মানবজাতির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯০১ সাল থেকে দেওয়া হয় মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা নোবেল পুরস্কার। ডিনামাইটের উদ্ভাবক সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের শেষ ইচ্ছাপত্র অনুযায়ী প্রতিবছর বিভিন্ন শাখায় অনন্য অবদানের জন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে ৫ থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে। আগামী সোমবার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বছর আয়োজনটি শুরু হতে যাচ্ছে।
তার আগে ঐতিহাসিক এই পুরস্কার এবং এর প্রতিষ্ঠাতা আলফ্রেড নোবেল সম্পর্কে পাঁচ তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা এএফপি।
১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫ জন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী কারাগারে বা গৃহবন্দি থাকার কারণে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সশরীরে যোগ দিতে পারেননি।
১৯৩৬ সালে জার্মান সাংবাদিক ও শান্তিকর্মী কার্ল ফন অসিয়েতস্কি নাৎসি বন্দিশিবিরে আটক ছিলেন। সে বছর তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
১৯৯১ সালে মিয়ানমারের বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তখন তিনি গৃহবন্দি ছিলেন। জান্তা সরকার তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিলেও দেশে ফেরার সুযোগ না পাওয়ার আশঙ্কায় তিনি মিয়ানমার ছাড়েননি।
২০১০ সালে চীনা ভিন্নমতাবলম্বী লিউ শিয়াওবো কারাগারে থাকা অবস্থায় নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তার জন্য রাখা চেয়ারটি খালি ছিল।
২০২২ সালে বেলারুশের মানবাধিকারকর্মী অ্যালেস বিয়ালিয়াৎস্কি কারাগারে থাকা অবস্থায় নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। অনুষ্ঠানে তার হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন তার স্ত্রী নাতালিয়া পিনচুক।
২০২৩ সালে ইরানের মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তখন তিনি ইরানের এভিন কারাগারে আটক ছিলেন।
২০১৪ সালে পাকিস্তানের মানবাধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই মাত্র ১৭ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তিনিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম বয়সী নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।
আরেকজন কম বয়সী নোবেল বিজয়ী ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার লরেন্স ব্র্যাগ। ১৯১৫ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। ওই গবেষণাটি তিনি সম্পন্ন করেছিলেন মাত্র ২১ বছর বয়সে।
ইরাকের নাদিয়া মুরাদও ২৫ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। ২০১৮ সালে ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় অবদান রাখায় তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল বিজয়ী হন যুক্তরাষ্ট্রের জন গুডেনাফ। ২০১৯ সালে ৯৭ বছর বয়সে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। স্মার্টফোন ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নিয়ে কাজের জন্য তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
এর এক বছর আগে ৯৬ বছর বয়সে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তারই স্বদেশি আর্থার অ্যাশকিন।
১৯৭৪ সাল থেকে নোবেল ফাউন্ডেশনের সংবিধানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুর পর নোবেল পুরস্কার দেওয়া যাবে না।
তবে নাম ঘোষণার পর যদি ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বিতরণীর আগেই কারও মৃত্যু হয়, তবে সেই পুরস্কার বহাল থাকে।
১৯৭৪ সালের নিয়ম পরিবর্তনের আগে মাত্র দুজন ব্যক্তি মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।
তাদের একজন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব সুইডেনের দ্যাগ হ্যামারশোল্ড। ১৯৬১ সালে বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। ওই বছরই তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।
অন্যজন ছিলেন সুইডিশ কবি এরিক অ্যাক্সেল কার্লফেল্ড। ১৯৩১ সালে মৃত্যুর পর তাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
২০১১ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের জন্য কানাডার র্যালফ স্টেইনম্যানকে নির্বাচিত করা হয়। তবে কমিটি তখন জানত না যে পুরস্কার ঘোষণার মাত্র তিন দিন আগে তিনি মারা গেছেন। পরে নোবেল ফাউন্ডেশন তাকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেওয়া ৬৩৩ নোবেল পুরস্কারের মধ্যে মাত্র ৬৮টি পেয়েছেন নারীরা। অর্থাৎ মোট পুরস্কারের প্রায় ১০ শতাংশ গেছে নারীদের হাতে। তবে ২০২০-এর দশকের শুরু থেকে এই হার ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বিজ্ঞানের ক্ষেত্রগুলোতে নারী নোবেলজয়ীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম। পুরস্কার প্রদানকারী কমিটিগুলো বারবার কোটা চালুর প্রস্তাব নাকচ করেছে। এর পরিবর্তে নারী বিজ্ঞানীদের মনোনয়ন দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞানে এখন পর্যন্ত ২৩০ জন নোবেলজয়ীর মধ্যে নারী মাত্র পাঁচজন। অর্থনীতিতে ৯৯ জনের মধ্যে তিনজন, রসায়নে ২০০ জনের মধ্যে আটজন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২৩২ জনের মধ্যে ১৪ জন নারী নোবেলজয়ী হয়েছেন।
১৯০৩ সালে প্রথম নারী হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান মেরি কুরি। এখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র নারী, যিনি দুবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল পান তিনি।
ইতিহাসে ডিনামাইটের উদ্ভাবক হিসেবে আলফ্রেড নোবেল বেশি পরিচিত। তবে ইংরেজি কবিতার প্রতিও তার গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি কবি পার্সি বিশি শেলি ও লর্ড বায়রনের অনুরাগী ছিলেন।
সারাজীবন নিজেও কবিতা লিখেছেন নোবেল। কখনো মাতৃভাষা সুইডিশে, তবে বেশিরভাগই ইংরেজিতে।
এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, আমার পঙক্তিগুলোকে কবিতা বলে দাবি করার বিন্দুমাত্র ধৃষ্টতা আমার নেই। মনের বিষণ্ণতা দূর করা কিংবা নিজের ইংরেজি ভাষার উন্নতি করার জন্য মাঝেমধ্যে লিখি, এছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নেই।
১৮৬২ সালে ২৯ বছর বয়সে নিজের সাহিত্য প্রতিভা নিয়ে সংশয়ে থাকা নোবেল এক তরুণীকে ফরাসি ভাষায় চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘পদার্থবিজ্ঞানই আমার ক্ষেত্র, লেখালেখি নয়।’
১৮৯৬ সালে মৃত্যুর বছর নোবেল চার অঙ্কের একটি বিতর্কিত ট্র্যাজেডি লেখেন। নাটকটির নাম ছিল ‘নেমেসিস’। এটি শেলির ‘দ্য চেঞ্চি’ নাটক থেকে অনুপ্রাণিত। নাটকটির কাহিনি ১৬ শতকের রোমের এক নারীকে ঘিরে, যে তার নিজের বাবাকে হত্যা করে।
