বিশ্বকাপের প্রথম বড় লড়াইয়ে জয় পায়নি কেউ। তবে ম্যাচ শেষে সন্তুষ্ট থাকার কারণ হয়তো মরক্কোরই বেশি। আফ্রিকার প্রতিনিধিরা দুর্দান্ত ফুটবল খেলে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে চাপে রেখেছে ম্যাচের বড় একটা সময়। শেষ পর্যন্ত ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের অসাধারণ এক গোল ব্রাজিলকে হার থেকে বাঁচালেও মরক্কো আবারও প্রমাণ করেছে, তারা আর কেবল ‘চমক’ নয়, বিশ্ব ফুটবলের বড় শক্তিগুলোর জন্য বাস্তব হুমকি।
নিউ জার্সির দর্শকভর্তি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ‘সি’র ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছে। মরক্কোর হয়ে প্রথমার্ধে গোল করেন ইসমাইল সাইবারি, আর ব্রাজিলের সমতাসূচক গোলটি আসে ভিনিসিয়ুসের পা থেকে।
ম্যাচের শুরু থেকেই বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং সংগঠিত দল হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে মরক্কো। আক্রমণে আশরাফ হাকিমি ও বিলাল এল খান্নুসের গতি এবং সৃজনশীলতা ব্রাজিলকে বারবার সমস্যায় ফেলে। অন্যদিকে ব্রাজিল শুরুতে অনেকটাই পাল্টা আক্রমণের ওপর নির্ভর করে খেলতে থাকে।
মধ্যমাঠে মরক্কোর আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে তরুণ আয়ুব বুয়াদ্দি অসাধারণ দক্ষতায় বল নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণ গড়ে বারবার ব্রাজিলের মাঝমাঠকে ছিন্নভিন্ন করে দেন। দুই লাইনের মাঝখানে তৈরি হওয়া ফাঁকগুলো কাজে লাগিয়ে মরক্কো সহজেই আক্রমণে উঠে আসে।
ব্রাজিলের প্রথম ভালো সুযোগ আসে ১৪তম মিনিটে। কিন্তু ইগর থিয়াগো হেডে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। এর সাত মিনিট পরই আসে মরক্কোর গোল। মাঝমাঠে লুকাস পাকেতা বল হারালে দ্রুত আক্রমণে ওঠে মরক্কো। ব্রাহিম দিয়াজের নিখুঁত পাসে ফাঁকা জায়গায় বল পান সাইবারি। সে সময় মারকিনিওস ও গ্যাব্রিয়েল দুজনই রক্ষণে ভুল অবস্থানে ছিলেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ করে দেন গোলরক্ষক অ্যালিসন, যিনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে সামনে এগিয়ে আসেন। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ঠান্ডা মাথায় বল তার মাথার ওপর দিয়ে জালে পাঠান সাইবারি।
গোলের পরও মরক্কো ছিল বেশি বিপজ্জনক দল। তাদের তীব্রতা, সংগঠন এবং গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খেতে থাকে ব্রাজিল। তবে সেই আধিপত্য থেকে আর কোনো গোল বের করতে পারেনি আফ্রিকান দলটি।
এরপরই দেখা যায় ভিনিসিয়ুসের জাদু। ম্যাচের ৩২তম মিনিটে ব্রুনো গিমারেসের পাস পেয়ে বক্সের বাঁ প্রান্ত থেকে ভেতরে কাট করেন তিনি। এরপর ডান পায়ের দুর্দান্ত শটে বল পাঠিয়ে দেন দূরের উপরের কোণে। মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোর কোনো কিছুই করার ছিল না।
বিরতির ঠিক আগে প্রায় এগিয়েও গিয়েছিল ব্রাজিল। পাকেতার দুর্দান্ত সিজর কিক অবশ্য অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন বুনো।
প্রথমার্ধে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর কোচ কার্লো আনচেলত্তি দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্তন আনেন। কাসেমিরো ও রজার ইবানিয়েজের পরিবর্তে মাঠে নামেন ফাবিনিয়ো ও দানিলো। এতে মাঝমাঠে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় ব্রাজিল।
দ্বিতীয়ার্ধে বলের দখল বেশি ছিল ব্রাজিলের। তারা আরও ধৈর্য নিয়ে খেলতে শুরু করে এবং মরক্কোকে নিজেদের অর্ধে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু পরিষ্কার গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারছিল না। ৭৮তম মিনিটে ভিনিসিয়ুসের ক্রস থেকে রাফিনিয়া সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি।
ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়িয়েছে, দুই দলই ঝুঁকি নেওয়া কমিয়ে দেয়। যদিও শেষ দিকে মাতাইস কুনিয়ার একটি প্রচেষ্টা ব্রাজিলকে জয়ের খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিল, তবু শেষ পর্যন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত গোল আর আসেনি।
ড্রয়ের ফলে দুই দলই এখনও গ্রুপের শীর্ষস্থান দখলের লড়াইয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য তাদের রক্ষা করলেও দলগতভাবে এখনও অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে।
অন্যদিকে মরক্কো আবারও দেখিয়ে দিল, ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। সংগঠিত, আত্মবিশ্বাসী এবং সাহসী এই দলটি এবারও বিশ্ব ফুটবলের বড় শক্তিগুলোর জন্য কঠিন পরীক্ষার নাম হয়ে উঠতে পারে।
