Wednesday, September 30, 2026
Homeখেলাভুল যুদ্ধে নেমেছেন ডুলি?

ভুল যুদ্ধে নেমেছেন ডুলি?

সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ১-০ গোলে হারলেও বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে উন্নতির ছাপ ছিল স্পষ্ট। আর সেটি ফিফা আসিয়ান কাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলের হারের পর কোচ থমাস ডুলির ওপর কিছুটা চাপ কমিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো। বাংলাদেশের নতুন কোচের ওপর চাপ বরং বেড়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এর বড় একটা অংশই তার নিজের তৈরি।

খেলোয়াড় নির্বাচন তো বটেই, তার শব্দচয়ন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন এই আমেরিকান কোচ।

আদর্শ পেশাদার ফুটবলের জগতে এসব বিষয় একজন অভিজ্ঞ কোচ ও সাবেক বিশ্বকাপ খেলোয়াড়কে বিচলিত করার কথা নয়। কোচের সমালোচনা হবে, একাদশ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খেলোয়াড়কে নিয়ে মাতামাতি হবে, আবার সমালোচনাও হবে। একজন কোচের কাজ হলো অনুশীলন ও মাঠে খেলোয়াড়দের দেখে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া।

কিন্তু ডুলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব আলোচনা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে। এমনকি প্রশ্ন উঠছে, এসব কি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে?

মালয়েশিয়া ম্যাচে ডুলি অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা ১৯ বছর বয়সী ফারহান আলী ওয়াহিদকে শুরুর একাদশে রাখেন। কিন্তু বিরতির সময়ই তাকে তুলে নেন। ফারহান খুব একটা ভালো খেলতে পারেননি এবং তাকে বদলি করার পুরো অধিকারই কোচের ছিল। পরের ম্যাচে এই তরুণকে একাদশের বাইরে রাখার অধিকারও তার ছিল।

কিন্তু মালয়েশিয়া ম্যাচের পরদিন বাংলাদেশের একটি সংবাদপোর্টাল ম্যাচে ফারহানকে তুলে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ডুলি ব্যঙ্গ করে এই তরুণকে ‘ওয়ান্ডারবয়’ বলে উল্লেখ করেন।

ডুলি বাংলাট্রিবিউনকে বলেছিলেন, “দেখান তো, ‘ওয়ান্ডারবয়’ ফারহান ম্যাচে কি অসাধারণ খেলেছে। কথা বলার বদলে তাদের মাঠে কী করতে পারে, সেটা দেখানো উচিত!”

বাংলাদেশের জার্সিতে ফারহানের অভিষেকের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে যে ব্যাপক মাতামাতি হয়েছিল, সম্ভবত সেই বিষয়টিকেই লক্ষ্য করে মন্তব্যটি করেছিলেন ডুলি।

মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ফারহান হয়তো প্রয়োজনীয় মানে খেলতে পারেননি। কিন্তু একজন পেশাদার কোচের জন্য নিজের খেলোয়াড়কে প্রকাশ্যে উপহাস করা কি উপযুক্ত? বিশেষ করে সেই খেলোয়াড় যখন ১৯ বছর বয়সী এবং জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক ম্যাচ খেলছে?

এতে একজন তরুণ খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস বা মনোবলের উপর কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে একবার ভাবুন তো? দলের বাকি খেলোয়াড়দের জন্যই বা কী বার্তা যায়? আর ফারহানের মতো বিদেশে থাকা সেই খেলোয়াড়দের জন্যই বা কী বার্তা যায়, যারা নিজেদের পূর্বপুরুষের দেশ বাংলাদেশের হয়ে খেলার কথা ভাবছেন?

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ডুলি কি সত্যিই বিশ্বাস করেছিলেন যে ফারহান খেলার জন্য প্রস্তুত, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা তাকে নিয়ে প্রচার করছিলেন, তাদের প্রমাণ করে দেখানোর একটা ইচ্ছাও তার সিদ্ধান্তে কাজ করেছিল যে খেলোয়াড়টি আসলে যথেষ্ট ভালো নয়?

চার মাস ধরে দলের দায়িত্বে আছেন কোচ। তার সঙ্গে স্থানীয় সহকারী কোচসহ যথেষ্ট ভালো একটি কোচিং স্টাফও রয়েছে। যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জল্পনা-কল্পনা খেলোয়াড় নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে থাকে, তাহলে সেই চাপকে দল থেকে দূরে রাখার জন্য কোচিং স্টাফরাই বা কী করছে?

দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, নিজের দলের মধ্যে বিতর্ক উসকে দেওয়ার ঘটনা ডুলির জন্য এটাই প্রথম নয়।

ফিলিপাইনের কোচ থাকার সময় ২০১৮ সালে ইউরোপ প্রবাসী তিন খেলোয়াড়কে দল থেকে বাদ দিয়েছিলেন ডুলি এবং তাদের নিয়ে প্রকাশ্যে অবমাননাকর মন্তব্যও করেছিলেন। ২০১৯ এএফসি এশিয়ান কাপে ফিলিপাইনকে জায়গা করে দেওয়ার পরও এর মূল্য দিতে হয়েছিল তাকে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই চাকরি হারান তিনি।

গত বছর গায়ানার কোচ থাকার সময়ও অভিযোগ উঠেছিল, স্থানীয় খেলোয়াড়দের সামর্থ্য এবং দেশটির ঘরোয়া লিগের মান নিয়ে তিনি অসম্মানজনক মন্তব্য করেছিলেন।

তবে আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ডুলি তার সমালোচকদের সঙ্গে বিতর্কে জড়াতে এবং মতবিরোধগুলো প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে যেন অতিরিক্ত আগ্রহী। জাতীয় দলের একজন কোচের সমর্থক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের সঙ্গে তর্কে জেতার প্রয়োজন নেই। তার প্রয়োজন ফুটবল ম্যাচ জেতা।

এবার আসা যাক বাংলাদেশে তার দায়িত্বকালের আরেকটি দিকের কথায়।

বাংলাদেশে আসার দিন থেকেই ডুলি বারবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার স্বপ্নের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি বারবার বলেছেন, বাংলাদেশের প্রথম ফিফা টুর্নামেন্ট আসিয়ান কাপে খেলতে চাননি তিনি। তার পছন্দ ছিল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ঘরের মাঠে  প্রস্তুতি নেওয়া।

সাফ জিততে চাওয়ার মধ্যে কোনো দোষের কিছু নেই। কিন্তু বাংলাদেশকে উন্নতি করতে হলে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে হবে। আর আসিয়ান কাপ সেই সুযোগটাই করে দিচ্ছে।

সম্প্রতি মহাদেশীয় পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-২০ দলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে জেরার্ড জোন্স নামের একজন কোচকে নিয়োগ দেয়ার পর। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড বড় ধরনের সমস্যায় পরিণত হয়েছিল এবং তার আচরণ দলের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছিল। তিনি প্রকাশ্যে দলের সহকারী কোচ এর সাথে বিবাদে জড়ান এবং তাকে দল থেকে দূরে রাখেন, যার প্রভাব দলের খেলায় পরে। অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এএফসি এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি

আশা করি, ডুলি জাতীয় সিনিয়র দলকে একই পথে নিয়ে যাবেন না।
 

Most Popular