Sunday, June 14, 2026
Homeখেলা১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের দেশ কুরাসাও কীভাবে পৌঁছাল বিশ্বকাপে?

১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের দেশ কুরাসাও কীভাবে পৌঁছাল বিশ্বকাপে?

১৮ নভেম্বর, ২০২৫। কিংস্টন।

কনকাকাফ অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। স্বাগতিক জ্যামাইকার মুখোমুখি কুরাসাও। দুই দলের জন্য সমীকরণটা ছিল একদম পরিষ্কার— জ্যামাইকাকে জিততেই হবে, কুরাসাওয়ের দরকার কেবল হার এড়ানো।

কোচ স্টিভ ম্যাকলারেনের জ্যামাইকা পিছিয়ে ছিল এক পয়েন্টে। জয় ছাড়া ১৯৯৮ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে ওঠার কোনো পথ ছিল না তাদের সামনে।

অন্যদিকে, কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের কুরাসাওয়ের চাওয়া ছিল স্রেফ এক পয়েন্ট। তাহলেই প্রথমবারের মতো মিলবে পরম আরাধ্য বিশ্বকাপের টিকিট!

শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য ড্র হয় ম্যাচটি। আর তাতেই বাজিমাত।

মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার জনসংখ্যার এক ক্ষুদ্র ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য এ এক অবিশ্বাস্য অর্জন। ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিল স্রেফ ৪৪৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের কুরাসাও— মাত্র ১৫ বছরের পথচলায়।

কোথায় এই কুরাসাও?

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে প্রায় ৪০ মাইল উত্তরে ক্যারিবিয়ান সাগরে অবস্থিত কুরাসাও। তবে এটি মূলত ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ।

দেশটির সরকারি ভাষা তিনটি— ডাচ, ইংরেজি ও পর্তুগিজভিত্তিক ভাষা পাপিয়ামেন্তু।

কেমন তাদের ফুটবলের ইতিহাস?

২০১০ সালের আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলত নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলস। আরুবা, বোনেয়ার, সাবা, সিন্ট ইউস্টেশাস ও সিন্ট মার্টেন— এই দ্বীপগুলো নিয়েই ছিল দলটি।

ভেঙে যাওয়ার পর নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলসের জায়গায় ফিফার সদস্যপদ পায় কুরাসাও। তখন বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থান ছিল ১৫১তম।

২০১১ সালের ১৮ আগস্ট। আন্তর্জাতিক ফুটবলে পথচলা শুরু কুরাসাওয়ের। প্রথম প্রীতি ম্যাচে ডমিনিকান রিপাবলিকের কাছে তারা হেরে যায় ১-০ গোলে। তবে প্রথম জয়ের জন্য বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। একই বছরের ১১ নভেম্বর ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসকে ৩-০ গোলে হারায় দলটি।

কুরাসাওয়ের ডাগআউটে কোচ হিসেবে বড় বড় নাম এসেছে। আয়াক্স আমস্টারডাম ও বার্সেলোনার সাবেক স্ট্রাইকার প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট তাদের দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৫-১৬ মেয়াদে এবং ২০২১ সালে অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

ছিলেন গুস হিডিঙ্কও। পিএসভি আইন্দহোফেন, রিয়াল মাদ্রিদ ও চেলসির এই সাবেক কোচ ২০২০ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কুরাসাওয়ের কোচের দায়িত্ব পালন করেন।

বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান কত?

ফিফার সর্বশেষ র‍্যাঙ্কিংয়ে ২১১টি দেশের মধ্যে নীল ঢেউ নামে পরিচিত এই দলটির অবস্থান ৮২তম। এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে র‍্যাঙ্কিংয়ের দিক দিয়ে তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে তারা। পেছনে আছে কেবল হাইতি (৮৩তম) ও নিউজিল্যান্ড (৮৫তম)।

বর্তমান কোচ কে?

