।

এখন সানের হাতে আছে ৪ বিলিয়ন ডব্লিউএলএফআই টোকেন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। তিনি ট্রাম্পের মিম কয়েনেও বিনিয়োগ করেছেন এবং তার বিভিন্ন ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মে ইউএসডি১-এর প্রসার ঘটিয়েছেন।

অন্যদিকে বাইন্যান্স ইউএসডি১-কে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, অন্য ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে এর লেনদেনের সুযোগ তৈরি করেছে এবং ব্যবহারকারীদের এটি ধরে রাখতে উৎসাহিত করছে।

আরখামের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাইন্যান্সের কাছে ট্রাম্প-সংশ্লিষ্ট টোকেনের মূল্য ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।

Most Popular