কিংবদন্তি ডাচ ফুটবলার ডিক অ্যাডভোকাট কুরাসাওয়ের বর্তমান কোচ। এর আগে নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলকে তিন মেয়াদে সামলেছেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবার এক বছরের চুক্তিতে কুরাসাওয়ের দায়িত্ব নেন তিনি। তখন চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়।

২০২৪ সালের ৫ জুন উইলেমস্টাডে বার্বাডোসকে ৪-১ গোলে হারায় কুরাসাও, অ্যাডভোকাট যুগের শুরু হয় দারুণ জয়ে। সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে তার অধীনেই গত বছর ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে দলটি।

তবে গল্পটা এখানেই শেষ নয়। মেয়ের অসুস্থতার কারণে বিশ্বকাপে শুরুর মাত্র চার মাস আগে— চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করেন অ্যাডভোকাট। এরপর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে মে মাসে ফ্রেড রুটেনের জায়গায় আবারও দায়িত্ব নেন তিনি।

এবার বিশ্বকাপের ডাগআউটে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় এই ৭৮ বছর বয়সী কোচ। তিনি গড়তে যাচ্ছেন এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হওয়ার রেকর্ড।

কাদের নিয়ে গড়া এই দল?

স্কোয়াডের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে যুক্তরাজ্যের ফুটবলপ্রেমীরা ভালো করেই চেনেন। কারণ, বিভিন্ন স্তরের ইংলিশ লিগগুলোতে খেলার অভিজ্ঞতা আছে তাদের। বিশেষ করে, দুই ভাই জুনিনহো ও লিয়ান্দ্রো বাকুনা পরিচিত মুখ।

লিয়ান্দ্রো ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অ্যাস্টন ভিলা, রিডিং, কার্ডিফ ও ওয়াটফোর্ডের হয়ে খেলেছেন। ভিলার হয়ে প্রিমিয়ার লিগেও মাঠে নেমেছেন। তার ছয় বছরের ছোট ভাই জুনিনহো ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হাডার্সফিল্ড, রেঞ্জার্স ও বার্মিংহ্যামের জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন।

আর আছেন তাহিথ চং। ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে কেবল তারই জন্ম কুরাসাওয়ের মাটিতে। বাকিরা সবাই পৃথিবীর আলো দেখেছেন নেদারল্যান্ডসে। চং বিখ্যাত ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন। বার্মিংহ্যাম ও লুটন হয়ে বর্তমানে তিনি খেলছেন শেফিল্ড ইউনাইটেডে।

এই স্কোয়াডের সবচেয়ে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হলেন এলয় রুম। ৩৭ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক খেলছেন ইউএসএল চ্যাম্পিয়নশিপের দল মায়ামি এফসিতে। ২০১৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭১ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ক্লাব পর্যায়ে ভিতেসে, পিএসভি ও কলম্বাস ক্রুর মতো দলে খেলার অভিজ্ঞতা আছে তার।

মজার ব্যাপার হলো, কুরাসাওয়ের বর্তমান স্কোয়াডের ১৬ জন সদস্যই বয়সভিত্তিক পর্যায়ে নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলেছেন।

তারা কীভাবে মূল পর্বে উঠল?

কনকাকাফ অঞ্চলের বাছাইপর্বের তৃতীয় রাউন্ডে ‘বি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত করে কুরাসাও। ৬ ম্যাচ থেকে তিনটি করে জয় ও ড্রয়ে তারা তুলে নেয় ১২ পয়েন্ট।

শুরুটা হয়েছিল ২০২৪ সালের জুনে, দ্বিতীয় রাউন্ড দিয়ে বিশ্বকাপ বাছাই শুরু। চার ম্যাচের সবকটি জিতে ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয় কুরাসাও। রানার্সআপ হাইতিকে সঙ্গী করে ওঠে তৃতীয় রাউন্ডে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু তৃতীয় রাউন্ড। বারমুডার বিপক্ষে পরের ম্যাচের শুরুতে ২-০ গোলে এগিয়েও যায় তারা। তবুও শেষমেশ ঘাম ঝরিয়ে ৩-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় কুরাসাওকে। তারপর জ্যামাইকাকে ২-০ গোলে হারানো, ত্রিনিদাদের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র।

তবে আগের ম্যাচে ভোগানোর শোধ কুরাসাও তোলে বারমুডার বিপক্ষে। ফিরতি দেখায় তাদের ৭-০ গোলে উড়িয়ে দেয় অ্যাডভোকাটের শিষ্যরা। এই জয়গুলো গত নভেম্বরে জ্যামাইকার বিপক্ষে তাদের বাঁচা-মরার লড়াইয়ের ভিত গড়ে দেয়। অপরাজিত থেকেই বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে কুরাসাও।

Most Popular